নড়াইলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর পর এবার একই অজুহাতে ওই এলাকার দিঘলিয়ায় হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে আগুন এবং হামলার ঘটনা ঘটেছে।

শুক্রবার (১৫ জুলাই) রাতে এই ঘটনা ঘটে। দিঘলিয়ার ঘটনায় যার বিরুদ্ধে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়েছে তার বাবাকে আটক করেছে পুলিশ। কিন্তু হামলাকারীদের কাউকেই এখনো আটক করা হয়নি। তবে পুলিশ বলেছে ওই তরুণ যে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননা করে পোস্ট দিয়েছে তার প্রমাণ এখনো তারা পায়নি।

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার দিঘলিয়া ইউনিয়নের কয়েকটি হিন্দু পাড়া, বাজার ও মন্দিরে হামলা, লুটপাট ও আগুনের ঘটনা ঘটে শুক্রবার রাত ৮টার দিকে। দুর্বৃত্তরা সাহা পাড়ার গোবিন্দ সাহার বাড়িটি পুরোপুরি পুড়িয়ে দিয়েছে। আরও চার-পাঁচটি বাড়িতে হামলা ও আগুন দিয়েছে। আখড়াবাড়ি এলাকায় তিন-চারটি মন্দিরে হামলা ও আগুন দিয়েছে। দিঘলিয়া বাজারে সাত-আটটি দোকানে হামলা ও লুটপাট চালিয়েছে।

ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করে সাংবাদিক সুলতান হোসেন জানান, গোবিন্দ সাহারা বাড়িটি পুরোপুরি ভস্মীভূত। অন্যান্য বাড়ি ঘরেও হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। ওই এলাকার হিন্দুরা বাড়িঘরে তালা মেরে ভয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।

আখড়াবাড়ি সার্বজনীন মন্দিরের কোষাধ্যক্ষ সুমঙ্গল কুমার ভক্ত বলেন, “রাত ৮টার দিকে দুর্বৃত্তরা একযোগে হামলা চালায়। তারা মূল মন্দিরের সামনের নাট মন্দিরে ভাঙচুর চালায়। সব টিন খুলে নিয়ে যায়। মূল মন্দিরে তালা ভেঙ্গে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। সবই নিয়ে গেছে। সামনে দুর্গাপূজা। প্রতিমার কাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। পরে কালীমন্দিরে আগুন দিয়েছে। পাশে আরও তিনটি মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুর করে।”

তিনি বলেন, “এক মাস পর দুর্গাপূজা। আমরা কীভাবে পূজা করব জানি না।”

স্থানীয়রা জানান, আকাশ সাহা নামে এক কলেজছাত্রের কথিত ফেসবুক পোস্টে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এই হামলা চালানো হয়। পুলিশ দ্রুতই অ্যাকশনে যাওয়ায় হামলাকারীরা আরও তাণ্ডব চালাতে পারেনি। তবে শুক্রবার জুমার নামাজের পর দিঘলিয়া বাজারে উত্তেজনা দেখা দেয়। মিছিলও বের করা হয়। তারা আকাশের বাড়ির সামনে গিয়ে তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মিছিল করে। বিকেলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। রাতে হামলা হয়। পুলিশ জুমার নামাজের পরই সক্রিয় হলে হয়তো হামলার ঘটনা ঘটত না।

লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারান চন্দ্র পাল দাবি করেন, “আমরা খবর পাওয়ার পরই পরই তৎপর হই। পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ফলে বড় কোনো ঘটনা ঘটতে পারেনি।”

এই ঘটনায় রবিবার পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। তবে আকাশের বাবা অশোক সাহাকে আটক করেছে পুলিশ।

ওসি বলেন, “অশোক সাহাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। আর আকাশ সাহাকে আমরা খুঁজছি। হামলাকারীদের কাউকে চিহ্নিত বা আটক এখনো করতে পারিনি।”

আকাশ সাহা ধর্মের অবমাননা করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন তা নিশ্চিত কী না জানতে চাইলে ওসি বলেন, “না আমরা নিশ্চিত নই, তদন্ত চলছে।”

তিনি দাবি করেন, “ওই এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।”

লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসর আলী বলেন, “আকাশ সাহা যে ধর্ম অবমাননা করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন তার প্রমাণ আমরা এখনো পাইনি। পুলিশ ওটা নিয়ে তদন্ত করছে। আমরা ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। পরিস্থিতি এখন শান্ত আছে, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।”

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত অভিযোগ করেন, “এক ইমাম সাহেবের নেতৃত্বে হামলা হয়। তাদের সঙ্গে মাইকও ছিল।”

এই নড়াইলেই গত ১৭ জুন মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের গলায় জুতার মালা পরানো হয়। ডিসি, এসপি ও সরকার দলীয় নেতাদের সামনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে।

ধর্ম অবমাননার অজুহাতে কেন বার বার হামলা
গত কয়েক বছর ধরে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার পোস্ট দেওয়া হয়েছে এই অজুহাত তুলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রবণতা বাড়ছে। আবার ভুয়া তথ্য ফেসবুকে ছড়িয়ে হামলার ঘটনাও ঘটানো হচ্ছে।

২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধ পল্লী ও মন্দিরে হামলা হয় উত্তম বড়ুয়া নামে এক যুবকের ধর্ম অবমাননার ফেসবুক পোস্টের কথা বলে। কিন্তু পরে তদন্তে ওই পোস্টের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাসির নগরে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা হয় রসরাজ নামে এক তরুণের ফেসবুক পোস্টের অজুহাত তুলে। কিন্তু তদন্তে জানা যায় রসরাজ এক নিরক্ষর জেলে। তার নামে ভুয়া আইডি খোলা হয়েছিলো।

২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর রংপুরের গঙ্গাছড়ায় হামলা হয় টিটু রায় নামে একজনের ফেসবুক পোস্টের অজুহাত তুলে। টিটু রায় থাকতেন নারায়ণগঞ্জে। ওই পোস্টেরও সত্যতা মেলেনি।

২০১৯ সালের ২০ অক্টোবর ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় হিন্দুদের বাড়ি ঘরে হামলা হয় ফেসবুক পোস্টের অজুহাত তুলে। পরে তদন্তে দেখা যায় বিপ্লব চন্দ্র দাস নামে একজনের ফেসবুক আইডি হ্যাক করে ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছিল।

২০২১ সালের ১৭ মার্চ সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁওয়ে ৯১টি হিন্দু বাড়িতে হামলা ও লুটপাট করা হয়। হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ঝুমন দাস নামের এক যুবকের কথিত ফেসবুক পোস্টে ধর্ম অবমাননার অজুহাত তোলা হয়। আর ওই পোস্ট যে ঝুমন দাস দিয়েছেন তার প্রমাণ এখনো মেলেনি।

গত বছরের ১৩ অক্টোবর কুমিল্লায় হামলা হয়েছিলো ফেসবুকে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে।

প্রতিটি ঘটনায় দেখা গেছে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কিন্তু ফেসবুক পোস্ট না দেওয়ার পরও ভুয়া অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, মামলা হয়েছে। তাদের কারাগারে যেতে হয়েছে।

রানা দাশগুপ্ত বলেন, “আমরা কাছে প্রমাণ আছে একটি গোষ্ঠী সংঘবদ্ধভাবে এই কাজ করছে। তাদের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেল আছে। তারা সেগুলো ব্যবহার করে এই কাজ করে। দিঘলিয়ায় হামলাকারীদের সঙ্গেই ছিল ওই কথিত চ্যানেলগুলো। তারা দুপুর থেকেই তাদের চ্যানেলে উত্তেজনা ছড়াচ্ছিল। আমরা কুমিল্লাসহ আরও অনেক ঘটনায় এটা দেখেছি। তাদের কেন্দ্রীয়ভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়। তারা সেই অনুযায়ী কাজ করে।”

তিনি অভিযোগ করেন, “ওই চক্রটির ব্যাপারে তথ্য আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কয়েকবার দিয়েছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আর পুলিশ প্রশাসন আগাম তথ্য পেয়েও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”

তিনি বলেন, “এরা বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের তাড়িয়ে দিতে চায়। রাজনৈতিক ফায়দা, হিন্দুদের সম্পদ দখল করতে চায়।”

মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, “ভারতে বিজেপি নেত্রী নূপুর শর্মার বিতর্কিত মন্তব্যে পর ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেই সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে উসকানি দেওয়া বাড়ছে। কখনো কখনো সরকারি দলের লোকজন এবং প্রশাসন এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। নড়াইলে কলেজ অধ্যক্ষকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে জুতার মালা পরানোর ঘটনায় সেটা স্পষ্ট হয়েছে।”

তিনি মনে করেন, “বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ সেটা সব সময়ের জন্য এখন আর সত্য নয়, মাঝে মাঝে সত্য। আমাদের এখানে অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা কমছে। সাম্প্রদায়িকতার চর্চা বাড়ছে। তাই এখনই সময় এই সব সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধের। এজন্য রাষ্ট্রকে যেমন উদ্যোগ নিতে হবে, তেমনি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।”

রানা দাসগুপ্ত জানান, ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর ছোট বড় তিন হাজার ৫০০ হামলা হয়েছে।