শংকর শীল, চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ): মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখো বাঙালি অকাতরে প্রাণ বিলিয়েছেন দেশের জন্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন অনেকেই। তাদের কেউ আমাদের চেনা, কেউবা অচেনা। বাঙালির শ্রেষ্ঠ এই সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উজ্জীবিত রাখতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্মিত হয়েছে ভাস্কর্য ও স্মৃতিফলক। এছাড়া প্রতিটি এলাকায় ছড়িয়ে আছে বধ্যভূমি। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে ৭ (সাত)টি বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার এক শোকাবহ স্মৃতিচিহ্ন অঙ্কিত হয়ে আছে এই বধ্যভূমিগুলোতে। এই স্থানে পাকিস্তানি বাহিনীরা পৌরসভায় ১১জন ও চা-বাগানসহ উপজেলায় ৫০ জনেরও বেশি নারী-পুরুষ

মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে গণকবর দেয়া হয়।
চুনারুঘাট পৌরসভার উত্তর বাজারস্থ মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন সংলগ্ন পুরাতন খোয়াই নদী ও ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়ক ও স্থানীয় হাটবাজারের নর্দমা ফেলা হচ্ছে বধ্যভূমিতে। এছাড়া বধ্যভূমি ও আশপাশ এলাকায় গড়ে উঠেছে সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ড। আর এসব কারণেই এটি উন্মুক্ত শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ঐতিহাসিক এ স্থানের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এছাড়া চুনারুঘাট পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় খোলা হাটবাজার থাকলে সড়ক থেকে বধ্যভূমিতে যাতায়াতের সুবিধার্থে নেই কোনো ব্যবস্থা। আর যেটুকু আছে যেগুলোও এখনও সিএনজি অটোরিকশার দখলে। এদিকে বধ্যভূমি সংরক্ষণের জন্য একজন নিজস্ব অর্থায়নে অসমাপ্ত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে দিয়েছেন। কিন্তু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বধ্যভূমিতে গড়ে উঠেনি কোন স্মৃতিস্তম্ভ। শুধুমাত্র একটা ভিত্তি স্থাপন সাইনবোর্ড আছে। তাও আবার লিখা অনেকটা ময়লার আবৃত। ভালো করে না থাকলে কেউ বুঝার উপায় নাই কি লেখা আছে সাইনবোর্ডে। আশেপাশে কাঁচা পাকা পিলার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করার কথা বললেও কিছুই নেই বধ্যভূমিতে। গত দু’বছর আগে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবীর পৃষ্ঠপোষকতায় বধ্যভূমিটি সংস্কারের উদ্যোগে ভিত্তিস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে সংস্করণ জায়গায় গড়ে ওঠে সিএনজি-অটোরিকশা স্টেশন। এদিকে লালচাঁন চা বাগান ও নালুয়া চা বাগান : চুনারুঘাট উপজেলার চা বাগানগুলো একদিকে যেমন সৌন্দর্যের বিশালতা বুকে ধারণ করে আছে তেমনি সাক্ষী হয়ে আছে ১৯৭১-এর বিভীষিকাময় গণহত্যার। বাগানে যেমন গণহত্যা হয়েছে ঠিক তেমনই করা হয়েছে নারী নির্যাতন। চুনারুঘাট থানায় অবস্থিত লালচাঁন চা বাগান থেকেই নিয়মিত পরিকল্পনামাফিক অপারেশন পরিচালনা করা হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গ্রম্নপ এসে অবস্থানও নিত এই বাগানে। মুক্তিযোদ্ধাদের এমন আনাগোনার খবর পৌঁছে যায় হানাদার বাহিনীর কাছে। তারা আক্রমণ করে লালচাঁন চা বাগানে। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের না পেয়ে আক্রোশে বাগানের হতদরিদ্র নিরীহ ১৩ জন শ্রমিককে হানাদাররা ধরে নিয়ে আসে শায়েস্তাগঞ্জে। এই ১৩ জনকে দিয়ে খোঁড়ানো হয় বিরাট কবরের মতো গর্ত। এই গর্তের পাশে লাইনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে ১৩ জনকে। ১৩ জনের মধ্য লালচাঁন বাগানে শহীদ পরিবারের লোকজন ১১জনের মরদেহ এনে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। ওরা ১১জন হলেন – কৃষ্ণ বাউরী,রাজেন্দ্র  রায়, মহাদেব বাউরী, নেপু বাউরী, রাজ কুমার বাউরী, দীপক বাউরী, গহুর রায়, লাল সাধু, অনু মিয়া, ভূবন বাউরী ও সুশীল বাউরী। অন্যদিকে একাত্তরের ২০মে এর দিকে সম্মুখযুদ্ধে সুবিধা করতে না পেরে কয়েকদিন পর আক্রমণ করে নলুয়া চা বাগানে শ্রমিকদের উপর। ধরে এনে হত্যা করা হয় ১৬ জন শ্রমিককে। তাদের মধ্যে ছিলেন- আবদুল গফুর, নীলাম্বর রূদ্রপাল, জামলীমুন্ডা, চুনডেমুন্ডা, হাগরু জরা, আলী রাজা মুড়া, মংলু জরা সর্দার, রুদ্রমুড়াসহ আরও অনেকেই। পরে চুনারুঘাট থানার চান্দপুর চা বাগানে হত্যা করা হয় আরও ৩ শ্রমিককে। দেওন্দী ও লস্করপুর বাগানেও চালানো হয় ব্যাপক হত্যাকান্ড। উপজেলার ৭টি বধ্যভূমি আজও চিহ্নিত করা যায়নি। এগুলো হল উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের দীঘিরপাড়, আহমদাবাদ ইউনিয়নের আমুরোড গোছাপাড়া এলাকার পালবাড়ি ও ধোপাবাড়িতে পাক সেনারা হত্যা করে ৮ মুক্তিযোদ্ধাসহ ২২ জন গ্রামবাসীকে। পৌর শহরের উত্তর বাজার এলাকায় মরা খোয়াই নদীর পাশে হত্যা করা হয় অসংখ্যা মুক্তিকামী মানুষকে। বড়াইল গ্রামের হিন্দু পরিবারের ৫ জনকে একসঙ্গে হত্যা করা হয় এ স্থানে। এ স্থানটিও চিহ্নিত করা হয়নি। দেশের জন্য মানুষের প্রাণ বিলিয়ে দেয়ার ইতিহাস। এটি সংরক্ষণ সবচেয়ে বেশি জরুরি। আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ জানাতে এসব স্থান রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও এসব স্থান সংরক্ষণ হচ্ছে না। সাবেক উপজেলা কমান্ডার আব্দুস সামাদ বলেন, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে এই বধ্যভূমিগুলো সংস্কার ও রক্ষিত করার আবেদন করায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কর্তৃক এই বধ্যভূমি রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সত্যজিত রায় দাশ বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে খুবই আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল। বধ্যভূমি সংরক্ষণে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমি বধ্যভূমি উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন ও কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের অন্যান্য উপজেলার মতো চুনারুঘাট উপজেলায় বধ্যভূমির উন্নয়ন হবে।