ওমর আলী সোহাগ, ঝিনাইদহ

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ৩ নং সাগান্না ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন মোজাম্মেল হক। নির্বাচিত হয়েই এলাকায় তার পালিত বাহিনীর তাণ্ডবে বসবাসের পরিবেশ হাঁরিয়েছে সাধারণ মানুষের। শালিস-বিচার ও জরিমানায় অতিষ্ট এলাকাবাসি। এলাকায় মরা গরুর মাংশ বিক্রি নিয়ে এক তুঘলকি কান্ড ঘটিয়েছেন তিনি আর তার লোক লস্কর। জানাগেছে, গত ১২ মার্চ দিবাগত রাত ১২টার দিকে স্ট্রোক করে মারাযায় উত্তর নারায়ণপুর গ্রামের করম আলী ছেলে ইউসুফের একটি গরু। গরুটির ওজন প্রায় ৭-৮ মন। এত বড় গরু বাগানে ফেলে দিলে মাঠে মারাযাবে ইউসুফ। দুয়েকজনের পরামর্শে কসাই ডেকে পরের দিন রবিবার ডাকবাংলা বাজারে মাংস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় ইউসুফ। গরুর মাংস কি করবে রাতেই সিদ্ধান্ত নিতে ফোন দেয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুন্সী শাহীন রেজা সাঈদের কাছে। সাঈদ তখন বনভোজনে ছিল জেলার বাইরে। পরে একই গ্রামের কসাই ইসরাফিল ওরফে কটা ও তার ছেলে আলআমিনকে ডাকে। ইসরাফিল উত্তর নারায়ণপুর গ্রামের আকালের ছেলে। রাত অনুমান ২টার দিকে আলামিন ইউসুফের বাড়িতে গিয়ে মরা গরু আবার জবাই করেন। করে চামড়া ফেলে ইউসুফের বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন এই শর্তে মাংস বিক্রি করতে পারলে টাকা দেবে। রবিবার সকালে চৌমহী ও ডাকবাংলা বাজারে এই মাংস ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি শুরু হয়। এর মধ্যে এই বাজারের বাসিন্দা আলী নামের একজন মাংস কিনতে যায় কসাই ইসরাফিলের দোকানে। ব্যাগ নিয়ে মাংস কেনার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন এমন সময় এক ভ্যান চালক আলীকে বলে মরা গরুর মাংস কেনছো? এতে খটকা লাগে আলীর। আলী ঐ ভ্যান চালককে ডেকে জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারেন এই গরুর কাহিনী। তখন আলী কসাইকে বলে তুমি মরা গরুর মাংস বিক্রি করছো। খেয়ে মানুষ মারা যাবে। এই কথা জানাজানি হলে অনেকেই মাংশ ফিরিয়ে দিয়ে যায়। কেউ কেউ নিয়ে যাওয়া মাংশের একাংশ রান্না করে বাকি অংশ ফিরিয়ে দিয়ে যায়। এই কারণ ক্ষিপ্ত হয়ে আলী ও কওসার নামের এক জনের বাড়িতে যেয়ে হুমকি দিয়ে আসে চেয়ারম্যান মোজাম্মেলের লোকজন। তারা আলীকে ৬০ হাজার ও উত্তর নারায়ণপুর গ্রামের মসলেম মন্ডলের ছেলে কওসারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে। এই জরিমানা টাকা কয়েক ঘন্টার মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা ইনুর কাছে পৌছে দিতে বলে আসে। ভয়ে আলী ও কওসার টাকা পৌছে দেয় তাদের কাছে। এই বিষয়ে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুন্সী শাহীন রেজা সাঈদ বলেন, আমি এই ঘটনার সময় বনভোজনে বাইরে ছিলাম। ঘটনার রাতেই আমাকে প্রথমে ইউসুফ এবং পরে কসাই ইসরাফিলের ছেলে আলআমিন আমাকে ফোন দিয়েছিল। কিন্তু পরে মাংস বিক্রি নিয়ে যা হয়েছে তাতে চেয়ারম্যানসহ যারা শালিস করেছে তারা সম্পূর্ণ একটা অন্যায় কাজ করেছে। জরিমানা হওয়ার কথা কসাই ইসিরাফিলের তা না করে তারা উলটো আলী ও কওসার নামের একজনকে জরিমানা করেছে।

এই বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ইনু বলেন, আলী এলাকায় কথা ছড়ায় যে কসাই ইসরাফিল মরা গরুর মাংস বিক্রি করছে। সেই সংবাদে মাংস বিক্রি হয়নি এবং অনেকে নিয়ে যাওয়ার পরে ফেরত দিয়ে গেছে। আলী বিএনপি করে সেই কারণে চেয়ারম্যান আলী ও কওসারকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। এই টাকা কাকে দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কসাইকে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, এই গরুর মালিককে মাত্র ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। তাকে বোঝানো হয়েছে তোমার গরুতো মরেই গেছিলো। বাগানে ফেলে দিতে হতো সেখানে তো কিছু টাকা পাচ্ছো। জরিমানার টাকাসহ মাংস বিক্রির অর্ধেক টাকা রয়েছে চেয়ারম্যানসহ তার লোকজনের পকেটে। এই বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ অনেক কথা। তুমি এসে আমার সাথে দেখা করো। তুমি কখন আসছো? ফোনে বলা যাবে না। কসাই ইসরাফিলের কাছে ৫ কেজি মাংস লাগবে বলে ফোন দিলে সে বলে, ৫ কেজি হবে হবে না ৩-৪ কেজি হতে পারে। অথচ তারাই আলী এবং কওসারের কথা ছড়ানোর পরে মাংস বিক্রি হয়নি লোকসান হয়েছে বলে জোর পূর্বক অন্যায়ভাবে জরিমানা আদায় করে। ডাকবাংলা পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই লিটন জানান, আমরা শুনেছি মরা গরু মাংস বিক্রির কথা ছড়ানোর অভিযোগে দুই জনকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ও চেয়ারম্যানের লোকজন জরিমানা করেছে। আসলেই এটি মরা গরু কিনা সেই বিষয়ে বিস্তারিত জানিনা। এই বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা ইনুর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা ডাক্তার নিয়ে এসে পরীক্ষা করেছি। ডাক্তার বলেছে গরু ভালো। কোন ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, হলিধানীর পশু ডাক্তার দিয়ে। খোঁজ নিয়ে জানাযায়, ব্র্যাক থেকে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে এলাকায় পশু ডাক্তারি করছেন। এই বিষয়ে জেলা প্রাণী সম্পদ অফিসার ডা. আনন্দ কুমার অধিকারী বলেন, ডাকবাংলার এই ঘটনার কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে কোন গরু জবাইয়ের আগে একবার ডাক্তারি পরীক্ষা করতে হবে জবাইয়ের যোগ্য কিনা এবং জবাই করার পরে আবার পরীক্ষা করতে হবে মাংসের গ্রেড কি? কোন অংশ খাওয়ার অনুপোযোগী কিনা এই বিষয়ে জানতে। তাছাড়া জবাইকের সময় ইমাম জবাই করতে হবে ইসলামী ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এবং মরা পশুর মাংস খাওয়া হারাম বলে ঘোষণা করেছে ইসলাম ধর্মে। উত্তর নারায়ণপুর থেকে আমাদের কাছে কেউ আসেনি এধরনের কোন পরীক্ষার জন্য। তাছাড়া জবাইয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গা লাগবে সেগুলো স্থানীয় সরকার বিভাগকে দেখতে হবে। কিন্তু উত্তর নারায়ণপুর গ্রামের কয়েকজন সংবাদ কর্মীদের জানিয়েছে, এই গরু জবাইয়ের সময় না ছিল কোন ইমাম, না ছিল কোন ডাক্তার। গরু স্ট্রোক করার পরে প্রথমে কাচি দিয়ে জবাইয়ের চেষ্টা করে ইউসুফরা পরে কসাইয় এসে আবার ফের দারালো ছুরি দিয়ে জবাই করে মাংস সাইজ করে বিক্রির জায়গায় নিয়ে আসে। ইসলামের দৃষ্টিতেও এই গরুর মাংস ছিল হারাম। জরিমানার শিকার আলী জানান, সম্পুর্ণ গায়ের জোরে আমাকে জরিমানা করে গেছে। আমি একজন ভোক্তা হিসাবে আমাকে কি মাংস খাওয়াচ্ছে প্রশ্নতো করতেই পারি। কিন্তু আমাই বিএনপির সাপোর্ট করি বলে আমাকে জোরপূর্বক জরিমানা করে গেছে। আমি প্রশাসনের কাছে এর বিচার চাই। এই বিষয়ে ঝিনাইদহ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার জানান, আমরা এই বিষয়ে খোঁজ নেব। তারপর আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।