বিভিন্ন অনিয়মে নন-ব্যাংকিং আর্থিক খাতে আস্থাহীনতা, সঞ্চয়ে অনুৎসাহীতকরণ, স্টক মার্কেটের অস্থিতিশীলতা এবং ব্যবসায়ে লগ্নিতে ভরসাহীনতার কারণে সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত টাকা সঞ্চয়ী (সেভিংস) অ্যাকাউন্টে জমা রাখছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য বলছে, কোভিড মহামারি এবং কম লভ্যাংশ সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংকগুলোতে সঞ্চয়ী আমানতের পরিমাণ বেড়েছে।

এই আমানত এখন ব্যাংক মূলধনের অন্যতম বড় একটি উৎস। যা ধাপে ধাপে বেড়ে এ বছরের মার্চে ২২.৬%-এ এসে দাঁড়ায়।

২০২০ সালের মার্চে ব্যাংক মূলধনে সঞ্চয়ী আমানতের পরিমাণ ২০.১৮% এবং ২০১৯-এ ১৯.৯৭% ছিল।

যার ফলে, অ্যাকাউন্ট প্রতি গড় আমানতের পরিমাণও বেড়েছে। ২০২২ সালের মার্চে প্রতি অ্যাকাউন্টে গড় আমানতের পরিমাণ ৩৩ হাজার টাকা। যা ২০২১ সালে ৩১ হাজার এবং ২০২০ ও ২০১৯-এ ছিল ২৭ হাজার টাকা।

আগের বছরের তুলনায় ২০২২ সালে মোট আমানতের পরিমাণ বাড়ে ১৫%। যেখানে নমিনাল জিডিপির পরিমাণ ১৩%।

অর্থনীতিবীদ ও আর্থিক খাতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেই এমন অবস্থা দেখা দেয়।

কিন্তু অনেকে আবার ভিন্ন মত দিয়েছেন। তাদের মতে, মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে এই আমানতের নেতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। তবে ব্যাংকিং খাতে এই সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়ছে কারণ দেশে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। পাশাপাশি জনগণের কাছে বিনিয়োগের জন্য অন্য যেকোনো খাতের চেয়ে ব্যাংকিং খাত বেশি আস্থাশীল।

গত বছরের ৮ আগস্ট দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, সঞ্চয়ী আমানতের সুদ কখনোই মুদ্রাস্ফীতি হারের কম হতে পারবে না।

তিন মাস বা তার বেশি মেয়াদের ডিপোজিটের সুদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে বিগত তিন মাসের গড় মুদ্রাস্ফীতি হিসেব করতে বলা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী এ নির্দেশনা তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য বলা হয়েছে।

সুদের হার কমলে তা ঋণগ্রহীতাদের জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু সুদ লভ্যাংশের ওপর নির্ভরশীল মধ্যম আয়ের ডিপোজিটরদের জন্য তা এক ধরনের অভিশাপ। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে দেশের গড় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল যথাক্রমে- ৫.৯১%, ৫.৯৬, ৬.০২%, ৬.০৮% ৬.২২% এবং ৬.৬৪%।

এ বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত তফসিলি ব্যাংকগুলোর দেওয়া ডিপোজিট রেটের পরিমাণ জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ছিল ৪.০১%, এরপরে তা যথাক্রমে ৪.০২%, ৪.০১%, ৪.০২% এবং ৪.০২% ছিল।

কিন্তু, উল্লিখিত সময়ে প্রকৃত মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৮৬%, ৬.১৭%, ৬.২২%, ৭.৪২% এবং জুলাইয়ে তা ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়ে ৭.৫৬%-এ গিয়ে ঠেকে।

এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, “আমানতের বৃদ্ধি খারাপ না। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এটা আগামী অর্থবছরের জন্য ভালো কিছু হতে যাচ্ছে না। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে জনগণের সঞ্চয় হ্রাস পাচ্ছে, যা আগামী বছরও অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় নতুন অর্থবছরে সরকার এত বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হতে পারে।”

তবে তিনি মনে করেন, আমানত সঞ্চয়ের হার যদি ন্যূনতম জিডিপির চেয়ে বেশি হয়, তাও অর্থনীতির জন্য একটি ভালো লক্ষণ।

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবীদ এবং বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামের (বিইএফ) সদস্য আশিকুর রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “সম্ভবত, মূল্যস্ফীতি ধারণের সবচেয়ে প্রমাণিত উপায় হলো সুদের হার বাড়ানো, যা শতাব্দীকাল ধরে প্রায় সবসময়ই কাজ করেছে। এই পদ্ধতি পূর্ববর্তী আর্থিক উদ্দীপনায় অতিরিক্ত তারল্যের কারণে অত্যাধিক চাহিদা কমিয়ে দেয়।”

“বর্ধিত আমদানি ব্যয়ের ফলে মার্কিন ডলারের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বেড়ে গেছে। ফলে আমাদের রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সুদ হারের ওপর নীতি পুনর্বিবেচনা করা।”