নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
পাকিস্তান রাষ্ট্রে ক্ষমতার মিউজিক্যাল চেয়ার চলছে। ইমরান খান কিছুতেই চেয়ার ছাড়তে রাজি নন। অন্যদিকে সুপ্রিমকোর্ট এবং বিরোধী দল মিলে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নামাতে চায়। আর এই টেনে-হিঁচড়ে নামানোর জন্য পার্লামেন্টের অধিবেশনেও আজকে যেন আরেক ধরনের খেলা চলছে। পার্লামেন্ট অধিবেশনকে দীর্ঘায়িত করা, অনাস্থা প্রস্তাব আনতে বিলম্ব করা ইত্যাদি নানা রকম শিশুতোষ কাণ্ডকারখানা ঘটানো হচ্ছে। এটা পাকিস্তানের পক্ষেই সম্ভব। পাকিস্তান একদিকে ব্যর্থ রাষ্ট্র, অন্যদিকে অর্থনীতিতে ধুঁকতে থাকা। শ্রীলংকার পর যে রাষ্ট্রটি দেউলিয়া হবে সেটি পাকিস্তান, এমন ভবিষ্যৎবাণী করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সেই রাষ্ট্রের অর্থনীতির অবস্থা যতই নাজুক হোক না কেন, রাষ্ট্রটি যতই ব্যর্থ হোক না কেন, ক্ষমতার সেখানকার রাজনীতিবিদরা যেন কিছুতেই ছাড়তে চান না। আর এইরকম একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ যে হবেই এবং সেই হস্তক্ষেপের মধ্যদিয়ে সেখানকার সরকারের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে, এমনটি যেন পাকিস্তানের নিয়তি। পাকিস্তান জন্মের পর থেকে এই রাষ্ট্রটি প্রতারণা, প্রবঞ্চনা এবং মিথ্যাচারের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একটি গোষ্ঠী সেখানে ক্ষমতাবান হয়েছে, জনগণকে সবসময় ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে, জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা পাকিস্তান রাষ্ট্রে মূল্যহীন। বারবার পাকিস্তান সেটি প্রমাণ করেছে। সাম্প্রতিক ঘটনা তার একটি উদাহরণ।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছিল। কিন্তু অনাস্থা প্রস্তাব মোকাবেলা করতে তিনি রাজি হননি। একজন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতেই পারে, এটি একটি গণতান্ত্রিক রীতি। অনাস্থা প্রস্তাব আসলে তিনি সেটি মোকাবেলা করবেন এবং অনাস্থা প্রস্তাব যদি পার্লামেন্টে গৃহীত হয় তাহলে তিনি সরে যাবেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী হবে। এটি একটি গণতান্ত্রিক রীতি। কিন্তু গণতন্ত্রের ধারেকাছেও পাকিস্তান হাঁটে না, এই সাম্প্রতিক ঘটনা তার প্রমাণ। ইমরান খান যেন পাকিস্তানকে এক ক্রিকেট মাঠ বানালেন। তিনি হয়ে গেলেন একজন ক্রিকেট প্লেয়ার। রাজনীতি আর খেলা এক জিনিস নয়। একজন প্রধানমন্ত্রী, তিনি জনগণকে জিম্মি করে ক্ষমতার মসনদ দখল করে রাখতে পারেন এটি ভাবাও একটি ভয়ঙ্কর চিন্তা। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর চিন্তাই করছেন পাকিস্তানের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ইমরান খান এখন পাকিস্তানকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন যেখানে এই রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলি বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে। ইমরান খান অনাস্থা ঠেকাতে রাষ্ট্রপতির কাছে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার আবেদন জানান। আর অন্যদিকে তার তল্পিবাহক ডেপুটি স্পিকার ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে পার্লামেন্ট মুলতবি করেন। এরপর সুপ্রিম কোর্ট পুরো ব্যাপারের মধ্যে হস্তক্ষেপ করে এবং সুপ্রিম কোর্ট আবার পার্লামেন্ট বসিয়ে অনাস্থা প্রস্তাব আলোচনা করার নির্দেশ দেন। সুপ্রিম কোর্টের এই ভূমিকা কতটুকু সাংবিধানিক বা কতটুকু রাজনৈতিক সে বিতর্ক এখন পাকিস্তানে বড় ধরনের হতেই পারে।

প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে নিয়ে খেলছে এবং পাকিস্তানের সরকার বদলে দেওয়ার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে। আবার অন্যদিকে কেউ কেউ বলছে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেনাবাহিনী কার পক্ষে এটি নিয়েও নানা রকম জল্পনা কল্পনা করছে। অর্থাৎ পাকিস্তানের গণতন্ত্র মানে হলো সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ আর কতিপয় দুর্নীতিবাজ, দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদদের এক খেলা, যে খেলায় একজন খেলোয়াড় হচ্ছেন ইমরান খান। তিনি খেলোয়াড়ের ভাষায় কথা বলছেন। কিন্তু এই খেলায় জনগণ কি কেবল দর্শক? অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সিদ্ধান্তের মালিক এবং সব সিদ্ধান্তের অধিকার জনগণেরই। সেই জনগণের অধিকারকে বঞ্চিত করে পাকিস্তানের ক্ষমতাবানরা যে সর্বনাশের খেলা খেলছেন, তাতে পাকিস্তান আরো অতল গহ্বরে চলে যাবে। ব্যর্থ রাষ্ট্র থেকে পাকিস্তান একটি দেউলিয়া রাষ্ট্রে পথযাত্রা করছে এই সময়ের মধ্যেই।