চাহিদা কমানো বা ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া ছাড়া বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানোর কোনো দ্রুত সমাধান এখন নেই

আন্তজার্তিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার সম্প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এই জ্বালানির আমদানি কমাতে বাধ্য হয়েছে। যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশে বেড়েছে লোডশেডিং।

মূলত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এলএনজি’র দাম ইউনিট প্রতি ১৩ ডলারের বেশি বেড়েছে, এ কারণে আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

অভ্যন্তরীণ গ্যাসের মজুত শেষ হয়ে যেতে থাকায় বাংলাদেশ ২০১৮ সালের এপ্রিলে ওমান এবং কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির অধীনে এলএনজি আমদানি শুরু করে। তবে এরপর আর জ্বালানির অন্য উৎস অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এমন অবস্থায় সারাদেশে প্রতিদিনই হচ্ছে লোডশেডিং, আগামী দিনে তা আরও বাড়তে পারে।

বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে গরমের কারণে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।

সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চলমান জ্বালানি সংকট শিগগিরই শেষ হওয়ার বিষয়ে কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে আগামী দিনে বিদ্যুতের ঘাটতি বা লোডশেডিং একটি নিয়মিত ঘটনা হতে পারে।

এদিকে, মঙ্গলবার (৫ জুলাই) এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সংকট মোকাবিলায় নির্দেশনা দেন।

তিনি উল্লেখ করেন, করোনভাইরাস মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়েছে, এর প্রভাবে বেড়েছে জ্বালানি এবং এলএনজির দাম।

এ কারণে, বিশ্বের অনেক দেশ বিদ্যুৎ ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পরিবহনও ব্যাহত হচ্ছে এমনকি কয়লাও পাওয়া যাচ্ছে না।”

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে।

বিশ্ববাজারে এই ব্যয়বহুল জ্বালানির দাম সাম্প্রতিক সময়ে ২৫ থেকে ৩৮ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশে প্রতিদিন ১ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি’র আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে ওমান ও কাতারের সঙ্গে চুক্তির কারণে বাংলাদেশ খোলা বাজার থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে পারছে না

গত ৩ জুলাই জাতীয় গ্রিডে ৫১০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে। সাধারণত জাতীয় গ্রিডে ২.৭ থেকে ২.৯ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। অর্থাৎ দেশে এখন প্রতিদিন প্রায় ১.১ বিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।

গ্যাস ছাড়াও, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি হিসেবে দুটি বিকল্প রয়েছে – তেল এবং কয়লা।

কিন্তু ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিট খরচ হয় ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। খরচ বেশি হওয়ায় রেশনও করতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে ১০০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে কয়লার দাম কম হলেও গ্রিড পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় কয়লাভিত্তিক পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা এখন অর্ধেক। রামপালে আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু হচ্ছে না। জানা গেছে, অক্টোবরে উৎপাদন শুরু হতে পারে এ কেন্দ্রে।

ফলে চাহিদা কমানো বা ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া ছাড়া বিদ্যুতের ঘাটতি মেটানোর কোনো দ্রুত সমাধান এখন নেই।

আগামী দুইদিন লোডশেডিং পরিস্থিতি একই থাকবে বলে জানিয়েছেন বিপিডিবির একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা। এরপর ঈদের ছুটিতে চাহিদা কমলে লোডশেডিং কমতে পারে। এই সময়ে আবাসিক এবং বাণিজ্যিক পর্যায়ে বিদ্যুতের কম থাকবে বলে জানান তারা।

এছাড়া প্রতিদিন ৫০০-৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য ঈদের ছুটির পর রাত ৮টা থেকে দোকান-বাজার বন্ধ রাখার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এছাড়া, মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ ঘাটতির এই সময়ে বিদ্যুতের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে এলাকাভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি তালিকা তৈরি ও বাস্তবায়নে কাজ করছে।

যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব হাবিবুর রহমান  বলেন, “আমরা দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ উৎপাদনে রাখতে আমরা আরও কিছু জ্বালানির উৎস খুঁজে বের করছি। সাম্প্রতিক এই ঘাটতি মেটাতে আরও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, আগামী দেড় মাসের মধ্যে তা সমাধান হয়ে যাবে।”

বিপিডিবি অনুযায়ী, বছরের এই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে। শনিবার সাবস্টেশন পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১৩ হাজার ১০৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়েছে। ওইদিন কাগজে কলমে লোডশেডিং না থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ১-৬ঘন্টা বিদ্যুৎ ছিল না বলে জানা গেছে।

জ্বালানি সংকটের কারণে শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত বিপিডিবি উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে ৫৫০ মেগাওয়াট, ১৫০০ মেগাওয়াট এবং ১৪০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে।

এদিকে গ্যাস সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে বিভিন্ন এলাকা ও পেশার মানুষ তাদের দুর্দশার কথা জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অপর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের কারণে কারখানাগুলো দিনের বেশির ভাগ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক শিল্প উদ্যোক্তা ও কর্মকর্তারা।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।