প্রবীর বিকাশ সরকারঃ আমার প্রবাস জীবনে পরম সৌভাগ্য হয়েছিল এমন একজন পূর্ণ মানবের হাত স্পর্শ করার, যে হাত রবীন্দ্ররচনা স্পর্শ করেছিল সুদীর্ঘ বছর। তিনি ছিলেন দেশ-বিদেশে প্রভূত খ্যাতিমান চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডাঃ হিনোহারা শিগেআকি সেনসেই। ২০১১ সালে টোকিওস্থ ভারতীয় দূতাবাসে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে।

ডাঃ হিনোহারা ১৯১১ সালে জাপানের অন্যতম শীতপ্রধান প্রদেশ ইয়ামাগুচি-প্রিফেকচারের এক খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যখন কিয়োতো বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র তখন তাঁর একবার যক্ষ্মা হয়। এই অসুখটি তখন জাপানে মহামারী আকারে বিদ্যমান ছিল। অধিকাংশ রোগীই মৃত্যুবরণ করতেন এই রাজরোগে। হিনোহারা বেঁচে উঠেছিলেন যথার্থ চিকিৎসা ও মনোবলের কারণে। সেই থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি এমন একজন চিকিৎসক হতে চান যাতে করে মানুষকে প্রকৃত সেবা এবং সুস্থ-সুন্দর জীবন পরিচালনা করার জন্য সঠিক জ্ঞান প্রদান করা যায়। তিনি সেই মনোভাব থেকেই চিকিৎসা-বিজ্ঞানী হিসেবে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মানুষের সেবা করে গেছেন। নিজেও সঠিক জীবনব্যবস্থা অনুসরণ করে ১০৬ বছর বেঁচেছিলেন। তিনি তাঁর পিতার মতো আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেছিলেন। ফলে তাঁর অজানাকে জানার আগ্রহ ও বহির্বিশ্ব সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁর কর্মস্থল টোকিওস্থ যুদ্ধবিধ্বস্ত সেইন্ট লিউক আন্তর্জাতিক হাসপাতালটিকে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করে একে নতুন করে গড়ে তোলেন। আজকে জাপানের অন্যতম প্রধান এবং অত্যন্ত উচ্চমানের সেবিকা প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয় নামে দেশ-বিদেশে পরিচিত এই হাসপাতালটি। ১৯৪১ সালে তিনি এই হাসপাতালে চিকিৎসকের চাকরিসূত্রে প্রবেশ করে মৃত্যু পর্যন্ত প্রধান পরিচালক এবং সাম্মানিক চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করে গেছেন।

তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল ব্যতিক্রম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি ওষুধপত্র রোগীদেরকে দিতেন না। তিনি বলতেন, ‘মানুষের রোগবালাই হবে না, যদি সে নিয়মিত খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ সল্পাহারী ডাঃ হিনোহারা রোগী ছাড়াও সকলকেই উপদেশ দিতেন কম খাওয়ার জন্য। খাদ্য হিসেবে মাছ, মাংশ এবং সবজি পরিমাণ মতো খাওয়াই সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। উদর কখনোই খাবার দিয়ে শতভাগ পূরণ করার প্রয়োজন নেই, ৭০ থেকে ৮০ ভাগ যাতে পূর্ণ করা যায় সেইদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তাহলে অতিরিক্ত মেদ বৃদ্ধি পাবে না, হার্টের রোগ, রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিক রোগ থেকে রেহাই পাওয়া সহজেই সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে পরিশ্রম করতে হবে, মনকে আনন্দে রাখতে হবে—এই ছিল তাঁর চিকিৎসার ধারা এবং উপদেশ।

বয়স যখন ১০০ ছুঁই ছুঁই তখনও তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে যাতায়াত করতেন, পরিশ্রম করতেন, বক্তৃতা করতেন, টিভিতে জীবনযাপন বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিতেন। জীবদ্দশায় তিনি কত যে বক্তৃতা তিনি দিয়েছেন তার কোনো হিসাব নেই। তাঁর সঙ্গে যখন আমার সাক্ষাৎ ঘটে তখন বলেছিলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত তাঁর বক্তৃতা দেবার দিন-তারিখ ঠিক হয়ে আছে।

রাষ্ট্রের একাধিক সর্বোচ্চ পুরস্কার ও পদকে ভূষিত ডাঃ হিনোহারা মানুষের সেবা করেই তিনি ক্ষান্ত ছিলেন না। বৃদ্ধদেরকে নিয়ে তিনি রীতিমতো বিনোদনমূলক ক্লাবও গঠন করেছিলেন। সেখানে নাচ, গান এবং মতবিনিময়ের মাধ্যমে আনন্দ-বিনোদনে মেতে থাকতেন। চাকরি করার পাশাপাশি তিনি লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। ২০০১ সালে যখন তাঁর বয়স ৯০ তিনি তখন একটি গ্রন্থ লেখেন ‘ইকি কাতা জোওজুউ’ অর্থাৎ ‘যথার্থ বেঁচে থাকা’ নামে, যেটি ১০ লক্ষ কপির বেশি বিক্রিতে বেস্ট সেলার হয়েছিল। মৃত্যু পর্যন্ত এককভাবে ১১৩টি এবং যৌথভাবে ৭১টি গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। অনুবাদ করেছেন ১২টি গ্রন্থ। অধিকাংশ গ্রন্থই চিকিৎসা বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যকর মানবজীবনযাপন এবং সমাজসেবা সম্পর্কিত।

এহেন চিকিৎসাবিদ হিনোহারা শিগেআকির জীবনে উল্লেযোগ্য ঘটনা ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনার সঙ্গে পরিচয়। ১৭ বছরের কিশোর বয়সে তিনি তাঁর এক বন্ধুর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের কবিতা প্রথম শোনেন। যে কবিতা তাঁর জীবনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই থেকে রবিঠাকুরের একজন বিশিষ্ট ভক্ত ছিলেন তিনি। শুধু ভক্তই নন, রীতিমতো কবিকে নিয়ে বহু বছর ধরে গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি তাঁর গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের কবিতার উদ্বৃতি দিয়েছেন, গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকারেও কবিগুরুর চিন্তা-ভাবনা-দর্শনের কথা বলেছেন। প্রবন্ধও লিখেছেন কবিকে নিয়ে। মৃত্যুপূর্ব ১৬টি বছর জাপানের খ্যাতিমান রবীন্দ্রগবেষক অধ্যাপক মোরিমোতো তাৎসুওর সঙ্গে যৌথভাবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। তারই প্রমাণ পাওয়া পেয়েছিলাম ২০১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধেবেলা টোকিওস্থ ভারতীয় দূতাবাস কর্তৃক আয়োজিত তাঁর এক বক্তৃতায়। সার্ধশত রবীন্দ্র জন্মবর্ষ উপলক্ষে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথের এমন কোনো বিষয় নেই যা নিয়ে সেদিন তিনি সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করেননি! মিলনায়তনভর্তি জাপানিরা তাঁর কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতন শ্রবণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের পরিপূর্ণ মানব গড়ার শিক্ষাভাবনা এবং প্রকৃতিবন্দনা তাঁর জীবনকে বিশেষভাবে আন্দোলিত করেছিল। ডাঃ হিনোহারাই একমাত্র প্রথম ব্যক্তি যিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘প্রকৃতি বিজ্ঞানী’ বলে অভিহিত করেছেন তাঁর এক প্রবন্ধে। শুধু তাই নয়, সেই প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, ‘কবির জীবনীশক্তিকে ধার করে আমরাও চিরঞ্জীব হতে পারি। কবির জীবনধারা থেকে অনেক কিছু শিক্ষালাভ করার আছে।’ এতই বোঝা যায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যুগে যুগে মানুষকে এভাবে মানসিক শক্তি সঞ্চারিত করে চলেছেন যাদের মধ্যে সর্বস্তরের মানুষ বিদ্যমান, যেমন চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডাঃ হিনোহারা শিগেআকি ছিলেন অন্যতম। সুদীর্ঘ জীবনে তিনি শিশুপ্রজন্মকে মানব জীবনের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করার ব্রতে নিয়োজিত ছিলেন। এই ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ ছিল গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।