নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
জাকাত ফান্ড অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ রহিত করে জাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) এবং ১৪৬(৩) ধারা বাতিল করা হচ্ছে। এর ফলে ধর্ষণের অভিযোগ বিচারের ক্ষেত্রে নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ বন্ধ হচ্ছে। আর পরিত্যক্ত বাড়ির মামলা পরিচালিত হবে কোর্ট অব সেটেলমেন্টে। এ ছাড়া বিচারপতিদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত চারটি প্রস্তাবনা আজ সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, এখন থেকে জাকাত তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করবে সরকার। প্রবাসী বাংলাদেশী, বিদেশী ব্যক্তি বা সংস্থা থেকে পাওয়া অর্থ যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের জাকাত ফান্ডে জমা দিয়ে জাকাত আদায় করতে পারবে। চেয়ারম্যান হিসেবে ধর্মমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি বোর্ড থাকবে। মন্ত্রণালয়ের সচিব থাকবেন ভাইস চেয়ারম্যান ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সদস্যসচিব। সরকার স্থানীয়ভাবে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ ব্যবস্থার সুবিধার্থে সিটি করপোরেশন, বিভাগ, জেলা এবং উপজেলাপর্যায়ে প্রয়োজনীয় কমিটি গঠন করতে পারবে। কোনো ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান অথবা এনজিও দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জাকাত গ্রহণ বা বিতরণের ক্ষেত্রে জাকাত বোর্ডের পূর্র্ব-অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। বিগত দিনে সরকারিভাবে জাকাত সংগ্রহের জন্য পরিপূর্ণ কোনো আইন ছিল না। এটি অধ্যাদেশ দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল। এ লক্ষ্যে জাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন-২০২২ চূড়ান্ত প্রণয়ন করছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এটি আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার ভার্চুয়াল বৈঠকে অনুমোদন হতে পারে।

জাকাত তহবিলের প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, সরকারিভাবে সংগ্রহ করা জাকাতের অর্থ ইসলামী শরিয়াহ বিধান অনুযায়ী এবং যথাসময়ে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। জাকাত দেয়া কোনো ব্যক্তি জাকাত পাওয়ার যোগ্য অন্য কোনো ব্যক্তির তথ্য প্রদান করতে পারবে। একই ব্যক্তি জাকাত গ্রহণের যোগ্য হলে তাকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। জাকাত তহবিল নামে একটি তহবিল থাকবে, যা মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জাকাতের অর্থে গঠিত হবে। সরকার প্রয়োজনবোধে স্থানীয়ভাবে জাকাত তহবিল সংরক্ষণ করার জন্য অনুমতি প্রদান করতে পারবে। তহবিলে সংগৃহীত অর্থ বোর্ড অথবা ক্ষেত্রমতো কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক কোনো তফসিলি ব্যাংক ‘সরকারি জাকাত ফান্ড’ শিরোনামে সুদহীন হিসেবে গচ্ছিত রাখতে হবে।

জাকাত বোর্ডে সদস্য থাকবে ১০ জন। জেলা ও উপজেলাপর্যায়ে কমিটি করে দেবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে। সংগ্রহ ও বিতরণ তারা করবেন। কাকে কাকে কিভাবে দেবেন এটা তারা ঠিক করবেন। তাদের ব্যাংকে একটি হিসাব থাকবে, সেখান থেকে তারা সংগ্রহ করবেন।

ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকছে না : ধর্ষণ মামলার আইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এই আইনে পরিবর্তন করতে একটি খসড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক মতামত প্রদান-সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশের জন্য সারসংক্ষেপ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জামা দিয়েছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত আইনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্য চিহ্নিতকরণ ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ, প্রমাণের দায়ভার, অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি ও আদালতের সাক্ষ্য উপস্থাপনসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণ করা লক্ষ্যে এভিডেন্স (অ্যামেন্ডমেন্ট)-১৮৭২ আইন প্রণয়ন করা হয়। সাক্ষ্য সম্পর্কিত এরূপ বিধিবদ্ধ একক আইন এই উপমহাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই। এমন বাস্তবতার নিরিখে এভিডেন্স (অ্যামেন্ডমেন্ট)-১৮৭২ আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। বিদ্যমান আইনে ধর্ষণ মামলার ভিকটিমকে জেরাকালে তার চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে, যা নারীর জন্য মর্যাদাহানিকর ও আইনের চোখে সমতা নীতি পরিপন্থী। এমতাবস্থায় বিদ্যমান আইন সংশোধন করে ধর্ষণ মামলার ভিকটিমকে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন করা সম্পর্কিত বিধানটি বিলুপ্ত করা আবশ্যক।

আইনসচিব গোলাম সারওয়ার স্বাক্ষরিত সারসংক্ষেপে আরো বলা হয়, এভিডেন্স (অ্যামেন্ডমেন্ট) ১৮৭২ ইংরাজি ভাষায় প্রণীত। ওই আইনের বিভিন্ন ধারা বা গুরুত্বপূর্ণ অভিব্যক্তিগুলো উচ্চ আদালত বিষয়টি ইংরেজি ভাষায় ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে ইতোমধ্যে নজির আকারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাক্ষ্য আইন বাংলা ভাষায় নতুন করে প্রণয়ন করা হলে উচ্চ আদালতের রায়ে ব্যবহƒত অভিব্যক্তিগুলো ফের ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে যা পরে আইনি জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে আইনটি ইংরেজি ভাষায় থাকা সমীচীন হবে। এ প্রেক্ষিতে বিচারকার্যে সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে সাক্ষ্যদানের লক্ষ্যে বিদ্যমান আইন সংশোধন করে এভিডেন্স (অ্যামেন্ডমেন্ট) আইন, ২০২২ এর খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকার। এ ছাড়া ধর্ষণ মামলার ভিকটিমকে তার চরিত্র সম্পর্কে জেরা করা সম্পর্কিত বিধান বিলুপ্ত হবে।

পরিত্যক্ত বাড়ির মামলা কোর্ট অব সেটেলমেন্টে : স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক বাড়িঘর, কারখানা-প্রতিষ্ঠান ও স্থাবর সম্পত্তির মালিকদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরেও এসব সম্পত্তির খোঁজ কেউ করেনি। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির ১৬ নম্বর আদেশে এসব সম্পত্তিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পরে গেজেট প্রকাশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে জাল দলিল ও নথিপত্র তৈরি করে জালিয়াতচক্র প্রচুর পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক হয়ে যায়। এমন জালিয়াতি ঠেকাতে পরিত্যক্ত সম্পত্তির বাড়ি (সম্পূরক বিধানাবলি) আইন ২০২১ এর খসড়া মন্ত্রিসভায় উঠছে আজ। আইনটি কার্যকর হলে পরিত্যক্ত বাড়ি বিষয়ে কোনো মামলা কোর্ট অব সেটেলমেন্ট ছাড়া অন্য কোনো দেওয়ানি আদালতে বিচারাধীন থাকলে তা অচল হয়ে যাবে। অর্থাৎ পরিত্যক্ত বাড়িবিষয়ে মামলা নিষ্পত্তি হবে কোর্ট অব সেটেলমেন্টে। এ জন্য কোনো আদেশ জারির প্রয়োজন হবে না। এ ছাড়া দেওয়ানি আদালতের রায়, আদেশ বা ডিক্রি অকার্যকর ও ফলবিহীন বলে গণ্য হবে।
আইনে বলা হয়েছে, কোনো বাড়ির ওপর কোনো অধিকার কিংবা স্বার্থ আছে দাবিদার ব্যক্তি সরকারি গেজেটে তালিকাটি প্রকাশিত হওয়ার তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে ওই তালিকা থেকে ওই বাড়িটি বাদ দেয়ার জন্য কিংবা অন্য কোনো প্রতিকারের জন্য এই যুক্তিতে কোর্ট অব সেটেলমেন্টে আবেদন করতে পারবেন যে, বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি নয় এবং রাষ্ট্রপতির আদেশের অধীনে তা সরকারের কাছে অর্পিত হয়নি। কিংবা ওই আদেশের বিধানাবলি দ্বারা বাড়িটির ওপর তার স্বার্থ বা অধিকার ক্ষুণœ হয়নি। তবে ইতঃপূর্বে যেসব বাড়ির মামলায় আদালত কর্তৃক সরকারের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেসব বাড়ির ক্ষেত্রে কোর্ট অব সেটেলমেন্টে স্বার্থ দাবি করে কেউ মামলা করতে পারবে না। কোর্ট অব সেটেলমেন্টে একজন চেয়ারম্যান এবং দু’জন সদস্য থাকবেন। চেয়ারম্যান হবেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বা অতিরিক্ত বিচারপতি পদে আছেন বা ছিলেন কিংবা ওই পদের যোগ্য। অপর দু’জন সদস্যের মধ্যে একজন হবেন বিচারিক কর্মকর্তা যিনি অতিরিক্ত জেলা জজ পদে আছেন বা ছিলেন। আর অপর সদস্য হবে কমপক্ষে উপসচিব মর্যাদার কর্মকর্তা।

বিচারপতিদের সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে : বিচারপতিদের বিভিন্ন সুযোগসুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অবসরকালীন বেশ কিছু সুবিধা বাড়িয়ে খসড়া প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সেগুলো যাচাই-বাছাই করে আজ মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আইন মন্ত্রণালয়ের পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, সামরিক শাসনামলে জারীকৃত অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আনি ও বিচার বিভাগের আওতাধীন সুপ্রিম কোর্ট জাজ (লিভ, পেনসন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) অর্ডিনেন্স, ১৯৮২ সময়োপযোগী করে নতুন আইন আকারে বাংলা ভাষায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারক (ছুটি, পেনশন ও বিশেষাধিকার) আইন, ২০২২ খসড়া প্রস্তুত করা হয়। প্রস্তাবিত খসড়া আইনটি সময়োপযোগী করার উদ্দেশ্যে পূর্বের আইনের কিছু বিধান সংশোধন করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের ২৪ এপ্রিল ২০১৯ তারিখের স্মারকমূলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টেও বিচারকগণ পেনশন পুনঃস্থাপন সংক্রান্ত সুবিধাদি ইতোমধ্য প্রাপ্ত হওয়ায় এবং চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫ অনুসারে সরকারি কর্মচারীগণ ১৮ মাসের ছুটি নগদায়ন সুবিধা ভোগ করায় বিচারকগণের জন্য এরূপ সুবিধাদি খসড়া আইন অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তা ছাড়া আইনজীবী হতে নিযুক্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণের ভবিষ্য তহবিল সংক্রান্ত বিধান সংযোজন করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির অবসরোত্তর সুবিধা সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্তি ও প্রস্তাব করা হয়েছে।