আল-আমিন শেখ, টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি: টাঙ্গাইলে বেদখল হয়ে যাওয়া লৌহজং নদ উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রাখা এবং নদকে ঘিরে নেয়া নানা উন্নয়ন কার্যক্রম শঙ্কার মুখে পড়েছে। নদের তীরের বাসিন্দা একটি পরিবার তাদের জমির বৈধ মালিকানা দাবি করে মামলা এবং জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী, মেয়রসহ ১৪ জনকে বিবাদী করে ক্ষতিপূরণ চেয়ে টাঙ্গাইল যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতে পৃথক দুটি মামলা করায় এই আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন তারা আইনী মোকাবেলার পাশাপাশি বিধান মেনেই নদের দখলমুক্ত অভিযান অব্যাহত রাখবেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রæয়ারি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের নির্দেশে লৌহজং নদটিকে অবৈধ দখলদার মুক্ত করার জন্য সহকারি কমিশনারের (ভূমি) মাধ্যমে নোটিশ জারি করেন। নোটিশের তথ্যমতে নদ তীরের দশ মিটার পর্যন্ত সীমার মধ্যে কোন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে না। নোটিশ প্রদানের ১২দিন পর ২৫ ফেব্রæয়ারি লৌহজং নদের তীরবর্তি একটি জমিতে নির্মিত সাত তলা ভবনের অংশ বিশেষ ভেঙে দেওয়া হয়।

উক্ত জমির বৈধ মালিকানা এবং জমির উপর নির্মিত ভবনটি ভেঙে দেয়ায় বিপুল অংকের টাকা ক্ষতি হয়েছে দাবি করে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর পাঁচজন বাদি হয়ে টাঙ্গাইলের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতে সাত কোটি ৯৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করেন।

মামলার বাদিরা হলেন টাঙ্গাইল পৌরসভার স্টেডিয়ামপাড়া এলাকার মো. হাতেম আলী দেওয়ানের ছেলে জমশের আলী, আ. কাইয়ুম বাবলুর স্ত্রী রোকেয়া বেগম রিনা, মাহবুব ইসলাম মিলনের স্ত্রী সোনিয়া ইসলাম রুমি, মো. জমশের আলীর মেয়ে সুমি আক্তার এবং ছেলে রফিকুল ইসলাম।

মামলায় বিবাদী করা হয়েছে ১৪ জনকে। এরা হলেন জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি), টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র, স্টেডিয়ামপাড়া এলাকার মৃত খোরশেদ আলীর ছেলে মো. নুরুল ইসলাম, আব্দুল বাছেদের স্ত্রী মোছাঃ নাজমা আক্তার, তায়াফ্ফাল হকের স্ত্রী আয়েশা খাতুন, লৌহজং নদ ও পরিবেশ রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক রতন সিদ্দিকী এবং স্টেডিয়ামপাড়া এলাকার আব্দুল হামিদের স্ত্রী নাজমা হামিদ, ছাত্তার মিয়ার স্ত্রী শাহনাজ আক্তার, মৃত কেরামত আলীর ছেলে মজিবর রহমান ও মতিয়ার রহমানের স্ত্রী সাহিদা দিল আফরোজ।

মামলার বাদি জমশের আলী জমিটির বৈধ মালিক দাবি করে বলেন, ১৯৮৮ সালে ৬৪ দাগের সাড়ে ১৯ শতাংশ জমি আমি সাবকবলা মূলে আমার স্ত্রীর নামে ক্রয় করি। এর আগে ১৯৭৩ সালে একই দাগের ১১৬ শতাংশ জমি জেলা প্রশাসন ক্রয় করলেও আদালতের রায়ে সেখান থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ জমির বৈধতা পায় জেলা প্রশাসন। অথচ আমার জমিটি নদীর জায়গা মনে করে আমার সাত তলা ভবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভবনের অবশিষ্ট অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভবনটি না ভাঙতে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রæয়ারি হাইকোর্ট একটি আদেশ প্রদান করেন। কিন্তু আদেশ অমান্য করে আমার ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। এতে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতে আমি একটি ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করেছি। মামলার পরবর্তি শুনানী আগামী ৩০ মার্চ। একই সাথে আমার জমির বৈধতা দাবি করে আরেকটি মামলা দায়ের করেছি। নদী আইনের যে ধারায় আমার স্থাপনা ভাঙা হয়েছে সেই আইন এই নদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলেও দাবি করেন তিনি।

সরেজমিন নদের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, টাঙ্গাইল পৌর এলাকার ভেতর দিয়ে বয়ে চলা প্রায় ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক সময়ের খরস্রোতা নদটি দখলে দূষণে সরু খালে পরিণত হয়েছে। শুধুমাত্র শহরের অংশে বিভিন্ন ব্যক্তি প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়ে অসংখ্য ছোট-বড় স্থাপনা ও ভবন নির্মাণ করে বেদখল করে আছে। আর এতে পানির প্রবাহ বাঁধাগ্রস্থ হয়ে নদটির নাব্যতা হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে।

মৃতপ্রায় নদটিকে উদ্ধারের জন্য ২০১৬ সালে টাঙ্গাইলের সর্বস্তরের মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ গ্রহণ করে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ভূমি অফিস যৌথভাবে নদীর সীমানা নির্ধারণ কার্যক্রম শুরু করে। একই সাথে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি ও এই উদ্ধার অভিযানের সাথে সম্পৃক্ত করতে পরামর্শ, সভা, সেমিনার, প্রচারণা, লীফলেট বিতরণ, আলোকচিত্র প্রদর্শণসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয়। প্রায় দু’বছর ধরে চলে এই কার্যক্রম। ২০১৬ সালের ২৯ নভেম্বর বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুখরিত হয়ে উঠে লৌহজং নদের তীর। এরই মধ্যদিয়ে শুরু হয় নদটির দখল ও দূষণমুক্ত অভিযান। সদর উপজেলার ঢালান শিবপুর এলাকায় ধলেশ্বরী নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে মির্জাপুর উপজেলার বংশাই নদীতে মিলিত হওয়ার পূর্বে লৌহজং নদটি দীর্ঘ প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। নদটি উদ্ধারে সকলের প্রত্যাশা থাকলেও কাউকে বলপূর্বক ক্ষতিগ্রস্থ না করার আহবান জানিয়েছেন সচেতন মহল।

নদী, খাল-বিল, জলাশয়, বন ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক রতন সিদ্দিকী বলেন, ২০১৬ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে টাঙ্গাইলের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে লৌহজং নদ উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর নদী তীরের একটি ভবনকে অবৈধ বলে চিহ্নিত করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সেই প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন থেকে ভবন মালিককে নোটিশ করা হয় স্থাপনা সরিয়ে নিতে। কিন্তু ভবন মালিক তা না করায় প্রশাসন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে দেন। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা পরিবেশবাদীরা সরব থাকায় আমার বিরুদ্ধেও ক্ষতিপূরণ মামলা করা হয়েছে।

উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, নদী আইনের উপর সুপ্রীম কোর্টের একটি রায় আছে। যদি সিএস রেকর্ড ব্যক্তি মালিকানা থাকে তবুও নদীর ৩০ ফিটের মধ্যে কোন স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। এরই আলোকে নদী তীরের অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে যে মামলা হয়েছে তা মোকাবেলা করার জন্য আমরা প্রস্তুত রয়েছি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা যথাযথ নিয়ম ও বিধি মেনেই লৌহজং নদের সীমানা নির্ধারণ ও উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছি। এ বিষয়ে আমরা কোন ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান দ্বারা প্ররোচিত হইনি। আমাদের বিরুদ্ধে যে মামলাটি করা হয়েছে তা মোকাবেলা করার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। আদালত যে ফয়সালা দিবে আমরা সেটাই মেনে নিবো।

টাঙ্গাইল পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র এসএম সিরাজুল হক আলমগীর বলেন, আমি সবেমাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। লৌহজং নদ উদ্ধার বিষয়ে আমরা সবাই জানি। তবে মামলার বিষয়টি আমি অবগত নই। মামলার বিষয়ে আইনগতভাবে যা করণীয় আমরা তাই করবো।

জেলা প্রশাসক ড. মোঃ আতাউল গনি বলেন, মামলার জবাব আমরা আইনগতভাবেই দিবো। যে কোন দখল, দুষণের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। দখল, দুষণ নিয়ে যারাই অপতৎপরতা চালাবে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এসিল্যান্ডসহ সকল কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।