একটি ফুটবল মাঠে দর্শক থেকে শুরু করে ক্যামেরার লেন্স কোন জিনিসের ওপর নিবিষ্ট থাকে? সবাই হয়ত বলবেন খেলোয়াড়দের কথা। বিষয়টি সত্যিই, তবে এখানে আরেকটা শর্তও রয়েছে। খেলোয়াড়দের পায়ে একটা বলও তো থাকতে হবে! একজন খেলোয়াড় কতটা দক্ষ ও সাবলীলভাবে বলকে নিয়ন্ত্রণ করে মাঠে নৈপুণ্য দেখাতে পারেন, সেটিই দর্শকদের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

কাতার বিশ্বকাপের পর্দা উঠতে বাকি আরও মাস তিনেকের মতো। তবে ফুটবল বিশ্বকাপের আঁচ এরই মধ্যে সবার গায়ে লাগতে শুরু করেছে। প্রতিবারই বিশ্বকাপের নানা খুঁটিনাটির মতো বল নিয়েও একটা আগ্রহ থাকে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে। সেটা এবারও আছে। কারণ বন্ধুত্ব করে, বশে এনে কিংবা দখলে নিয়ে যেভাবেই হোক; বল যাদের কথা সবচেয়ে বেশি শুনবে তারাই ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ দিয়ে প্রস্তুত ৩৬ সেন্টিমিটার উচ্চতার বিশ্বকাপ ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরতে সমর্থ হবে।

প্রতিটি বিশ্বকাপের আসরেই আলাদা আলাদা বল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কাতার বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। কাতার বিশ্বকাপের বল নিয়েও ইতোমধ্যে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা এবং আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে অনুষ্ঠিতব্য প্রথম বিশ্বকাপের খেলাগুলো হবে “আল রিহলা” বল দিয়ে। এই চর্মগোলকের নিয়ন্ত্রণই ফুটবল বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফির তুলে দেবে অংশগ্রহণকারী ৩২টি দলের যেকোনো একটিকে।

আল রিহলা। নামটা একটু পরিচিত ঠেকছে কি? জগদ্বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা লিখিত ভ্রমণকাহিনী নিয়ে রচিত “দ্য রিহলা”র নামেই এবারের বিশ্বকাপের বলের নামকরণ করা হয়েছে। আরবিতে আল “রিহলা” শব্দের অর্থ ভ্রমণ।

১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই বল তৈরি করে আসছে ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। সেই ধারাবাহিকতায় ১৪তম বারের মতো ফিফা বিশ্বকাপের বল তৈরি করেছে জার্মান বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি।

বিশ্বকাপের বল প্রস্তুতের সময় চর্মগোলকটিতে স্বাগতিক দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। আল রিহলার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আয়োজক কাতারের সংস্কৃতি, স্থাপনা, ঐতিহ্যবাহী নৌকা ও পতাকা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই বলটির নকশা তৈরি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে গাঢ় এবং জ্বলজ্বলে রঙের পরশ, যা কাতার এবং ফুটবলের ক্রমবর্ধমান গতির পরিচায়ক।

ফিফা ও অ্যাডিডাসের পক্ষ থেকে আল রিহলাকে বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে বাতাসে সবচেয়ে দ্রুতগতির বল হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। আধুনিক ফুটবলের গতিশীলতার কথা মাথায় রেখেই ম্যাচের গতি আরও বাড়াতে তথ্যগত অনেক বিশ্লেষণের পর বলটি তৈরি করা হয়েছে।

স্থায়িত্বের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আল রিহলা বলটি ডিজাইন করা হয়েছে। বলটি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে চামড়া এবং পলিয়েস্টর ফ্যব্রিক। এছাড়া, আল রিহলাই প্রথম বিশ্বকাপ বল যা তৈরি করা হয়েছে বিশেষ জল রঙ এবং আঠা দিয়ে। সর্বোপরি কাঁচামালের যথাসম্ভব অপচয় রোধ করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে কাতার বিশ্বকাপের বলটি তৈরি করা হয়েছে।

আল রিহলার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস পরীক্ষাগারে বলটিকে নিয়ে বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গবেষণা করেছে। বাদ যায়নি বাতাসের টানালে পরীক্ষণও। বলের ওপরের দিকে ব্যবহৃত চামড়ার গুণগত মান ও প্যানেল আকৃতির বিষয় বিবেচনা করে সুন্দর ফুটবলের জন্য আল রিহলার ওপর ভরসা করাই যায়।

আল রিহলায় ১২টি বড় এবং ৮টি ছোট প্যানেল ব্যবহৃত হয়েছে। এই ২০টি প্যানেলের মানসম্পন্ন চামড়া তথা স্পিডশেল দিয়ে এই বল তৈরি করা হয়েছে। ম্যাক্রো ও মাইক্রো টেক্সচারের মাধ্যমে বলের আকৃতি ও বাতাসের বলের গতিপথ (অ্যারোডায়নামিকস) যথাযথ রাখাই প্যানেলগুলোর মূল কাজ। মূলত খেলোয়াড়দের নিঁখুত শট এবং বলের গতিপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতেই এ প্যানেলগুলোর অন্তর্ভুক্তি।

আল রিহলার ভেতরের ফাঁপা অংশটি সিআরটি কোর নামে পরিচিত। এ অংশটির মূল কাজ আকৃতি ও ভেতরের বাতাস ধরে রাখা। সেই সঙ্গে ফুটবলকে গতিময় এবং নিঁখুতের নিশ্চয়তাও দিয়ে থাকে সিআরটি কোর। এমনকি কোথাও বাধা পেয়ে ফিরে আসার ক্ষেত্রে বলের দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে এ অংশটি।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঘাসের ওপরে কিংবা বাতাসে ভাসা- যে অবস্থায়ই হোক, বিগত বিশ্বকাপের বলগুলোর চেয়ে আল রিহলা দ্রুতগতিতে এবং নিখুঁতভাবে লক্ষ্যে তথা গোলমুখে পৌঁছাবে। এ কারণে আসন্ন কাতার বিশ্বকাপে গোলের বন্যা বইবে বলে অনুমান বিশেষজ্ঞদের।

শুধু মাঠের খেলা দৃষ্টিনন্দন করতে না, রেফারিং এবং সিদ্ধান্ত নিতেও বড় ভূমিকা পালন করবে আল রিহলা। ইতোমধ্যে কাতার বিশ্বকাপে অফসাইডের সিদ্ধান্ত সেমি অটোমেটেড প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। সেটিরই অংশ হিসেবে আল রিহলায় একটি ইনারশিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট সেন্সর থাকবে। সেন্সরটি প্রতি সেকেন্ডে ভিডিও অ্যাসিস্টেন্ট রেফারির (ভিএআর) কক্ষে ৫০০ বার করে তথ্য পাঠাবে।

ফিফার বিপণন বিভাগের পরিচালক জঁ-ফ্রাঁসোয়া প্যাঠি বলেন, অ্যাডিডাসের তৈরি আর রিহলা কাছ থেকে দেখতে অসাধারণ, টেকসই, উচ্চ মানসম্পন্ন একটি ম্যাচ বল। কাতারে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে পৃথিবীর সেরা তারকারা এ বল দিয়েই দর্শকদের মাতাবেন। এমনকি বিশ্বজুড়ে তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবলাররাও এ বল দিয়ে খেলা উপভোগ করতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, আল রিহলার বিশ্বযাত্রা প্রমাণ করে দেবে বিশ্বকাপ ফুটবল পৃথিবীবাসীর কতটা কাছে পৌঁছে গিয়েছে। তাছাড়া দর্শকরাও আয়োজনটির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার দারুণ সুযোগ পাবেন।

অ্যাডিডাসের গ্রাফিক্স এবং হার্ডওয়্যারের ডিজাইন ডিরেক্টর ফ্রাঞ্জিস্কা লোফেলমান বলেন, ফুটবল খেলাটা দিন দিন আরও গতিময় হচ্ছে। আর খেলাটার গতি যত বাড়ছে, বলের নিখুঁত এবং বাতাসে ঘূর্ণন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নতুন নকশার কারণে আল রিহলা বাতাসে ভাসমান অবস্থায় আগের চেয়ে বেশ গতিময় হবে।

আল রিহলাকে কাতার বিশ্বকাপের ম্যাচ বল হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এখনও সেটিকে জনসম্মুখে আনা হয়নি। কাকা, ইকার ক্যাসিয়াস, ফারাহ জেফরি ও নউফ আল আনজির মতো কিংবদন্তিরা বলটিকে প্রথমবারের মতো সবার সামনে নিয়ে আসবেন। এরপর বলটি দুবাই, নিউ ইয়র্ক, টোকিও, মেক্সিকো সিটিসহ বিশ্বজুড়ে ১০টি শহরে ঘুরবে।

গত ৩০ মার্চ থেকে অ্যাডিডাসের রিটেইল স্টোরগুলোয় আল রিহলা বলটি পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া অ্যাডিডাসের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনেও বলটি কেনা যাবে।

কাতার বিশ্বকাপের বলটিকে সংগ্রহে রাখতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশভেদে তাকে যথাক্রমে ১৬৫ মার্কিন ডলার, ১৩০ পাউন্ড এবং ১৫৫ ইউরো গুনতে হবে। পুরো বিশ্বে আল রিহলা বলটি বিক্রির আয়ের ১% অর্থ সমাজকল্যাণে ব্যয় করবে এর নির্মাতা অ্যাডিডাস।