সৈয়দ মিঠুন, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি: একদিকে করোনা, অন্যদিকে প্লাস্টিকের পাটির আধিপত্য। সবমিলিয়ে চরম সংকটে কাটছে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার বেতের পাটিশিল্পীদের জীবন। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত উপজেলার প্রায় ৪০০ পরিবার পড়েছে মারাত্মক আর্থিক সংকটে।

সরেজমিনে উপজেলার পাটিশিল্পপ্রধান গ্রাম ঘুরে এ কাজে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। অনেক পাটিশিল্পী বাধ্য হয়ে পেশা বদল করে ফেলেছেন।

পাটিশিল্পীরা জানান, ঘাটাইল উপজেলার কুতুবপুর, পাকুটিয়া, বাণীবাড়ি, রৌহা, রামপুর, নাগবাড়ি গ্রামের প্রায় ৪০০ পরিবার জাতিসংঘের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পণ্য পাটিশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এসব পরিবার আবহমান কাল ধরে বংশ পরম্পরায় পাটি বুনে জীবনধারণ করে আসছে। এখান থেকে তাদের যা আয় হতো তা দিয়েই সংসার চলে যেত। সন্তানদের পড়ালেখাও চলছিল এ আয় দিয়েই। কিন্তু একদিকে প্লাস্টিকের পাটির কারণে বেতের পাটির চাহিদা কমেছে। অপরদিকে গতবছর থেকে মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে যুক্ত হয়েছে করোনা মহামারী।

কুতুবপুর গ্রামের পাটিশিল্পী গোপাল চন্দ্র পাল (৩২) বলেন, ‘গত কয়েক বছরে আমাদের অনেকে এ ব্যবসা ছেড়ে দেওয়ায় কাঁচামালের সংকট কিছুটা কমেছিল। বেতের বাগান পর্যাপ্ত থাকায় দর কাষাকষি করে বেত কেনা যেত। এ কারণে মোটামুটি স্বস্তিতে ব্যবসা চলছিল। কিন্তু প্লাস্টিকের পাটি আর করোনা চরম বিপদে ফেলেছে আমাদের। হাট-বাজার বন্ধ থাকার কারণে পাটি বিক্রি করতে পারছি না। বোনা পাটি ঘরের মধ্যেই পড়ে আছে।’

রামপুর গ্রামের হরিদাশ পাল, রামজীবন পুরের নারায়ণ পাল এরই মধ্যে পেশা পরিবর্তন করেছেন। তারা জানান, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পেশাটি পরিবর্তন করতে তাদের অনেক খারাপ লেগেছে। কিন্তু উপায় ছিল না। বাধ্য হয়েই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে তারা এখন দিনমজুরের কাজ করছেন।

হরিদাশ পাল বলেন, ‘বাপ-দাদার পেশা কী সাধে ছাড়ছি দাদা। এমনিতে ট্যাহা-পয়সা নাই, তার ওপর পাটি বেচতে পারি না।’

নিজের থাকার ঘরে স্তূপ করে রাখা পাটি দেখিয়ে বৃদ্ধা কল্পনা পাল বলেন, ‘আমাগো কি এতো সামর্থ্য আছে যে ঘরে পাটি জমাইয়া রাখমু।’

এছাড়া রৌহা গ্রামের পদ্মা রানী পাল, অমল চন্দ্র ও পরিতোষ চন্দ্র দেব জানান, তারা সবাই এই গ্রামের তৃতীয় প্রজন্মের পাটিশিল্পী। পাটি বোনায় তাদের রয়েছে বিশেষ দক্ষতা। শীতল পাটির একটি স্থানীয় ধরন তৈরি করেছেন তারা। দাম কম হওয়ায় এর চাহিদা বেশি। এ থেকে তাদের আয়ও ভালো হয়। কিন্তু করোনার কারণে পাটি বিক্রি করতে পারছেন না তারা। ফলে তারা মহাবিপদে পড়েছেন।

তারা আরও জানান, এনজিও থেকে ঋণ করে ব্যবসা বাড়িয়েছিলেন। এখন পাটি বিক্রি হচ্ছে না কিন্তু ঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে হচ্ছে।