শহর থেকে প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ সংযোগ। সেই সুবাদে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ফ্রিজের ব্যবহার বেড়েছে। অতিপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলছেন দৈনিক কালের কন্ঠের সাথে মিনিস্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি এম এ রাজ্জাক খান রাজ। তাঁর সাক্ষাৎকারটি দৈনিক এই আমার দেশ পত্রিকার বৃহত্তর পাঠকের জন্য হুবহু প্রকাশ করা হলো।- বার্তা সম্পাদক

-ফ্রিজের ব্যবসায় আপনাদের যাত্রা কখন? সাফল্যের কারণ কী?
এম এ রাজ্জাক খান রাজ : ২০০২ সালে পাঁচজন কর্মচারী নিয়ে সাদাকালো টেলিভিশনের মাধ্যমে মিনিস্টার ইলেকট্রনিকস বাজারে যাত্রা শুরু করলেও কয়েক বছরের মধ্যে দেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা পাওয়ায় আমরা কালার টেলিভিশন ও ফ্রিজের যাত্রা শুরু করি। ২০০৫ সালে ফ্রিজ অ্যাসেম্বলিং শুরু করেছি এবং ২০১৩ সাল থেকে আমরাই ম্যানুফ্যাকচারিং করছি। আমরা সফলতার সঙ্গে ২০ বছর পার করলাম। এই সফলতার পেছনে সব থেকে বড় অবদান ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার।
তাঁর সহযোগিতায় আজ আমরা দেশীয়ভাবেই সব ধরনের পণ্য বাজারে নিয়ে আসতে পেরেছি। সেই সঙ্গে কর্মীদের আত্মবিশ্বাস আর মানুষের ভালোবাসাই আমাদের এতদূর নিয়ে এসেছে।

-দেশের বাজারে ফ্রিজের চাহিদা কেমন?
এম এ রাজ্জাক খান রাজ : একটা সময় ছিল যখন দেশে ব্যবহৃত ফ্রিজগুলো আমদানি করা হতো। এখন সেই জায়গায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে দেশীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ড। ফ্রিজ অনেক বেশি সহজলভ্য হওয়ায় জনসাধারণের কাছে বিস্তৃত হয়েছে এর বাজারও। দেশে প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ লাখ ফ্রিজ বিক্রি হচ্ছে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৬০ কোটি ডলার। এটি চলতি বছর আরো বাড়বে বলে আমরা ধারণা করছি। একই সঙ্গে এ খাতে কর্মক্ষেত্রও বাড়ছে ব্যাপক হারে।

-বাজারে আপনাদের প্রবৃদ্ধি কেমন হচ্ছে?
এম এ রাজ্জাক খান রাজ : বর্তমান সরকারের শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে গ্রামকে শহরের পরিণতি করা, কম খরচে দেশীয় ফ্রিজ কেনার সক্ষমতা এবং ফ্রিজ বিক্রির ব্যবস্থায় ক্রেতাবান্ধব শর্তাবলি (যেমন—কিস্তিতে ক্রয়, গ্যারান্টি, পুরাতন দিনে নতুন নেওয়ার ব্যবস্থা, শূন্য শতাংশ ডাউন পেমেন্টসহ ইত্যাদি) ফ্রিজ মার্কেটে প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা পালন করছে দেশীয় ফ্রিজ। ফলে পণ্যটি ব্যবহারের হার শহরের চেয়ে গ্রাম ও উপশহরগুলোয় এখন অনেক বেশি হারে বাড়ছে। বর্তমানে দেশের রেফ্রিজারেটর বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ দখল করে রেখেছে মিনিস্টার মাইওয়ান গ্রুপ। আগামী দিনে এই হার আরো বাড়বে বলে আশা করছি। এ ছাড়া গড়ে বছরে এক লক্ষাধিক ইউনিট ফ্রিজ, এসি ৫০ হাজার এবং আরো প্রায় ৫০ হাজার টিভি ও এর লক্ষাধিক হোম অ্যাপ্লায়েন্সের আইটেম আমরা উৎপাদন করছি। আমরাই প্রথম ফ্রিজ এবং এসিতে ১২ বছর এবং টিভিতে সাত বছর (প্যানেল চার বছর) ওয়ারেন্টি সেবার ঘোষণা দিই। দেশের সব জেলায় আমাদের নিজস্ব শোরুম অথবা ডিলার ফ্র্যাঞ্চাইজিং শোরুম রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজারের বেশি। আর বাজারের দিক থেকে দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এখন আমরা দ্বিতীয় অবস্থানে আছি।

-ইলেকট্রনিক শিল্প এগিয়ে নিতে কেমন নীতি সহায়তা চান?
এম এ রাজ্জাক খান রাজ : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশ শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় এসেছে। এর পুরো সুফল দেশের ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তি শিল্প। তবে করোনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্যের কাঁচামাল এবং খুচরা যন্ত্রাংশের দাম ব্যাপক বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন শিল্প খাতে। এমন অবস্থায় স্থানীয় ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তি খাতে আমদানি ও রপ্তানিতে ব্যাপক সহায়তার প্রয়োজন। তা না হলে এসব পণ্যের দাম আরো বাড়বে, যা ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে। তাই আমরা আশা করছি, এই খাতে সরকার শিল্পবান্ধব নীতি সহায়তা ও কাঁচামাল আমদানি সহজ করবে।

-আপনাদের ফ্রিজের বিশেষত্ব কী?
এম এ রাজ্জাক খান রাজ : বিশ্বমানের প্রযুক্তি দিয়েই সম্পূর্ণ দেশেই তৈরি হয় ফ্রিজ। প্রতিটি ফ্রিজে যুক্ত করা হয়েছে এমন সব প্রযুক্তি, যা সঠিক তাপমাত্রা- হিমায়িত খাবারের ভিটামিন এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করার জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা বজায় রাখে। সম্পূর্ণ অটোমেটিক্যালি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিটি ফ্রিজ। একই সঙ্গে ৬৬ শতাংশ এনার্জি সেভিং-এনার্জি সেভিং কম্প্রেসর ব্যবহার করে, ফোমিংয়ের ঘনত্ব ৩৬ কেজি প্রতি মিটার কিউ (জার্মানি কেমিক্যাল) নিয়ে আসা হয়েছে। যার ফলে প্রতিটি ফ্রিজ হয় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী। এ ছাড়া ন্যানো টেকনোলজি ও সিক্স-এ কুলিং সিস্টেম থাকায় খাবার দ্রুত ঠাণ্ডা হয়। ফ্রিজ সহজে পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ডোর গ্যাসকেট, যেন ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসমুক্ত থাকে। একই সঙ্গে মিনিস্টার ফ্রিজ কম্প্রেসরে দিচ্ছে ১২ বছরের গ্যারান্টি। মিনিস্টারের প্রডাকশন লাইনে রয়েছে রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এয়ার কন্ডিশনার, এলইডি টিভি, স্মার্ট এলইডি টিভি, ব্লেন্ডার, গ্রিন্ডার, রাইস কুকার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ক্যাটলি, গ্যাস বার্নার, ইন্ডাকশন কুকার, ফ্রাইপ্যান, ফ্যান, আয়রন, স্ট্যাবিলাইজারসহ ২০টিরও বেশি পণ্য; যার প্রতিটি ইলেকট্রনিকস পণ্যে রয়েছে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং অধিক টেকসইয়ের নিশ্চয়তা।

-আগামী ৫ বছরে কম্পানিকে কোথায় দেখতে চান?
এম এ রাজ্জাক খান রাজ : গ্রাহকদের ভালোবাসা ও আস্থায় মিনিস্টার গ্রুপ এরই মধ্যে দেশীয় বাজারে সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। আমরা এরই ধারাবাহিকতায় দেশ ছাপিয়ে বিশ্ব জয়ের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দ্বারগুলোতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে কাজ করছি। আমরা মিনিস্টার ব্র্যান্ডের মাধ্যমে সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে।