পাভেল হায়দার চৌধুরী

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হওয়ার পেছনের শক্তি/পক্ষ খোঁজার জন্য উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের বিচার সুসম্পন্ন করতে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারণ, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িতরা কেবল দণ্ডের বা শাস্তির আওতায় এসেছে। কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। শোকের মাস আগস্টের প্রথম দিনে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কন্নোয়ন বিভাগের শিক্ষাবিদদের সঙ্গে। তারা বাংলা ট্রিবিউনকে এসব কথা বলেন।

তারা বলেন, যে বিচার হয়েছে তাতে শুধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যারা জড়িত কেবল তারাই বিচার ও শাস্তির আওতায় এসেছে। অপরপক্ষগুলো বেঁচে গেছে বিচারের আওতা থেকে। তাই এই বিচারকে সুসম্পন্ন বিচার বলা যাবে না। গত বছর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, এ বিষয়ে তদন্ত কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হলেও গত এক বছরে এখনও তদন্ত কমিশন গঠিত হয়নি।

বিচার সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হেসেন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। কারণ, ষড়যন্ত্রকারী দেশে ও বিদেশে যারা ছিল সে তথ্য আমরা জানি না। কিন্তু আমাদের অধিকার আছে জানার। আমি বহুদিন থেকে দুটো দাবি জানিয়ে আসছি, একটি হলো—পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। সেই তদন্ত কমিশন এখনও হয়নি। দ্বিতীয়টি হলো—শ্বেতপত্র প্রকাশ করে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের আমাদের চিনিয়ে দেওয়ার দরকার। সেই কাজটিও আমাদের হয়নি। হয়নি বলেই ২১ আগস্ট হয়েছিল এবং শেখ হাসিনার ওপর প্রায় কুড়িবার আঘাত হানা হয়েছে। আমার শঙ্কা জাগে এসব তথ্য যদি আমাদের না জানানো হয়, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকবে। সুযোগ পেলেই কাজ করবে তারা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘এই ন্যাক্কারজনক হত্যাকাণ্ড কেন ঘটেছিল, কীভাবে প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়, অন্তরালে আরও কারা জড়িত ছিল, তা খুঁজে বের করতে গবেষণা দরকার।’ তিনি বলেন, ‘কারণ, বিচারের ক্ষেত্রে আপাতত যেটা হয়েছে সেটা হলো সামরিক বাহিনীর যে কয়জন সদস্য সরাসরি জড়িত ছিল তারাই কেবল বিচারের আওতায় এসেছে, সাজা পেয়েছে। কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে এ ধরনের ঘটনা শুধু কয়েকজন সামরিক বাহিনীর সদস্য করেছে এটা বলা বা চিন্তা করাটা খুব ডিফিকাল্ট।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্কন্নোয়ন বিভাগের এই শিক্ষক বলেন, ‘যে রাজনীতিবিদরা উৎসাহ দিয়েছে, এমনকি আমরা বিদেশি কথাবার্তা শুনি যে বেশ কতগুলো দেশ বা তাদের ব্যক্তিরা জড়িত ছিল। কিন্তু সেগুলো বড় আকারে এখনও পরিষ্কার হয়নি। তবে অন্য যারা জড়িত ভবিষ্যতে তাদের বিচার করা যাবে কিনা সেটা আমার জানা নেই। সেটা হয়তো অন্য বিষয়, কিন্তু এ ব্যাপারে আরও গবেষণা করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থকে শুরু করে আমেরিকা পর্যন্ত যারা বড় বড় দেশ ছিল তাদের ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টগুলো কী ধরনের ইন্ডিকেশন দিচ্ছিল এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে এবং কাদের নামগুলো আসছিল সেগুলো আসলে দেখা দরকার। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় ইন্টেলিজেন্স ফেইলর হয়েছিল। এতে কোনও সন্দেহ নেই। সেই ইন্টেলিজেন্স ফেইলরটা কেন ‌হলো‌? এ ধরনের একটা ন্যাক্কারজনক তৎপরতা হতে যাচ্ছে, একটা ঘটনা ঘটছে, তা কেউ জানে না। বড় একটা রাজনৈতিক দলের একাধিক ব্যক্তি জানে না। আমরা পরে দেখলাম মোস্তাক নিজেই জড়িত। তাই এসব অনেক প্রশ্নের সমাধানে আমার মনে হয় আরও গবেষণা প্রয়োজন। দেখার দরকার যে আসলেই কোন গোষ্ঠী কোন ব্যক্তি কোন দেশ কীভাবে জড়িত ছিল। সেগুলো বের করলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। হত্যাকারীদের কারো কারো শাস্তি হয়েছে। কেউ কেউ পালিয়ে আছে। এই যে একটা পরিস্থিতি এতে সন্তুষ্টির কিছু নেই। জাতি হিসেবে এটা হলো আমাদের দায়িত্ব পালন।’ তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু জাতির জনক। তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ড সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। সপরিবারে একজন জাতির জনককে হত্যা করা হয়েছে। যিনি সেই সময় সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান। অতএব এখানে বিচার হওয়াটা, শাস্তি হওয়াটা সাংবিধানিক বিধান। এই দায়িত্ব আমরা বহুদিন পালন করতে পারিনি। সাংবিধানিক অর্ডিন্যান্স জারি করে কলঙ্কিত করা হয়েছিল। সেখান থেকে মুক্ত হয়ে একটা পরিস্থিতিতে আমরা এসেছি।’

আরেফিন সিদ্দিকী বলেন, ‘সেইসঙ্গে আমি মনে করি, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের পুরো ষড়যন্ত্রটাকে উন্মোচন করা দরকার। সেই জায়গায় আমরা এখনও পিছিয়ে আছি। একজন রাষ্ট্রপ্রধান, একজন সরকারপ্রধানের সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র উন্মোচনের জন্য একটি কমিশন গঠন হওয়া দরকার। সেইটাও আমরা করতে পারিনি সময়মতো। এখন দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে। ষড়যন্ত্রকারীদের অনেকেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। এখন কমিশন অনেক কিছুই হয়তো পাবে না। তারপরও কমিশন গঠন করা দরকার।’ তিনি বলেন, ‘অনেকেই হয়তো পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্রের জাল রয়ে গেছে, সেটা তো বের করা যাবে। ওই জায়গাগুলোতে আবার রি-ভিজিট করা দরকার।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই উপাচার্য বলেন, ‘জাতির কাছে উন্মুক্ত হওয়া দরকার যে তাদের জনপ্রিয় নেতা, যিনি এই দেশকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, তার হত্যার পিছনে কে কীভাবে সহযোগিতা করেছে অথবা কে কী ভূমিকা পালন করেছে। যেমন: এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ডের পরে কমিশন হয়, সেই কমিশনের রিপোর্ট এখন সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত আছে। ঠিক একইভাবে আমাদের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আগে থেকে পর পর্যন্ত এবং এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়ার সময় বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে কেউ কেউ-কোনও কোনও গণমাধ্যম। এই যে বিষয়গুলো এগুলো কিন্তু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করে সার্বিক বিষয়গুলোকে দেখা জরুরি। যারা বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের বিরুদ্ধে যে দণ্ড হয়েছে তা কার্যকর করা, এগুলো হচ্ছে জনগণের প্রত্যাশা। আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্বও বটে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. শাতনু মজুমদার বলেন, ‘আমি মনে করি এ রকম একটি ঘৃণ্যতম অপরাধের বিচার অনন্তকাল চলার দরকার ছিল। এটার আসলে বিচার শেষ হয় না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তো বিচারের কিছুই করতে পারিনি। এটার আসলে অবিরাম বিচার হওয়া উচিত।’