এমরান হোসেন, জামালপুর প্রতিনিধি: হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে আর বাঁশিতে দেশাত্ববোধক ও বিভিন্ন গানের সুরেলা সুর তুলে ৪১ বছর
ধরে জীবন জীবিকার তাগিদে ছুটে চলছে মোশারফ হোসেন। বাঁশিতে সুর তুলে ক্লান্তিহীন পথভোলা পথিকের মতো অবিরত হাঁটছেন তিনি দেশের বিভিন্ন জেলার পথে প্রান্তরে। ৬৫ বছর বয়সী মোশারফ এভাবেই বাঁশের তৈরি বাঁশি বিক্রির আয় দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নের ঘোষেরপাড়া গ্রামে তার বাড়ি।

আজ সরিষাবাড়ী উপজেলার ভাটারা ইউনিয়নের ভাটারা স্কুল এ্যান্ড কলেজের মাঠে শহীদ মিনারে বসে তাকে বাঁশি তৈরী, বিক্রি ও বাজাতে দেখা গেছে। তার বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে ফারজানা আক্তার জীম (৭) দেখতে তার কাছে এগিয়ে গেলে তাকে একটি বাঁশি উপহার দেন।

জানা যায়, মোশারফ হোসেন শিশুকাল থেকেই ছিলেন ভবঘুরে স্বভাবের। বিভিন্ন মেলার মাঠে ও হাট-বাজারে যেতেন বাবার সাথে ছোটবেলা থেকেই। বর্তমানে ছোট ছোট প্লাষ্টিকের পাইপ দিয়ে বাঁশি তৈরী করে হাট বাজার, স্কুল কলেজ, বিভিন্ন মেলার মাঠে সেসব বাঁশি বিক্রির লাভের টাকা দিয়ে চলছে মোশারফ হোসেনের সংসার। সংসার চালাতে গিয়ে নিত্য দিনের চাহিদা মেটাতে বেকায়দায় পড়েন তিনি। নিজের বাঁশি বাজানোর বিদ্যাটুকু কাজে লাগিয়ে খুঁজে নেন চলার শক্তি।আর এভাবেই দীর্ঘ ৪১ বছর ধরে ভ্রাম্যমাণ বাঁশির ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।

বাঁশি তৈরি সম্পর্কে মোশারফ হোসেন জানান, প্রথমে ভালো দেখে চিকন বাঁশ কিনতে হয়। বাঁশগুলো কিনার পর বাঁশির মাপ অনুযায়ী কেটে নিতে হয়। ২০০/৩০০ টি কাঁচা বাঁশ কিনলে এরমধ্যে থেকে প্রায় শতাধিক বাঁশ ফেটে নষ্ট হয়ে যায়।পর্যায়ক্রমে বাঁশগুলো রোদে শুকিয়ে নিয়ে বাঁশি তৈরীর কাজ শুরু করতে হয়।তারপর বাঁশগুলো হাপরের আগুনে পুড়িয়ে নিয়ে রজন, স্প্রিট, চাচ দিয়ে শিরিশ করার পর গরম লোহার রড দিয়ে বাঁশগুলো ফুটো করতে হয়। প্রথমে চিকন রড তারপর মিডিয়াম তারপর মোটা রড দিয়ে ছিদ্র করতে হয়। এক্ষেত্রে মোটা চিকন সবমিলে ৫ টি রড লাগে। আঁড় বাঁশিতে সাধারণতো ৩ থেকে ৪ টি অথবা ৫ থেকে ৭টি ছিদ্র থাকে। এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক যন্ত্রপাতির। অর্থাভাবে সেসব যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে না পারায় কোন রকমে তার পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি আরো বলেন,বাঁশিগুলোকে কয়েকটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। তন্মধ্যে এ, বি, সি, ডি ও এফ কোয়ালিটির বাঁশিগুলো বেশ জনপ্রিয়। প্রতিটি বাঁশি তৈরীতে খরচ হয় ১০ থেকে ১৫ টাকা। আর প্রতিটি বাঁশি বিক্রি হয় ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকায়। বর্তমানে বাঁশের দাম বেশী হওয়ায় তিনি বাঁশিগুলো প্লাষ্টিকের ছোট ছোট পাইপ দিয়ে তৈরী করছেন। প্লাস্টিকের বাঁশি বিক্রিয় করেন ১০/২০ টাকা। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন বাঁশি বিক্রির জন্য বিভিন্ন এলাকার হাট-বাজার ও দর্শনীয় স্থান গুলোতে বাস, ট্রেন অথবা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াই। এতে প্রতিদিন ১/২’শ টাকা আয় হয়। জমিজমা না থাকাই শুধুমাত্র বাঁশি বিক্রির উপার্জন দিয়েই অতিকষ্টে সংসার চালাতে হয়।

তিনি আরো বলেন- বাঁশি বিক্রি হয়, বাঁশির সুর কখনো বিক্রি হয় না। এটি আমার আত্মার খোরাক। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাঁশির সুর পরিবেশন এর সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। তিনি সর্বস্তরের জনগণ ও বিত্তবানদের নিকট সহযোগীতা কামনা করেছেন তার স্বপ্নপূরণে।