পত্রিকার পাতায় পড়তে ছবিতে ক্লিক করুন

বিশেষ প্রতিনিধি : ‘দর্শনায় অভিযান’ শব্দটি লিখে গুগলে সার্চ দেন- দেখবেন মাত্র শুন্য দশমিক ৪৫ সেকেন্ডে ১৭,২০০টি ফলাফল আসবে। খেয়াল করবেন, সময় লেগেছে কিন্তু এক সেকেন্ডরও কম। আর সেই ফলাফলগুলোতে কি হেডলাইন আসে তা একনজর চোখ মেলালেই বুঝবেন। কোন কোন অপরাধ সংশ্লিষ্ট শব্দ নেই এখানে? -জঙ্গী, ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিলসহ প্রায় সকল নেশাদ্রব্যের সঙ্গে মাদক কারবারী, স্বর্ণ চোরাকারবারী, মূর্তি ব্যবসায়ী এবং যুবলীগের নামে এরা এতোটাই বেপরোয়া খুন-খারাবি থেকে পুলিশের উপর হামলার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েও পার পেয়েছেন। গুগলে মাদক চোরাচালানে খুলনা বিভাগের শীর্ষে দর্শনা ও জীবননগর : গডফাদার রয়েছে দু’শতাধিক। এই শিরোনামটিও আছে।

গতকাল দর্শনায় এই তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে নকল ওষুধ কারখানা আবিস্কার। আর কারখানাটি ছিল দর্শনা পৌর পিতার সাবেক প্রধান কার্যালয় অর্থাৎ পৌরসভার পুরাতন ভবনে। যা জেনে বুঝে মানুষের মৃত্রু কামনাকারী ওয়েস্ট ল্যাবরেটরিজ আয়ুর্বেদিক ফার্মাসিটিক্যাল নামক নকল ওষুধ কোম্পানীর মালিক ভাড়া নেয়। যেখানে আটা, ময়দা ও রং দিয়ে তৈরি হচ্ছিল দুটি গ্রুপের নকল ওষুধ। প্রশ্ন আসতেই পারে দর্শনা পৌরসভার এতো কর্মকর্তা-কর্মচারী, পৌর পিতার কাছে প্রতিদিন প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ছুটে যাওয়া অসংখ্য কর্মী সমর্থক কেউ কি বিষয়টি ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। আর অভিযান চালাতে হয়েছে সূদুর রাজধানী থেকে এসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) কে।

ডিবি প্রধান জানিয়েছেন, মন্টিলুকাস্ট সোডিয়াম ও প্যানট্রোপাজল সোডিয়াম সেস্কুইহাড্রেট গ্রুপের দুটি ওষুধ নকল করে বাজারজাত করা হচ্ছিল। এই নকল ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছিল আটা, ময়দা ও রং। চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় ওয়েস্ট ফার্মাসিউটিক্যাল নামের আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরির কারখানায় তৈরির পর এগুলো আনা হতো রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকার ওষুধ মার্কেটে। সেখান থেকে ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ও কুরিয়ার সার্ভিসে ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ওষুধের দোকানে।

এ ঘটনায় ওয়েস্ট ফার্মাসিউটিক্যালের মালিক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ ও নকল ওষুধের পাইকারি বিক্রেতা আলী আক্কাস শেখকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরশু বুধবার রাজধানীর চকবাজার, ফকিরাপুল ও চুয়াডাঙ্গায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে একটি গ্রুপের ১০ লাখ ৩৪ হাজার ২৮০টি নকল ট্যাবলেট ও আরেকটি গ্রুপের ১৮ হাজার নকল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার। তিনি বলেন, নকল ওষুধ তৈরি বড় ধরনের একটি অপরাধ। যেখানে চিকিৎসকেরাও আস্থা হারান।

ডিবির প্রধান হাফিজ আক্তার বলেন, গোপন খবরের ভিত্তিতে ডিবির লালবাগ বিভাগ চকবাজারের একটি কুরিয়ার সার্ভিস থেকে নকল ওষুধের বড় চালান আটক করে। এ সময় পাইকারি ভেজাল ওষুধ বিক্রেতা আলী আক্কাস শেখকে আটক করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যমতে ফকিরাপুল এলাকা থেকে সেসব নকল ওষুধ তৈরির কারখানার মালিক গিয়াস উদ্দিন আহমেদকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের সঙ্গে নিয়ে দর্শনায় গিয়াস উদ্দিনের কারখানায় অভিযান চালানো হয়।

তিন-চার বছর ধরে চক্রটি এ কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল জানিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, এসব নকল ওষুধ তৈরিতে আটা, ময়দা, রং ব্যবহৃত হতো। এমনকি ডাই বা স্টেরয়েড ব্যবহৃত হতে পারে। নন-ফার্মাসিউটিক্যাল এসব ওষুধ সেবনে কোনো উপকার হয় না। কিডনি, লিভার, হৃদ্‌যন্ত্র বা শ্বাসতন্ত্র মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

বাজারজাত করার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নকল ওষুধগুলো প্রথমে মিটফোর্ডে আসে। এরপর সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম দামে ছড়িয়ে দেওয়া হতো।

গুগলের সার্চ ইঞ্জিনের এসব খবর পড়ে যে কেউ সহজেই ভাবতে পারেন, দর্শনা কি তবে সর্বনাশের সমুদ্রে ভাসছে? আর পাপিষ্ঠ, নিষ্ঠুর, বেপরোয়ারা হয়তো এখানে আলাদিনের প্রদীপ দখল করার জন্য নেপথ্যে তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অক্লান্ত পরিশ্রমে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। এই উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে জেলা থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে প্রতিটি গ্রাম পর্যন্ত। চুয়াডাঙ্গা জেলার স্কুল-কলেজ, রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজারগুলোর দিকে তাকালেও উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়। কিন্তু উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরাধ। কথাটি বলছেন স্বয়ং পুলিশ প্রধান। কিন্তু শুধু প্রশাসন চাইলেই দর্শনার আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা এসব অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব না। তারা চেষ্টা করলে হয়তো কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। প্রয়োজন সবার সহযোগিতা।

দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ গল্পের মতো আসলে এখানকার শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য পরিত্রাণের ভেলা ভাসানো নায়ক দরকার।