সাইফুল ইসলাম : বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকার অবশেষে খুলতে যাচ্ছে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রোববার শিক্ষামন্ত্রী সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ঘোষণায় তোড়জোড় শুরু হয়েছে দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকা স্কুল-কলেজ পাঠদান উপযোগী করতে। এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। পিছিয়ে আছে সরকারি প্রতিষ্ঠান। তবে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই চলছে স্কুল খোলার প্রস্তুতি। ফলে শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতির অপেক্ষায় রয়েছে শিক্ষাঙ্গন।

এদিকে দীর্ঘ সময় পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টরা। তবে নতুন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, যে অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছিল সেই অবস্থায় চালু করা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তত কয়েক লাখ শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে আর শিক্ষা জীবনে প্রবেশ করতে পারবে না। কারণ দীর্ঘ বন্ধের সুযোগে অনেকের বিয়ে হয়ে গেছে। অনেকে আবার শিশু শ্রমে জড়িয়ে পড়েছেন।

সম্প্রতি জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ তাদের এক হিসেবে বলেছে, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় চার কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। সহসা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খুললেও নিয়মিত শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার অনেক কমে যাবে।

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর দফায় দফায় বাড়ানো হয় ছুটির মেয়াদ।

দেড় বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ পাঠদানের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ধুলাবালি আর মাকড়শার জালে ছেয়ে গেছে শ্রেণিকক্ষ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসবাবপত্র অযত্ন-অবহেলায় অকেজো হয়ে পড়েছে।

শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, বাইরেও চিত্রটা এমন। শ্যাওলা জমে বারান্দাগুলো হয়েছে হাঁটার অনুপযোগী। মাঠে বর্ষার পানি পেয়ে লম্বা হয়েছে ঘাস, জমেছে আগাছা। তবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র এমন নয়।

সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখেন বাংলাদেশ জার্নাল প্রতিবেদক। সরেজমিনে সিদ্ধেশ্বরীতে অবস্থিত ভিকারুননিসা নূন স্কুল কলেজ ঘুরে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির শ্রেণিকক্ষ, বারান্দাসহ ক্যাম্পাস পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রয়েছে।

কথা হয় ভিকারুননিসা নূন স্কুল কলেজর নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতি সপ্তাহেই ক্যাম্পাস পরিষ্কার করা হয়। সরকার কালকে খুলে দিতে বললেও আমরা চালু করতে পারব। প্রায় একই কথা জানান, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের একজন নিরাপত্তাকর্মী।

মতিঝিলে অবস্থিত মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটক তালাবন্ধ ছিল। পুরান ঢাকার নয়াটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কয়েকদিন আগেই শ্রেণীকক্ষ পরিষ্কার করা হয়। কয়েকদিন আগে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপরই বিদ্যালয়টি পাঠদানের উপযোগী করেন শিক্ষকরা।

নয়াটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছুটিতে থাকায় চলতি দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী শিক্ষক কানিজ ফাতেমা। তিনি বলেন, প্রতিদিনই সব শিক্ষক নিয়মিত অফিস করছেন।

একই চিত্র দেখা যায় মগবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। স্কুল খোলার পর নতুন উদ্যমে কিভাবে ক্লাস চলবে এ বিষয়ে কথা বলছিলেন শিক্ষকরা। তাদের বৈঠকের মধ্যেই তদারকিতে আসেন থানা শিক্ষা কর্মকর্তা। সার্বিক বিষয়ে বিদ্যালয় প্রধানকে নির্দেশনা দিয়ে যান তিনি।

জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সামসুন নাহার বেগম বলেন, প্রতিদিন সকালে বিদ্যালয়ে এসে অনলাইনে চলমান ক্লাসগুলো তদারকি করা হয়। এ ছাড়া রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে ওয়ার্কশীট প্রদান, শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের হোম ওয়ার্ক দিয়ে আসেন।

তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যায় পুরান ঢাকার কলেজিয়েট স্কুলে গিয়ে। বিদ্যালয়ের সামনের সড়ক দখল, ময়লা ও অপরিচ্ছন্ন দেখা গেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার সুযোগে স্কুলের প্রধান ফটকের সামনে লেগুনা স্ট্যান্ড বসানো হয়েছে। ফুটপাতে বসেছে চায়ের দোকান। ফটকে ঝুলছিল তালা। দেয়ালে উঠেছে বড় বড় শেওলা, আঙ্গিনায় বড় বড় ঘাস।

একই চিত্র দেখা যায় তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে। কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির একজন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে। তিনি বলেন, টানা বন্ধের কারণে তেমন প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে খুব দ্রুত প্রস্তুত হয়ে যাবে।

রোববারের বৈঠকে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি নিতে স্কুল কলেজগুলোকে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে উদ্বুদ্ধ করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচ্ছন্ন করারসহ মোট ১৯ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রকাশ করা হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার গাইড লাইন। এ গাইড লাইন অনুসরণ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। আর আগামী ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করতে সব স্কুল-কলেজকে নির্দেশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। সুত্রঃ বাংলাদেশ জার্নাল