আশুলিয়া প্রতিনিধি: ঢাকার সাভারে বয়স্ক ভাতা প্রদানে সরাসরি ভাতাভোগীর কাছে অর্থ পৌছানোর জন্য G2P (জিটুপি) পদ্ধতি বাস্তবায়নে চেষ্টা চালালেও নতুন লোক খুঁজে পাচ্ছেনা উপজেলা সমাজসেবা দপ্তর। তবে মাইকিং, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী বাড়ি বাড়ি গিয়ে বয়স্ক ভাতার জন্য খুঁজছেন বয়স্কদের।

সাভার অত্যন্ত জনবহুল এলাকা। তবে জনসংখ্যার তুলনায় ভাতাভোগীর পরিমান কম। ভাতাপ্রাপ্য বয়স্ক ব্যক্তি থাকলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উদাসীনতায় ভাতা থেকে বঞ্চিত হয় অনেকেই। এবার উপজেলা সমাজ সেবা দপ্তর মাইকিংসহ ভিন্ন ভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করায় ভাতাগ্রহীতা বাড়বে বলে ধারণা সমাজ সেবা কর্মকর্তার।

সাভার উপজেলা সমাজ সেবা দপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, সাভার উপজেলার ১২ টি ইউনিয়ন ও ১ টি পৌরসভায় মোট তালিকাবদ্ধ বিভিন্ন ভাতাগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। এর মধ্যে খোঁজ নেই অনেকের। তবে হালনাগাতের মাধ্যমে খোঁজহীন এসব সেবাগ্রহীতার স্থানে যুক্ত করে নেয়া হবে নতুন ভাতাপ্রাপ্যদের।

সাভারে মোট ভাতাভোগীর বরাদ্দ হলো ২৭ হাজার ১৩০ জনের। এর মধ্যে দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধী ৪ হাজার ৯০২ জন, বিধবা ভাতা ৩ হাজার ১৭৬ জন ও বয়স্ক ভাতার বরাদ্দ আছে ১৯ হাজার ৫২ জনের। তবে অনেকেই বঞ্চিত এসব সেবা থেকে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় ৮৮ লাখ ৫০ হাজার জনকে ভাতা দেওয়া হবে। ভাতাভোগীদের মধ্যে রয়েছেন ৪৯ লাখ বয়স্ক, ২০ লাখ ৫০ হাজার বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা এবং ১৮ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি।

গত ১৫ মে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শেখ রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, যারা এখনো মোবাইলে হিসাব খোলেননি তাদের তথ্য স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হবে। অনুপস্থিত ও নিরুদ্দেশ ভাতাভোগীদের পরিবর্তে নতুন ভাতাভোগী বাছাইয়ের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে ওই বিজ্ঞপ্তিতে।

এর পর থেকেই উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামে ভাতাভোগীদের কাছে তথ্য পৌছানোর চেষ্টা করছে সমাজ সেবা দপ্তর। এই লক্ষ্যে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় কাজ করে গেলেও সহসাই মিলছে না নতুন ভাতা গ্রহীতার। তবে সকল ইউনিয়ন ও উপজেলা, পৌরসভায় মাইকিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এতদিন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ভাতার টাকা দেয়া হলেও বর্তমানে এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হবে। পুরোনো যারা ভাতাগ্রহীতাদেরও এসব তথ্য হালনাগাদ করতে হবে। অন্যথায় তাদের ভাতা পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

উপজেলা সমাজ সেবা দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে শুধুমাত্র বয়স্কভাতা প্রাপ্তদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। যারা নতুনভাবে ভাতা পাওয়ার যোগ্য হয়েছেন তাদের নাম যুক্ত হচ্ছে। যাদের নাম এই তালিকায় আসবে তারা মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা পাবেন সরাসরি মোবাইল ব্যাংকের মাধ্যমে। সারাদেশে প্রায় ১ কোটি ভাতাভোগীদের কাছে সরাসরি অর্থ পৌছানোর লক্ষ্যে G2P পদ্ধতি চালু করেছে সরকার।

G2P (জিটুপি) হচ্ছে Government to Person পদ্ধতি যার মানে ‘সরকারি অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছে দেয়ার’ একটা পদ্ধতি। আগে বা এখনো ভাতার অর্থ প্রথমে উপজেলা বা শহর সমাজসেবা অফিসের মূল ব্যাংক হিসাবে আসে। এরপর ওই উপজেলা/শহর সমাজসেবা অফিস থেকে ভাতাভোগীদের হিসাবে ওই অর্থ ছাড় করার জন্য চিঠি দেয়া হয়। এই ভাতা ছাড়ের চিঠি পেলে স্থানীয় ব্যাংক শাখা ভাতার টাকা ভাতাভোগীর হিসাবে ট্রান্সফার করে দেয়। পরবর্তীতে ব্যাংকের ভাতা বিতরণের তারিখ অনুযায়ী ভাতার অর্থ উত্তোলন করেন।

কিন্তু জিটুপি পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে ভাতার টাকা সরকারি কোষাগার হতে সরাসরি ই-পেমেন্টের মাধ্যমে ভাতাভোগীর হিসাবে ঢুকবে। ভাতাভোগী তার মোবাইলে ভাতার টাকা এসেছে এ সংক্রান্ত মেসেজ পাবেন। তিনি তার নিকটস্থ ব্যাংক বা এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা হতে নিজের সুবিধামতো সময়ে ভাতার টাকা তুলতে পারবেন। ফলে নির্দিষ্ট ভাতাভোগী ছাড়া অন্য কেউ এই অর্থ তুলতে পারবেন না। ফলে সময়,শ্রম ও যাতায়াতের ব্যয় কমে আসবে এবং সচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। এ বছরের ১৪ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নতুন ভাতা প্রাপ্যদের গ্রামে গ্রামে খুঁজছেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ম্যান ফর ম্যানের সদস্য জাহাঙ্গীর সরকার। তিনি ৪ দিন একটি এলাকা ঘুরে ভাতাপ্রাপ্য ব্যক্তি খুঁজে বের করেছেন ৪ জন। তিনি বলেন, এভাবে প্রতিটি এলাকায় গেলে ৪ থেকে ৫ জন খুঁজে পাওয়া সম্ভব। যারা অবহেলায় পড়ে আছেন। স্থানীয় ইউপি সদস্যের কাছে ধর্না দিয়েও এই সেবা থেকে বঞ্চিত তারা।
আশুলিয়ার কাঠগড়া এলাকায় খুঁজে বের করা ভাতাপ্রাপ্য সখিনা বেগম জানান, আমি অনেক আগেই মেম্বারের কাছে গিয়েছিলা। কিন্তু কেউ আমায় মূল্যায়ন করেন নাই। কেউ সহযোগিতাও করে নাই। আমি অনেক চেষ্টা করেছি ভাতার জন্য। কিন্তু ভাতা পাওয়ার সৌভাগ্য হয় নি। এবার ম্যান ফর ম্যানের জাহাঙ্গীর এই ব্যবস্থা করে দিবেন বলে আশায় আছি।

সাভার উপজেলার আশুলিয়া ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড এর দূর্গাপুর গ্রামে থাকেন আব্দুল কাদের। জন্মস্থান শরীয়তপুর হলেও প্রায় ২০ বছর ধরে বাস করেন এই এলাকায়। প্রায় ৭০ বছর বয়স্ক আব্দুল কাদের এখন বেকার। এতদিন কেন বয়স্ক ভাতা পাননি? জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমি এর আগে জাকির মেম্বারের(স্থানীয় ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য-মোঃ জাকির মন্ডল) কাছে গেছিলাম বাবা। ৩ বছর আগে কাগজও দিয়েছি। এতদিনেও হয়নাই। আমাকে বলছে আসবে, আসবে। কিন্তু এতদিনেও আসেনি। আমি তো কিছু করতে পারিনা বাবা। মেয়ে বিয়ে দিছি চলে গেছে। এক ছেলে বিয়ের পরে ভিন্ন হয়ে গেছে।

বয়স্ক ভাতার তালিকা হালনাগাদ হচ্ছে জানতে পেরে স্থানীয় তরূণ সমাজসেবী সাত্তার মুন্সী আব্দুল কাদেরকে সাভার উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে পাঠান। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আব্দুল কাদেরের নাম বয়স্ক ভাতার তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

আশুলিয়া সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি লায়ন মোঃ ইমাম হাসান বলেন, ভাতা দেয়ার জন্য লোক খুজে পাওয়া যাবেনা তা তো হতে পারেনা। আসলে যাদের এই ভাতাটা অত্যন্ত প্রয়োজন তাদের কাছে খবরই পৌচ্ছেনা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্টরা এখানে দায়িত্ব জ্ঞানহীনতার পরিচয় দিচ্ছেন। যদি যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও একজনও দূঃস্থ এই সুবিধাবঞ্চিত হয়, তাহলে তা সরকারের জন্য হানিকর। সরকারের ভালো কাজগুলো কারো খামখেয়ালিপনাও বাধাগ্রস্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ। বর্তমানের জনপ্রতিনিধিরা অনেক উচ্চভিলাষী, দুঃস্থদের সাথে তাদের কোন যোগাযোগ নেই। তাই তারা দুঃস্থদের দোরগোড়ায় পৌছতে পারছেনা।

সাভার উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শিবলীজ্জামান বলেন, সাভারের আশুলিয়া ইউনিয়নে আমরা কম সাড়া পেয়েছি। আশুলিয়া ইউনিয়ন সহ অনেক স্থানেই মাইকিং করা হয়েছে। কিন্তু তেমন সাড়া পাওয়া যায় নি। আমাদের তালিকায় প্রায় ২৮ হাজার বিভিন্ন ধরণের ভাতাগ্রহীতার নাম রয়েছে। এবারে তথ্য হালনাগাদ করার পরে এই সংখ্যা কমতেও পারে আবার বাড়তেও পারে। আশুলিয়ায় আমরা লোক না পেলে অন্য ইউনিয়নে দিয়ে দেবো। আবার পুরো সাভার উপজেলায় লোক কম হলে অন্য উপজেলায় সেগুলো চলে যাবে। তবে পুরোপুরি হালনাগাদ হলে এ সংখ্যা আবার বাড়তেও পারে। প্রয়োজন হলে আমরা অতিরিক্ত মানুষের জন্য নতুন করে আবেদন করবো।

তিনি আরও বলেন, তবে এবার এমআইএস (ডিজিটাল ডাটাবেজ) এ সকলের তালিকা অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী সংশোধন করে আপলোড করা হচ্ছে। তাই এই ভাতা প্রদান প্রক্রিয়া হবে অনেক স্বচ্ছ। এতে করে অযাচিত কেউ ভাতার আওতায় থাকলে তারা বাদ পরে যাবেন। পে রোল করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে হালনাগাদকৃত তালিকা পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। যারা যোগ্য শুধু তারাই এখন থেকে নিয়মিত ভাতা পাবেন।