গত কয়েক বছরে দেশে শুরু করা কিছু বড় প্রকল্পের নির্মাণ কাজ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যার ফলে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বৃহৎ এবং মাঝারি আকারের বায়ুচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

সরকার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে প্রায় ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যু উৎপাদনের জন্য এক ডজন বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। কক্সবাজারে এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের বৃহত্তম ৬০ মেগাওয়াটবায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎপাদন শুরু হবে।

নবায়নযোগ্য শক্তি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্যমতে, দেশ এখন নবায়নযোগ্য উত্স থেকে ৮৯০ মেগাওয়াটের বেশি উত্পাদন হয়। যার মধ্যে বায়ুশক্তি থেকে ৩.৯ মেগাওয়াট এবং রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সোলার প্ল্যান্ট থেকে মোট ২৫,০০০ মেগাওযাট ক্ষমতার ৩.৫% উৎপাদিত হয়।

চলমান জ্বালানি সংকট এবং রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যার কারণে দেশে দৈনিক উৎপাদন ১২,০০০-১৪,০০০ মেগাওয়াটের মধ্যে। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (বিপিডিবি) ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, ২৩ জুলাই পর্যন্ত সোলার প্ল্যান্ট থেকে জাতীয় গ্রিডে ১৮৬ মেগাওয়াট এবং কাপ্তাই প্ল্যান্ট থেকে ১২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের দৈনিক প্রতিবেদন অনুসারে, সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে সৌর শক্তির অবদান ছিল ২৩১ মেগাওয়াট।

এর আগে, সরকার বায়ুশক্তি থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ১,১৫২ মেগাওয়াট এবং ২০৪০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উত্স থেকে মোট বিদ্যুতের ৪০% উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল।

প্রকল্পগুলোতে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকায় গত বছর বাংলাদেশ তার মোট উৎপাদন ক্ষমতার ১০% নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।

মেগা সোলার পার্কে সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) প্রবর্তনের মাধ্যমে ১৯৯৬ সাল থেকে, সরকার এবং বেসরকারী খাত ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুতের প্রচারণা করেছে। কিন্তু বায়ুর ম্যাপিং এবং বেগের তথ্যের অভাব জ্বালানিহীন উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

যেহেতু বায়ুশক্তি প্রকল্পগুলো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা এবং চুল্লি/ডিজেল চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর তুলনায় পরিবেশবান্ধব এবং সস্তা হওয়ায় বাংলাদেশ এবং বিশ্বের অনেক দেশ জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত প্ল্যান্টগুলোকে পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার জন্য কাজ করছে।

বিশ্বব্যাপী বায়ুচালিত বিদ্যুতের উৎপাদন ২০১০ সালের ৪% থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ১০% হয়েছে। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫%-এ উন্নীত হবে।

কক্সবাজারের সবচেয়ে বড় প্রকল্প
বাংলাদেশের ২.৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে সরকার পরিচালিত তিনটি ছোট বায়ুশক্তি কেন্দ্র থেকে।যার মধ্যে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় ১ মেগাওয়াটের দুটি এবং আরেকটি ফেনীর সোনাগাজীতে।

বর্তমানে সরকার প্রায় ৩৫০ মেগাওয়াট উৎপাদনের জন্য সারাদেশে এক ডজন বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করছে। যা থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ বায়ুচালিত প্ল্যান্ট থেকে প্রায় ১৮০-২৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

এর মধ্যে, বিল্ড অন অপারেট (বিওও) ভিত্তিতে ৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসহ একটি প্ল্যান্টের কাজ এই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মুকিত আলম খান।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কক্সবাজার সদর উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ১১০ মিটার উচ্চতার ২২টি বায়ু টারবাইন বসানো হবে।

চীনা স্টেট পাওয়ার ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেডের (এসপিআইসি) সহযোগী সংস্থা উলিং পাওয়ার কর্পোরেশন লিমিটেডের অর্থায়নে ইউএস-ডিকে গ্রীন এনার্জি (বিডি) লিমিটেড ১১৬.৫১ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।চীনা প্রতিষ্ঠান এনভিশন এনার্জি লিমিটেড টারবাইন তৈরি করছে, যার দুটি সেট ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে।

গত বছরের মে মাসে বুস্টার স্টেশনের পাইল ফাউন্ডেশনে কংক্রিট ঢেলে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে টারবাইন ঘাঁটি নির্মাণের কাজ চলছে।

বিপিডিবি ১৮ বছরের জন্য এখান থেকে প্রতি ইউনিট ০.১২ ডলারে বিদ্যুৎ কিনবে। চুক্তির অধীনে প্ল্যান্টটি ডিসেম্বরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করবে।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক মুকিত আলম খান বলেন, “এটি সম্পন্ন হলে আমাদের ৬৬ মেগাওয়াট ইনস্টল ক্ষমতা থাকবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ ঝিলঞ্জা সাবস্টেশনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে প্রেরণ করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “যেহেতু এটি হবে বাংলাদেশের প্রথম এবং বৃহত্তম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং কক্সবাজারে অবস্থিত, তাই প্রকল্পের স্থানগুলো পর্যটকদের আকর্ষণে পরিণত হবে।

এটি দক্ষিণ এশিয়ায় এসপিআইসি-এর প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প। এসপিআইসি ১০০,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন সম্পন্ন করেছে, যা বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে।

প্রকল্পটি চালু হলে বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৪৫,৬০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে। প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কয়লার ব্যবহার ৪৪,৬০০ টন কমাতে পারে এবং প্রতিবছর ১০৯,২০০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড, ২৫.১৫ টন সালফার ডাই অক্সাইড এবং ৫০.৬৯ নাইট্রিক অক্সাইড নির্গমন কমাতে পারে।