খুলনা-কলকাতা বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন ভিডি্ও কনফারেন্সের মধ্যে উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী যথাক্রমে শেখ এবং নরেন্দ্র মোদি। মূল ছবি দ্যা হিন্দ পত্রিকা থেকে নেয়া। ইনসেটে হাজী আলী আজগরের ছবি এডিট করে বসানো।

নেপথ্যে চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের এমপি হাজী আলী আজগর টগর
দর্শনাকে বুকে রেখে ‘অযান্ত্রিক’ আবেগে কলকাতা-খুলনা ট্রেন এবার যাবে শিলিগুড়ি!

বিশেষ প্রতিনিধি : ৫২টি বছর। আধা শতকের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর, আবার চাকা গড়িয়েছিল বন্ধন এক্সপ্রেসের। এ শুধু একটি রেলগাড়ির সীমান্ত পেরিয়ে এপার ওপার না। এ যেন ঋত্বিক ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’ সেই আবেগ। আবারও শোনা গেল খুলনা-কলকাতা রেলপথে কু ঝিক ঝিক শব্দ। এবার শোনা যাবে শিলিগুড়ি যাবার কু ঝিক ঝিক শব্দ।

 

-আর এই শব্দের সাথে জড়িয়ে থাকা বাঁধনের যে গান ‘দেখা যদি হলো সখা প্রাণের মাঝে আয়’ -এ রকম একটি আবেগ নিয়ে বাংলাদেশ রেল মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটর অন্যতম প্রস্তাবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে নতুন করে দু’পাড়ের ভালোবাসার বন্ধন আরো দৃঢ় হচ্ছে। আর চুয়াডাঙ্গা জেলাবাসীর জন্য বড় সুখবর হচ্ছে- সবটা্ই দর্শনাকে বুকে ধরে। সংসদীয় কমিটিতেও এর অন্যতম প্রস্তাবক ছিলেন চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের বর্তমান এমপি হাজী আলী আজগর টগর। যার কর্মকান্ডে সন্তুষ্ট হয়ে আ্ওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারও তাঁকেই নৌকার মাঝি বানিয়েছেন।

 

ঘটনা শুরু

 

২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর ২৫৩ জন যাত্রী নিয়ে বাণিজ্যিক ভাবে যাত্রা শুরু করে ‘বন্ধন এক্সপ্রেস। যাত্রা বাণিজ্যিক হলেও এতে জড়িয়ে ছিল আবেগ, স্মৃতি আর বন্ধুত্ব। সেই কারণেই ট্রেনটির নাম- বন্ধন এক্সপ্রেস।

 

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এই রেল পথের যোগাযোগ। ৫২ বছর পরে গত ৯ নভেম্বর দিল্লি থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ঢাকা থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কলকাতা থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সুইচ টিপে বন্ধন এক্সপ্রেসের পরীক্ষামূলক যাত্রার সূচনা করেন। সেদিন থেকে আবারও সেই পথে চলা শুরু করলেন যাত্রীরা।

 

এবার যাবে শিলিগুড়ি

 

৫০ বছরের বেশি সময় পর আবারও ভারতের শিলিগুড়ির সঙ্গে রেল যোগাযোগ চালু হবে। এ জন্য বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার চিলাহাটি স্টেশন থেকে ভারত সীমান্ত পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করা হবে। পরে তা ভারতীয় রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে।

 

এই রেলপথ জলপাইগুড়ি জেলার হলদিবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করবে। এরপর তা জলপাইগুড়ি জংশন হয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দ্বিতীয় বড় শহর শিলিগুড়িতে যাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে সরাসরি শিলিগুড়ি হয়ে আসামসহ ভারতের ওই অঞ্চলের সঙ্গে পুনরায় রেল যোগাযোগ চালুর সুযোগ তৈরি হবে। এতে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেরও সুযোগ মিলবে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।

 

বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে আন্তযোগাযোগ বাড়াতে প্রকল্পটি নিয়েছে। নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে চিলাহাটি সীমান্ত পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের এই প্রকল্পে ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হতে পারে।

 

এই রেলপথ নির্মাণের উদ্দেশ্য হলো, মোংলা বন্দর হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম আরও সহজ করা। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন ট্রেনের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রী চলাচলও বাড়াতে চায় বাংলাদেশ।

 

এই বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এটি বেশ ইতিবাচক উদ্যোগ। ইতিমধ্যে বিবিআইএন (বাংলাদেশ ভুটান, ভারত ও নেপাল) অঞ্চলে যান চলাচল চুক্তি হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে উদ্যোগটি কার্যকর করা হলে তা এই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে ভালো ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া এই পথ চালু হলে উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে মোংলা বন্দর আরও বেশি সচল রাখা সম্ভব হবে।

 

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, এই অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করা হলে পণ্য পরিবহন খরচ কমে আসবে। এতে ব্যবসা করার প্রক্রিয়া সহজ হবে। ফলে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে যেমন সুবিধা হবে, তেমনি কাঁচামাল আমদানিও তুলনামূলক সহজ হয়ে যাবে।

 

জানা গেছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পের কাজ ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে শেষ হবে। এই সময়ের মধ্যে সাত কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া সেতুসহ যাবতীয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা তৈরি করা হবে। প্রকল্পটির মূল কাজ আসলে আগামী দুই বছরে সম্পন্ন হয়ে যাবে। প্রকল্প প্রস্তাবে সেভাবেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৪ কোটি টাকা রাখা আছে এবং আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে।

 

রেলওয়ের সূত্রমতে, ভারতের হলদিবাড়ি ও সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের চিলাহাটির মধ্যে রেলসংযোগ ছিল। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর এই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৮৬২ সালে বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থেকে ভারতের জগতি পর্যন্ত ৫৩ কিলোমিটার রেলপথ চালু হয়। পরে ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ঈশ্বরদীর পাকশীসংলগ্ন সাড়া নামক জায়গা থেকে চিলাহাটি পর্যন্ত মিটার গেজ এবং পোড়াদহ পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হয়। ১৯১৫ সালে পাকশীর হার্ডিঞ্জ রেলসেতু চালু হলে দর্শনা থেকে সরাসরি চিলাহাটি পর্যন্ত রেল যোগাযোগ চালু হয়। ১৯২৬ সালে এই পথটি ব্রডগেজে উন্নীত করা হয়। ওই সময়ে এই রেলপথ ধরে কলকাতার শিয়ালদহ থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত দার্জিলিং এক্সপ্রেস ও নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস নামে দ্রুতগতির ট্রেন চলাচল করত। তৎকালীন রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই রুটটি অন্যতম রেলপথ হিসেবে বিবেচিত হতো।

 

বর্তমান সরকার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সাল থেকে আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির দিকে বেশি মনোযোগী হয়। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা বিবিআইএন উদ্যোগ নামে পরিচিত। ইতিমধ্যে বিবিআইএন অঞ্চলে অবাধ মোটরযান চলাচল চুক্তি হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া দিয়ে ভারতের আগরতলার সঙ্গে রেলপথ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। আর দিনাজপুর দিয়ে ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের সঙ্গে রেলপথ চালু করা হয়েছে। আর দর্শনা দিয়ে তো আগে থেকেই কলকাতার সঙ্গে রেল চলাচল করছে।