তারিক জামান : যখন থেকে টিভি দেখি ও পত্রিকা পড়ি তখন থেকেই দেখে আসছি হাস্যোজ্জ্বল অর্থমন্ত্রী, সাথে প্রধানমন্ত্রী, একটা পোর্টফোলিও ব্যাগ, পরবর্তীতে ব্রিফকেস, (এখন কি ল্যাপটপ?) হাতে সংসদে প্রবেশ করছেন I প্রধানমন্ত্রী , প্রেসিডেন্ট, সশস্ত্র বাহিনী প্রধান বা অন্য কারো দিন নয় I শুধুই অর্থমন্ত্রীর I ফটো সাংবাদিকদের ক্যামেরাতে একটাই শব্দ- ক্লিক ক্লিক I অর্থ মন্ত্রীর ঠোঁটে এল প্যাচিনোর হাসি, ব্রিফকেসে সাইলেন্সার যুক্ত রিভলবার: I’m here, Pop. I’ll take care of you now. I’m with you now. I’m with you.

শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, বাজেট ভাবনা মানুষকে ভাবায় I
জনগনের বড়ো চিন্তা থাকে ব্যক্তিগত আয়কর I বাড়লো না কমলো I তারপর জিএসটির (বাংলাদেশের ভ্যাট) আওতায় কি আরও জিনিস এলো, চিকিৎসা সেবাতে নতুন ওষুধে সরকারের রিবেট, ফ্যামিলি ট্যাক্স বেনিফিট, বেকার ভাতা, ইয়ুথ এলাউন্স, ইত্যাদি I আরেকটা টেনশন কাজ করে: মদের দাম বাড়লো কি?

পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই বাজেটের সময় শিল্প কারখানা ও গ্রূপ ইন্ডাস্ট্রিগুলো সরকারের সাথে ইন্ডাস্ট্রি ট্যাক্স নিয়ে দর কষাকষি করে I সরকারের কথা হলো, বেশি লাভ বেশি ট্যাক্স তবে শিল্প কারখানার প্রসারে ব্যাঘাত হয় এমন কোন পদক্ষেপ নেয় না I

সরকারি আমলাদের চিন্তা থাকে সরকার কর্মচারী ছাঁটাই করবে কি না I ইউনিভার্সিটিগুলোকে ক্রমাগত চাপ দেয়া হয় নিজেদের খরচ জোগাড় করতে, নইলে ফালতু কোর্স (যেগুলো কোন চাকুরী দ্যায় না) বন্ধ করে মাস্টার স্টাফ বিদায় করো I নিজেরা যদি গবেষণার পয়সা জোগাড় করতে পারো তাহলে সরকার ডবল পয়সা দেবে I

আমাদের পত্রিকাগুলো ও রাজনীতিবিদগণ দেশ বিদেশের অর্থিনীতি বুঝে কি না জানি না, তবে এদের কথাবার্তা ও লেখালেখি যে জনগণকে এই বিষয়ে শিক্ষিত করে না, তা বলা যায় I এমনকি অর্থনীতিবিদগণও জনগণকে এই বিষয়ে জ্ঞানী করে তুলতে পারেন নাই I তাই দেশের জনগণের ধারণা বাজেট মানেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো I ব্যাক্তিগত কর কি ও কেন দিতে হবে- এই সাধারণ কথাটি এখনো অনেক ইউনিভার্সিটি পাশ ব্যক্তিই বুঝে না, সাধারণ মানুষ আর কি বুঝবে! তাই দেশে ম্যালা বাজেট বিশেষজ্ঞ I

তাজউদ্দীন আহমেদ প্রথম বাজেট উপহার দিয়েছিলেন কি পরিমান সম্পদ ও অর্থ হাতে নিয়ে, তা হয়তো অর্থশাস্ত্রের গবেষণার একটা বড়ো বিষয় হতে পারে I এমন বৈরী পরিবেশে পৃথিবীর কোন অর্থ মন্ত্রীকে একটা দেশের বাজেট পেশ করতে হয়েছে, মনে হয় না I পঁচাত্তরের পর সম্ভবত সামরিক জান্তা জিয়া নিজেই উর্দি চাপিয়ে বাজেট পেশ করেছিল কারণ তখন দেশে তিনিই সব কিছু I তারপর এলেন ক্ষমতা লোভী চার্টার্ড একাউন্টেনট সয়ফুর রহমান I তাকে দেখা যেত স্যুট চাপিয়ে ওয়াশিংটনের বিশ্ব ব্যাংক, ম্যানিলার এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক, প্যারিস ও টোকিও কনসির্টিয়ামে দাতা দেশগুলোর দ্বারস্থ হতে I এরশাদের সময়ে আমলা সাইদুজ্জামানকেও একই অবস্থায় দেখা গেছে I এরশাদ ক্যানাডা থেকে এনেছিলেন পরিসংখ্যান অর্থনীতির তালাকপ্রাপ্ত অধ্যাপক ওয়াহিদুল হককে I নোয়াখালির এক্সেন্টে এক বছর বাজেট পেশ করে এক বিধবা নারীকে বিয়ে করে ক্যানাডা ফিরে যান I এসেছিলেন বোধ করি বিয়ের খরচ জুগিয়ে বিয়ে করা I তারপর মেজর জেনারেল মুনেম, পেশায় ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও সৈনিক- তাকেও বাজেট পেশ করতে দেখা গেছে I তখন সেনাবাহিনীর এক অফিসারকে হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করেছিলাম দেশের অর্থ মত্রী হলেন এক আর্মি জেনারেল, তিনি আর কি দেবেন? জবাবে সেই অফিসার বলেছিলেন যে বাজেট পেশ এমন কোন কঠিন ব্যাপার নয় I দাতা গোষ্ঠী, বিশেষ করে বিশ্ব ব্যাংক যা বলে দিয়েছে তার বাংলা অনুবাদ দেখে পড়া তেমন অসুবিধার কিছু না I তিনি আরও বেশি হেসেছিলেন I আওয়ামী লীগের আবুল মাল মুহিতও এরশাদের অর্থ উপদেষ্টা ও মন্ত্রী হিসেবে বাজেট পেশ করেছেন I তখন তিনি সম্ভবত টেকনোক্রেট হিসেবে মন্ত্রী হয়েছিলেন I এরশাদ বুঝতে পেয়েছিলেন বন্দুক দিয়ে সরকার চালানো আর অর্থনীতির নিয়ম কানুন এক নয় I সেই সময়ের বাজেটের চাইতে জনগণের চিন্তা ছিল, এরশাদ হটাও, দেশ বাঁচাও I বিধাতা হেসেছিলো I

তারপর আবার এলেন সেই সিলেটি সয়ফুর রহমান I সেই একই প্রক্রিয়া, একই সিলেটি একসেন্ট, কোলা আর খোলা, ইতা-ক্ষিতা করে টানা পাঁচটি বাজেট দিলেন I বিশ্ব ব্যাংকের ইতরামি সত্বেও ভালো কিছু করার একটা চেষ্টা ছিল, তার শত্রুরাও বলেন I

তারপর শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম টার্মে এলেন শাহ কিবরিয়া I কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রী ছিলেন মতিয়া চৌধুরী I সম্ভবত এই প্রথমবারের মতো কৃষি ও জনবান্ধব বাজেট পেশ করেছিলেন শাহ কিবরিয়া I শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যা সত্বেও দেশ স্থিতিশীল ছিল I পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে শেখ হাসিনার সরকার দেশকে উন্নয়ন ধারাতেই ধরে রেখেছিলো I একুশ বছরের শয়তানি বাঁদরামি শেষে দেশবাসী এই প্রথম এগিয়ে যাবার ভিত্তি পেলো I

বাঙালি হলো এক আজব নৃগোষ্ঠী I সুখে থাকলে ভূতে পু. মারে I কিছু সংখ্যা চেনা জানা বেঈমানের প্ররোচনা ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলো I সেই সিলেটি সয়ফুর রহমান এবার তেল গ্যাস চুলা, পাট, ব্যাংক- যা আছে সব বিক্রির পরিকল্পনা করে বাজেট দেয়া শুরু করলো I মাটির তলে তেল গ্যাস রাখিয়া খিতা লাভ, সব বেসি ফালাও! সব হাওয়া হাওয়া, ও হাওয়া… I

পাঁচ বছরের খেলা শেষে তিন উদ্দিনের সরকারের বাজেট পেশ করেছিল আজিজুল ইসলাম- সেই পুরানো আমলা I তার বাজেটের সত্যিকারের কোন উদ্দেশ্য ছিল না I একটাই উদ্দেশ্য ছিল- ইন্টার পাশদের হাতে ব্যারিস্টার মইনুলের মতো গলা ধাক্কা না খাওয়া আর স্টপ গ্যাপ জমা খরচ দেখিয়ে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের আসা পর্যন্ত চালিয়ে নেয়া I

তারপর শেখ হাসিনার দ্বিতীয় টার্ম থেকে নতুন স্প্রিং বোর্ড তৈরী শুরু করেছিলেন এরশাদের সময়ের সিলেটি আমলা এম এ মুহিত I তিনি তাঁর পূর্বসূরির মতো সিলেটি এক্সেন্টে নয়, একেবারেই প্রমিত বাংলায় সুদূর প্রসারী ও সাহসী বাজেট দেয়া শুরু করেছিলেন I তিনি অনেক ফালতু বক্তব্য রেখেছেন, বেশি বলেছেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার বারটা বাজিয়েছেন I কিন্তু আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান আসলে তার দেয়া বাজেটের উপরই দাঁড়িয়ে I আমার এক বন্ধু, এখন অতিরিক্ত সচিব, সে বারো বছর মুহিত সাহেবের সাথে কাজ করেছে I সে আমাকে মুহিত সাহেবের অর্থনৈতিক ব্যাবস্থাপনা ও সরকারের রাজনৈতিক ও সামাজিক গোলের দিক নির্দেশনা নিয়ে দীর্ঘ্য গল্প করেছিল I মুহিত সাহেবের ভালো গুন ছিল, তা হলো ফ্লেক্সিবিলিটি I খুব দক্ষতার সাথে বিকল্প পরিকল্পনার দিক নির্দেশনা দিতে পারতেন, যা জনবান্ধবের কাছাকাছি I বর্তমান অর্থ মন্ত্রী একজন নামি চার্টার্ড একাউন্টেন্ট I তিনি যদি শুধু ডেবিট ও ক্রেডিট নিয়ে চিন্তা না করে সময়-উপযোগী পরিবর্তনের সাথে তাঁর প্রাক্তন সহকর্মীর দেয়া উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেন, তাহলেই চলবে I জনবান্ধব বাজেট দিলে আপনি এমনিতেই জনপ্রিয় হবেন I সাংবাদিকরা আপনাকে জনপ্রিয় করতে পারবে না I মতিয়া চৌধুরী তাঁর কাজ দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন, সাংবাদিকদের দিয়ে নয় I

বিশ্ব ব্যাংক ও বিশ্বের অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্টানগুলো এখন শর্ত ধরিয়ে, নিজের দেশের তৃতীয় শ্রেণীর কনসালটেন্ট দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গছিয়ে নিজের দেশেই টাকা নিয়ে যাবার ব্যবস্থা অনেকটাই বন্ধ হয়েছে মনে হয় I বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কোন দেশ নিজ পায়ে দাঁড়িয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই I বরং দারিদ্র্যতা ও ঋণের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে I শর্তানুযায়ী ঋণ বিতরন করতে পারলে তবেই চাকুরী, তাই বিশ্ব ব্যাংক এখন ঋণ নিয়ে ঘুরে I এদের প্ররোচনায় জনপ্রিয় সরকার উচ্ছেদ করে তৃতীয় বিশ্বে এদের তাবেদার জংঙ্গলি সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় বসতো, আর দেশ লোপাট করতো I তখন গণতন্ত্রের কথা, দুর্নীতি, বা মানবাধিকার শিকায় উঠিয়ে রাখতো I

ড.য. হোসেন অনেকদিন পরীবাগের অফিসে কাজ করেছেন, দেশকে বিশ্ব ব্যাংকের হয়ে অনেক সবক দিয়েছেন I সম্প্রতি অবসরে গেছেন I বিশ্ব ব্যাংকের ভারতীয় বংশদ্ভূত এক অর্থনীতিবিদ সম্পর্কে বলি I তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল দরিদ্র দেশগুলো ঋণ নিয়ে আরও দরিদ্র হচ্ছে কেন? তিনি জবাবে বলেছিলেন বিশ্ব সম্পদের পিৎজাকে আরও বড়ো করলে দারিদ্রতা কমবে, এই জন্য আরও সম্পদ বাড়াতে হবে I কবে? কবে ও কেমনে, তা তিনি জানেন না I জিজ্ঞাসা করা হলো তাহলে বর্তমান পিৎজার স্লাইসের সংখ্যা বাড়িয়ে ধনী দেশগুলোর স্লাইসের পরিমান কমিয়ে দিলেইতো অনেক দেশের দারিদ্রতা হ্রাস পাবে I উত্তরে তিনি মাথা চুলকিয়েছিলেন I সেই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন অর্থনীতিবিদ এখন দেশ ও জাতিকে বাজেট সম্পর্কে ওয়াজ করছে I সিপিডির ডাইনোসর পন্ডিতেরাতো আছেনই I

একজন অ-অর্থনীতিবিদ হিসেবে বুঝি:
১ দেশের প্রাথমিক শিক্ষা
২ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা
৩ উচ্চ শিক্ষা

প্রতি বাজেটে সঠিক পরিকল্পনা দিয়ে যদি এক ও দুই নম্বর ঠিক করতে পারেন, তাহলে তিন নম্বর নিয়ে ভাবতে হবে না I যখন তিন নম্বর ঠিক হবে, তখন দেখবেন দেশ এমনিতেই এগিয়ে যাচ্ছে। তখন আর দেশে বাজেট-জ্ঞানী লোকের দরকার হবে না।


লেখক পরিচিতি : প্রবাসী লেখক

লেখাটি লেখকের ফেইসবুক ওয়াল থেকে সংগৃহীত