নিজস্ব প্রতিবেদক

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন জমে উঠেছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর সাথে বিএনপির সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারের বিরোধকে ছাপিয়ে আইভী-শামীম ওসমানের বিরোধই মুখ্য হয়ে উঠেছে। তবে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, আজ শামীম ওসমান সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণায় নামবে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে গতকাল এক বৈঠকের পর শামীম ওসমান আইভীর পক্ষে কাজ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কাল এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হবে। গতকাল আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী গণমাধ্যমকে বলেন যে, শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমান গডফাদারদের প্রার্থী। তিনি আজ এ ব্যাপারটি আরো বিস্তারিতভাবে বলেন। গণমাধ্যমের কাছে তিনি বলেন যে, শামীম ওসমান দীর্ঘদিন ধরে গডফাদার হিসেবে পরিচিত। তার এই বক্তব্য আওয়ামী লীগের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই শামীম ওসমানের ভূমিকা ছিল রহস্যময়। তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেননি বরং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি এমন সব ইঙ্গিতময় বক্তব্য করেছেন যে, বক্তব্য গুলোর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছিল যে তিনি আইভীর বিরোধী। তবে গত শুক্রবার নির্বাচনী প্রচারণায় ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ চারজন ওয়ার্ড কমিশনার তৈমুর আলম খন্দকারের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিলে আওয়ামী লীগের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং আওয়ামী লীগের বিভক্তির সুস্পষ্ট আকার ধারণ করে।

অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জ ছাত্রলীগ সরাসরিভাবে আইভী বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। এটি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক জাহাঙ্গীর কবির নানকের গোচরে আসলে তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিষয়টি অবহিত করেন। তার পরপরই ছাত্রলীগের নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

ছাত্রলীগ মহানগর কমিটি বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি সুস্পষ্ট বার্তা দেন যারাই নৌকা প্রতীকে বিরোধিতা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আওয়ামী লীগের পাঁচজন নেতাকে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনের সমন্বয় করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জাহাঙ্গীর কবির নানক এর নেতৃত্বে এই পাঁচ নেতার মধ্যে রয়েছেন আব্দুর রহমান, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মির্জা আজম, এস এম কামাল। এই নেতৃবৃন্দ প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জে যাচ্ছেন এবং তাদের মূল কাজ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের ভেতরে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আছে সেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল মীমাংসা করা। এই মীমাংসা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন যে, নারায়ণগঞ্জের মূল সমস্যা সেলিনা হায়াৎ আইভীর জনপ্রিয়তা নয়, নারায়ণগঞ্জের মূল সমস্যা হলো শামীম ওসমান এবং আইভীর বিরোধ। আইভী তিনবারের মেয়র হিসেবে এলাকায় কাজ করেছেন তাতে দলীয় কোন্দল না থাকলে তার বিজয়ের সম্ভাবনা শতভাগ। আর এরকম বাস্তবতায় এসে শেষ পর্যন্ত যদি শামীম ওসমান এই নির্বাচনের বিরোধিতা না করে তাহলে পরে আইভীর বিজয় কেউ ঠেকাতে পারে না।

বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে, তৈমুর আলম খন্দকারকে প্রার্থী করার পিছনে শামীম ওসমান বা ওসমান পরিবারের হাত রয়েছে। বিশেষ করে সেলিম ওসমান তৈমুর আলম খন্দকারের সঙ্গে প্রার্থিতা দেওয়ার আগে একাধিকবার বৈঠক করেছেন এমন গুঞ্জনও নারায়ণগঞ্জে রয়েছে। এ সমস্ত প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম এবং এস এম কামালকে দায়িত্ব দেন শামীম ওসমানকে বোঝানোর জন্য এবং তিনি যদি এই আইভীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ না করেন তাহলে পরে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন। এরপরই গতরাতে জাহাঙ্গীর কবির নানক, এস এম কামাল, বাহাউদ্দিন নাছিম, মির্জা আজমরা শামীম ওসমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তার সঙ্গে কথা বলেন। শামীম ওসমানকে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পরই শামীম ওসমান তার অবস্থা থেকে সরে আসেন এবং তিনি আগামীকাল আনুষ্ঠানিকভাবে আইভীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা করবেন। তবে মুখে আইভীর পক্ষে প্রচারণা করলেও বাস্তবে শামীম ওসমানের লোকজন কতটা আইভীর পক্ষে কাজ করবেন সে নিয়ে এখনো নারায়ণগঞ্জের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।