মেসবাহ্ উল হক

গত ১ জানুয়ারি ছিলো ভারতবর্ষের সর্বপ্রথম বাঙালি মুসলিম পেশাদার নৃত্যশিল্পী রশীদ আহমদ চৌধুরী টুনু (১৯১৯-১৯৫৪) এর ১০৩তম জন্মবার্ষিকী। চট্টগ্রাম জেলায় সাতকানিয়ার চুনতি গ্রামে তার জন্ম। শিশুকাল হতে চিত্রাঙ্কনের প্রতি আকর্ষণ হতে তার নৃত্যকলার জগতে প্রবেশ। উল্লেখ্য এ’বিষয়ে তার কখনো কোন প্রথাগত শিক্ষা ছিলোনা কিন্তু চিত্তের টানে ও অধ্যাবসায়ের গুণে তিনি সেখানে এক স্বকীয় অবস্থান করে নিতে পেরেছিলেন। এই স্বল্পায়ু বাঙালি নৃত্যাচার্য বুলবুল চৌধুরী নামে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে দুঃখের বিষয় একমাত্র বুলবুল ললিতকলা অ্যাকাডেমি (বাফা) তার নামটি আজও বাঁচিয়ে রেখেছে।

শিশুকালে স্বগৃহে আরবি-ফার্সি এবং পরবর্তিতে হাওড়ায় প্রাইমারি শিক্ষা শেষে মানিকগঞ্জ হাই ইংলিশ স্কুলের ছাত্র। হাইস্কুলে সর্বপ্রথম নৃত্য প্রদর্শন। দ্বিতীয় প্রদর্শনী সাতকানিয়া টাউন হলে। ১৯৩৪ সালে মানিকগঞ্জ হতে পাঁচটি বিষয়ে ডিস্টিংশন সহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ। এরপর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ হতে আই.এ. এবং ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্কটিশ চার্চ কলেজ হতে বি.এ. পাশ। এর মাঝে প্রেসিডেন্সি কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করে কলকাতার ‘ফ্রেশ এয়ার এক্সকারশন সোসাইটি’ এর সম্পাদক প্রখ্যাত সমাজকর্মী হেমলতা মিত্রের নজরে পড়েন যার মাধ্যমে ওই সোসাইটির বাৎসরিক চ্যারিটি অনুষ্ঠানে নৃত্যকলা প্রদর্শনের মাধ্যমে পাবলিক স্টেজে তার যাত্রা শুরু হয়। এ’সময় পিতৃদত্ত নাম পরিত্যাগ করে পরিবারের অমতে তিনি বুলবুল চৌধুরী নামগ্রহণ করেন এবং সে’নামেই পরবর্তীতে বিশ্বজয় করেন। যাহোক এরপর তিনি যোগ দেন প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও ব্রাহ্মসমাজ নেতা কেশব চন্দ্র সেনের পৌত্রী অভিনেত্রী-নৃত্যশিল্পী সাধনা সেন (বসু) এর নৃত্যশিল্পীদলে। উল্লেখ্য সাধনা বসু রাঙ্গামাটির চাকমা রাজমাতা বিনীতা রায়ের কনিষ্ঠ ভগিনী।

যাহোক সেখান থেকে বেরিয়ে এসে বন্ধু মাহমুদ নূরুল হুদার সাথে বুলবুল প্রতিষ্ঠা করেন ওরিয়েন্টাল ফাইন আর্টস অ্যাসোসিয়েশন। ওই বছর প্রলয়ঙ্কারী বন্যায় দুর্গতদের সহায়তায় কলকাতার ফার্স্ট এম্পোরিয়াম মঞ্চে দুইদিনব্যপী নৃত্যপ্রদর্শন করেন যার প্রথমদিনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ‘নেতাজী’ সুভাষ চন্দ্র বসু এবং দ্বিতীয়দিনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন অবিভক্ত বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ‘শেরেবাংলা’ আবুল কাশেম ফজলুল হক। ১৯৪৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় এম.এ. সম্পন্ন করে সহশিল্পী প্রতিভা মোদককে পরিনয়সুত্রে আবদ্ধ করে তার নামকরণ করেন আফরোজা বুলবুল। এরপর স্ত্রী আফরোজা ও সহশিল্পীর দল নিয়ে শুরু হয় আধুনিক ভারতীয় নৃত্যকলার সম্ভার নিয়ে দেশে-বিদেশে তার অদম্য অভিযাত্রা। এর মাঝে যোগ দেন বামপন্থী আই.পি.টি.এ.- ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশনে।

১৯৪৭-১৯৪৮ সালে অর্ধেন্দু মুখার্জি’র ‘কিষান’ চলচ্চিত্রে মূখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন। এ’সময় বোম্বাইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পে যোগদানের আহ্বান পেলেও তা ফিরিয়ে দেন। ১৯৫০ সালে কলকাতা হতে নিজ নৃত্যদল নিয়ে স্বদেশ পূর্ব পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করে দেশে-বিদেশে নৃত্যকলা প্রদর্শন করে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। বিষয়ভিত্তিক আধুনিক নৃত্য ও ব্যালে বা নৃত্যাভিনয় ছিলো তার চিন্তা-চেতনার গভীরে। তবে নৃত্যকলা ছাড়া লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চায়ও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। এ’পর্যায়ে ১৯৪০ দশকে তার অন্ততঃ গোটা দশেক ছোটগল্প ও ‘প্রাচী’ উপন্যাসের কথা বলা যায়। তার লেখালেখি নিয়ে তার ঘনিষ্ট বন্ধু প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে জানা যায় নারায়ণের লেখা নিয়ে বুলবুল চৌধুরী একবার সোজাসাপটা কড়া মন্তব্য করায় নারায়ণ তাকে নিজে লিখে দেখাতে বললে বুলবুল সানন্দে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। এরই ফলশ্রুতিতে বুলবুলের কলম থেকে বেরিয়ে আসে ‘প্রাচী’ উপন্যাস সহ দারুণ কয়েকটি ছোটগল্প।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ‘পন্ডিত’ জবাহেরলাল নেহরু ১৯৫৩ সালে প্রথমবারের মতো পাকিস্তান সফরে এলে বুলবুল চৌধুরী ও তার শিল্পীদল নেহেরুর সম্মানে নৃত্য প্রদর্শন করেন। এখানে ওই অনুষ্ঠানের শেষে বুলবুল চৌধুরীর সাথে করমর্দনকালে পন্ডিত নেহরুর বিস্মিত উক্তিটি স্মরণীয় – “ইট ইজ ওভারহেলমিং মি. চৌধুরী!” তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য প্রদর্শনী করে তিনি দেশে আধুনিক নৃত্যকলার পরিচিতি বিস্তারের মাধ্যমে তাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। সে’সময় পাকিস্তানের প্রধান জাতীয় শিল্পী বলতে তার নামই সবার আগে উচ্চারিত হতে থাকে। এ’সময় তিনি দেশের বাইরে বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ – ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইত্যাদি দেশে নৃত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্বের চোখে ‘ওয়ান অব দ্য গ্রেটেস্ট ব্যালে ডান্সার অ্যান্ড কোরিওগ্রাফার অব দ্য ইস্ট’ অভিধায় সম্বর্ধিত হন।

ইউরোপে অবস্থানকালীন সময়ে মরণব্যাধি ক্যান্সারের যন্ত্রণা নিয়েও তিনি অনুষ্ঠান চালিয়ে যান। এরপর দেশে ফিরে আসার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৫৫ সালের জুন হতে কয়েকমাস ব্যপী অনুষ্ঠানের জন্য তিনি চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু ইতোমধ্যে তার অসুস্থতা গুরুতর রূপ নিলে উচ্চতর চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসারত অবস্থায় ১৯৫৪ সালের ১৭ মে সকাল ৬:৩০-এ চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হাসপাতালে তিনি পরলোকগমন করেন। আর একই দিনে স্থানীয় পার্ক সার্কাস অঞ্চলের গোবরা গোরস্থানে তার মৃতদেহ কবরস্থ করা হয়।

মৃত্যুর পর তার পুরানো বন্ধু ও সহযোগী মাহমুদ নূরুল হুদার উদ্যোগে ১৯৫৫ সালে ঢাকায় ‘বুলবুল মেমোরিয়াল কনভেনশন’ আয়োজিত হয়। এছাড়া ওই বছরেই ঢাকার ৭ নং ওয়াইজঘাটায় অবস্থিত ঐতিহাসিক শতবর্ষী ভবন ‘ওয়াইজ হাউজ’-এ মাহমুদ নূরুল হুদার উদ্যোগ ও নৃত্যাচার্যের সহধর্মিণী আফরোজা বুলবুলের আন্তরিক সমর্থন ও সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয় বুলবুল অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস্ – বাংলায় বুলবুল ললিতকলা অ্যাকাডেমি, সংক্ষেপে বাফা। উল্লেখ্য বুলবুল মেমোরিয়াল কনভেনশন উপলক্ষে একটি স্মারকপুস্তিকা প্রকাশিত হয় যার সম্পাদনায় ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক তথা দৈনিক মিল্লাত এর প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ মোদাব্বের। ওই কনভেনশনের আহ্বায়ক ছিলেন মাহমুদ নূরুল হুদা এবং কনভেনশন প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ ও সম্পাদক ছিলেন শামসুল হুদা চৌধুরী। আর প্রচার উপকমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন। বেগম আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ছিলেন কনভেনশনের কোষাধ্যক্ষ।

এরপর তাকে নিয়ে আর কোন উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান হয়েছে বলে জানা যায়না। এক কথায়, আরও অনেক স্মরণীয় বাঙালির মতো নৃত্যাচার্য বুলবুল চৌধুরীও এখন আরেক বিস্মৃত বাঙালি।


[লেখকঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]