রুহুল আমিন মোল্যাঃ পাল্টে যাওয়া পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে পরিচিত ও পরীক্ষিত একটি ব্যবস্থার নাম ‘সমবায়’। এই প্রত্যয়টি কতকগুলো মূলনীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ‘দশের লাঠি একের বোঝা’, ‘দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ’ কিংবা ‘বিন্দু থেকে সিন্ধু’ প্রবাদ গুলোকে সামনে রেখে বাস্তবতার নিরিখে সমবায় কার্যক্রম এগিয়ে চলে। এটির মূল কাজ হলো সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়ন। বিভিন্ন বৃত্তি ও পেশার বিচ্ছিন্ন এবং অসংগঠিত মানুষের কাছে অপরিকল্পিতভাবে পড়ে থাকা অর্থ একসাথে পুজিঁ করে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উন্নয়নই সমবায়ের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য সমবায় আন্দোলনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সমবায় আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ‘সমবায় অর্থনীতি’ গড়ে উঠেছে। এজন্যই বলা হয়, সমবায় হলো সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহযোযোগিতাপূর্ণ মনোভঙ্গি লালন করা।জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশটি পুনঃগঠনের জন্য সমবায়ের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে উপলদ্ধি করেন এবং আমাদের সংবিধানে সমবায়কে সম্পদের মালিকানার দ্বিতীয় খাত হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। গ্রামের অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর ও তাদের জীবন মানোন্নয়নে সমবায়কে বেগবান করতে সমবায় অধিদপ্তর নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।ইতোমধ্যে বাংলাদেশের দুই লক্ষাধিক সমবায় সমিতির এক কোটিরও অধিক সমবায়ী মান সম্পন্ন পণ্য উৎপাদন, বাসস্থানের ব্যবস্থা, মৎস্য ও দুগ্ধ উৎপাদনসহ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোনো না কোনভাবে উজ্জ্বল সাফল্য স্থাপন করেছেন।

প্রসঙ্গত, প্রাথমিক সমবায়ীদের প্রায় ১৮% মহিলা সমবায়ী, যারা নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

করোনার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি আজ অবরুদ্ধ। ধেয়ে আসছে মহামন্দা। আশঙ্কা করা হচ্ছে এই মহামন্দার মাত্রা বিগত শতাব্দীর মহামন্দা থেকেও ভয়াবহ হতে পারে। বিশ্বের বড় বড় এবং শক্তিশালী অর্থনীতির সরকার প্রধানদের কপালে দুশ্চিন্তার কালো ছাপ স্পস্ট। এটা যতটা না কোভিট-১৯ আক্রান্তের সংখ্যার এবং এর ফলে মৃত্যু হারের উর্ধমুখীর জন্য, ঠিক ততটাই অর্থনীতিতে মহামন্দার আশঙ্কা নিয়ে।এর ফলে বলা চলে, কৃষি উৎপাদন ছাড়া পুরো অর্থনীতি আজ অবরুদ্ধ। ফলশ্রুতিতে একদিকে যেমন অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া কয়েক কোটি মানুষের আহারের চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।গত বছর বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ সরকার বড় অঙ্কের( প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা) প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন।চলতি বছর এখন পর্যন্ত সরকার কোন বড় ধরণের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেনি।

আমরা জানি যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি বড় খাত হচ্ছে কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাত। প্রত্যেকটি খাতের কয়েকটি উপখাত আছে। কৃষির প্রধান উপখাতগুলো হল শস্য উৎপাদন, প্রাণী সম্পদ এবং মৎস্য সম্পদ। স্বল্প মেয়াদে এই সকল উপখাতে উৎপাদন না কমলেও দেশী এবং বিদেশী অর্থনীতি সমূহ অবরুদ্ধ থাকার কারণে এ সকল উপখাতের উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্যের উপর নিম্নমুখী প্রভাব পড়তে শুরম্ন করেছে। এর ফলে অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ২শ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

শিল্প খাতে বিশেষ করে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে ক্ষতির মাত্রা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এখাতে প্রতিদিনের অনুমিত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ১ শ ৩১ কোটি টাকা।অর্থনৈতিক ক্ষতি সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে সেবা খাতে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী বেচা-কেনা এবং জরুরী সেবা ব্যতীত এই খাত মূলত অবরম্নদ্ধ। বর্তমানে সবধরণের যোগাযোগ (সড়ক, রেল, নৌ এবং আকাশ পথ ), পর্যটন, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, রিয়েল ইস্টেটসহ সকল প্রকার সেবা একেবারেই বন্ধ। সব মিলিয়ে সেবা খাতে প্রতি দিনের অনুমিত চলতি ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ২ হাজার কোটি টাকা।

মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতির পরিমাণ এই মুহূর্তে হিসাব করা সম্ভব না হলেও তা আচঁ করা অসম্ভব নয়। অবরম্নদ্ধকাল দীর্ঘস্থায়ী হলে বেশিরভাগ ছোট-খাটো ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র উৎপাদন প্রতিষ্ঠান সহজজেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ এবং ফরওয়ার্ড লিঙ্কেজ চেইন মারাত্নভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে যার ফল সামগ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করবে।

অপরদিকে অন্য দেশগুলো আামদের দেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ রাখতে পারে। ফলে বাংলাদেশের রেমিওটেন্স প্রবাহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে যা বর্তমানে অনেকটা দৃশমান। বিশ্ব বাজারে তৈরি পোষাকের চাহিদা অনেকাংশে কমে যেতে পারে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানীমূখী তৈরি পোষাক শিল্প আরো বেশি প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে।এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজে ঘোষণা এবং এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

জাতীয় সমবায় কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, পোশাক,দুগ্ধ উৎপাদন,আবাসন ,ক্ষুদ্রঋণ ও সঞ্চয়, কুটির-চামড়াজাত-মৃৎশিল্প ইত্যাদি খাতের বিকাশ,কর্মসংস্থান সৃষ্টি,নারীর ক্ষমতায়ন ক্ষেত্রে উন্নয়নসহ,ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করতে বিশাল অবদান রাখছে। গত বছর চালু হওয়া কোভিট-১৯ করোনা ভাইরাস পুরো বিশ্বে স্থবিরতা সৃষ্টি করলেও আমাদের সমবায় সমিতিগুলো এ সমবায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, সদস্যদের ঋণ মওকুফসহ দুর্গত সদস্যদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছে। করোনায় আক্রান্ত সদস্যদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে।

সমবায় সমিতির মাধ্যমে উৎপাদন, বিপণন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যাপক ভুমিকা পালনে সমবায় সমিতিসমূহের বিচরণ দৃশ্যমান এবং অবদান প্রশংসনীয়। সমবায় সমিতিগুলো গ্রামের কৃষক ও বেকার যুবকদের সুসংগঠিত করে উদ্যোক্তা সৃস্টির মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিয়োজিত আছে। তাছাড়া সমবায় সমিতি সমুহ দেশের বেকারত্ব দুর করছে।

পাশাপাশি এ সংগঠনগুলো উৎপাদন, বিপণন, শিক্ষা,স্বাস্থ্য ,আবাসন এবং ঋণদানের মাধ্যমে এলাকার বেকার পুরম্নষ ও মহিলাদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃস্টির সুযোগ সৃস্টি করছে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো যে, আমাদের সংবিধানে সমবায়কে সম্পদের মালিকানার দ্বিতীয় খাত হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হলেও খেটে খাওয়া কুলি মজুর কৃষক, শ্রমিক জেলে, তাঁতীসহ বিভিন্ন পেশাজীবির অগণিত সমবায়ীগণ যারা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা নিয়মিতভাবে সচল রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে তাদের জন্য গত বছর করলেও চলতি বছর এখন পর্যন্ত সরকার বড় ধরণের কোন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেনি।

ফলশ্রুতিতে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ছে।কর্মসংস্থান হারাচ্ছে শত কোটি মানুষ। কেননা, করোনা প্রাদুর্ভাবে অনিশ্চিত লক ডাউন ঘোষিত হওয়ায় প্রান্তিক আয়ের জনগোষ্ঠী ঘর থেকে বের হতে না পারায় তাদের নিয়মিত আয় সংকোচনের ফলে সমিতিতে নিয়মিত শেয়ার ও সঞ্চয় জমা দিতে পারছে না। ফলে সমবায় সমিতিগুলো তাদের সদস্যদের নিকট থেকে কোন শেয়ার ও স য় আদায় করতে পারছে না। ফলে সংগঠনগুলো মুলধন ও পুজিঁ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সেই সাথে হারাতে হচ্ছে বিনিয়োগের সকল পথ।বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় সদস্যদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।তাছাড়া, সমিতিগুলোর পূর্বের ঋণ বিনিয়োগ হতে ঋণের কিস্তি পরিশোধে সদস্যরা ব্যর্থ হওয়ায় দারিদ্রের দুষ্টু চক্রের বলয়ে সমবায় সমিতিগুলো হাবুডুবু খাচ্ছে। দেশ হারাচ্ছে অর্থনৈতিক গতিশীলতা।

তাই বাংলাদেশ সরকারকে এই মুহূ্র্তে সমবায় সমিতিগুলোকে ধবংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে বাচাঁতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের কথা ভাবতে হবে। জরুরী ভিত্তিতে বড় ধরণের কোন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে তা কিংবা স্বল্পসুদে ঋণ বিতরণ, খাবার সরবরাহ,করোনায় আক্রান্ত সদস্যদের বিনামূল্যে করোনা চিকিৎসা সেবার নিশ্চয়তা প্রদান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী সদস্য ও তাদের পরিবার-পরিজনদের আর্থিক ক্ষতিপুরণ প্রদান এবং সকল সমবায়ী সদস্যদের মাঝে বাধ্যতামূলকভাবে হেল্থ স্যানিটাইজার ও মাস্ক বিতরণের ব্যবস্থা করা সরকারের এখন অনেকটা নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এটা নিশ্চিত করতে পারলেই সমবায় সমিতিগুলো আবার অর্থনৈতিকভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠবে – সেই সাথে সচল হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

লেখকঃ পরিদর্শক
জেলা সমবায় কার্যালয়
ঝিনাইদহ