নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের উর্ধ্বমুখিতা অব্যাহত রয়েছে। টানা তৃতীয় দিনের মত হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর ফলে দৈনিক শনাক্তের হার আবারো ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এতে করে দুশ্চিন্তা বাড়ছে মানুষের মনে। এভাবে সংক্রমণ বাড়লে আবারো কি লক ডাউন নেমে আসবে দেশে- এমন প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে অনেকের মনে। তবে লক ডাউনের মতো কর্মসূচিতে আপাতত না গেলেও স্বাস্থ্যবিধি মান্য করতে কঠোর হতে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যেই ডিসিদের কাছে পাঠানোও হয়েছে নির্দেশনা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দৈনিক শনাক্তের হার সর্বশেষ এর চেয়ে বেশি ছিল গত ৫ জানুয়ারি। সেদিন পরীক্ষার তুলনায় রোগী শনাক্তের হার ছিল ৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এরপর কমতে কমতে তা ৩ শতাংশের নিচেও নেমেছিল। তবে মার্চের শুরু থেকে শনাক্তের হার আবারো বাড়ছে। শুক্রবার তা দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৬২ শতাংশে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ১ হাজার ৬৬ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। এ পর্যন্ত শনাক্ত কোভিড-১৯ রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ২২২ জন।

এর আগে সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক দিনে এর চেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের তথ্য দিয়েছিল, সেদিন ১ হাজার ৭১ জনের মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরো জানিয়েছে, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে গত এক দিনে আরো ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে মৃতের মোট সংখ্যা পৌঁছেছে ৮ হাজার ৫১৫ জনে।

বাংলাদেশে গত বছর ৮ মার্চ করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ার এক বছর পর গত ৭ মার্চ শনাক্ত রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে গত বছরের ২ জুলাই ৪ হাজার ১৯ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়, যা এক দিনের সর্বোচ্চ শনাক্ত।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেইন জানান, শীতে বাড়তে পারে এমন আশঙ্কা থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অফিস-আদালত সর্বত্র কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়েছিল গেল শীতকালে। ফলে করোনা সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। কিন্তু এখন মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যাচ্ছে। ফলে আবারো বাড়ছে সংক্রমণ।
তিনি বলেন, এখন সরকারের করণীয় দুইটি। স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করা এবং টিকাদান সম্প্রসারণ করা। স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য ইনডোর সভা-সমাবেশ বাতিল করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন থাকলে করোনা তেমন ছড়ায় না। ফলে ভেন্টিলেশন নিশ্চিত করা দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন খুলে দেয়া হবে তখন জানালা, দরজা খোলা রাখতে হবে শ্রেণিকক্ষের। এসি চালানো যাবে না।

টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে পারলে মৃত্যুঝুঁকি কমাবে। টিকা নেয়া মানুষ আক্রান্ত যদি হয়েও থাকে তবু জীবন সংকটে পড়বে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃদু লক্ষণ প্রকাশিত হতে পারে। তাই টিকাদান কর্মসূচি নিশ্চিত করতে হবে বলেও জানান ডা. মুশতাক।

এদিকে সংক্রমণ বাড়ায় জনমানুষের মনে শঙ্কাও বাড়ছে। আবারো কি লক ডাউন আসতে পারে এমন প্রশ্নও অনেকে করছেন। সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলেও সরকারের দৃশ্যত কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ অনেকের।

তবে লক ডাউনের মতো কর্মসূচিতে সরকারের যাওয়ার আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে দেশের জেলা প্রশাসকদের কাছে সভা-সমাবেশ সীমিত করার জন্য চিঠি পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত বুধবার ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘মানুষজন সামাজিক দূরত্ব মানছে না এবং মাস্ক পরছে না। সে কারণেই এখন সংক্রমণের হার বেশি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

তিনি আরো বলেন, ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক সমাবেশ সীমিত করতে আমরা ইতোমধ্যে দেশব্যাপী ডিসিদের নির্দেশনা পাঠিয়েছি।’ শিগগিরই স্বাস্থ্যবিধি মানার আহ্বান জানিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রচার করা হবে বলেও জানান তিনি।

২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্তের ঘোষণা আসে। দেশে প্রথম করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তির মৃত্যুর ঘোষণা আসে ১৮ মার্চ। এ বছর ১১ মার্চ তা সাড়ে আট হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে গত বছরের ৩০ জুন এক দিনেই ৬৪ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়, যা এক দিনের সর্বোচ্চ মৃত্যু।

দেশে সংক্রমণ শুরুর দিকে রোগী শনাক্তের হার কম ছিল। গত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত রোগী শনাক্তের হার ২০ শতাংশের ওপরে ছিল। এরপর থেকে নতুন রোগীর পাশাপাশি শনাক্তের হারও কমতে শুরু করেছিল। মাস দুয়েক সংক্রমণ নিম্নমুখী থাকার পর গত নভেম্বরের শুরুর দিক থেকে নতুন রোগী ও শনাক্তের হারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়। ডিসেম্বর থেকে সংক্রমণ আবার কমতে শুরু করে। তবে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সংক্রমণ আবার উর্ধ্বমুখী।

করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে গত ২৭ জানুয়ারি দেশে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। এদিন গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়।

বিশ্বে শনাক্ত কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ১১ কোটি ৮৬ লাখ পেরিয়েছে, মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২৬ লাখ ৩০ হাজার। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বিশ্বে শনাক্তের দিক থেকে ৩৩তম স্থানে আছে বাংলাদেশ, আর মৃতের সংখ্যায় রয়েছে ৩৯তম অবস্থানে।