আব্দুর রহমান,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে সিরাজগঞ্জে চলনবিলের বিলের পানি কমতে শুরু করলে মাছ ধরার ধুম পড়ে যায়। তখনই উৎপাদন শুরু হয় শুঁটকি মাছের। বর্তমানে চলনবিলের পানি অনেকটা শুকিয়ে এসেছে। এখন বিস্তীর্ণ বিলজুড়ে চলছে ধান কাটাসহ অন্য ফসল রোপণের কাজ। বিলের নিচু জায়গায় বড় খালগুলোয় পানি থাকায় সেখানে সুতি জাল, বেড়জাল, পলো দিয়ে মাছ ধরছেন জেলেরা। জালে ধরা মাছগুলো পাশেই অস্থায়ী বাঁশের ছাউনির চাতালে শুকানো হচ্ছে। আধুনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে না হয়ে সনাতন পদ্ধতিতে উৎপাদন হচ্ছে শুঁটকি মাছ। ফলে থাকছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এছাড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সিরাজগঞ্জের শুঁটকি শিল্প তেমন প্রসার লাভ করতে পারছে না। পাশাপাশি উৎপাদনকারীরাও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না। এতে সরকারও হারাচ্ছে মোটা অংকের রাজস্ব। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে উৎপাদিত শুঁটকি স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয়। মিঠাপানির এ শুঁটকির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে দেশ-বিদেশে। যে কারণে শুঁটকি উৎপাদনও বাড়ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এ অঞ্চলের শুঁটকি রফতানি হচ্ছে ভারতে। বাণিজ্যিকভাবে ভারতে রফতানি হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশেও দিন দিন কদর বাড়ছে মিঠাপানির এ শুঁটকির। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের চলনবিল-অধ্যুষিত রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও উল্লাপাড়ায় শুঁটকির চাতালে কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের দুই পাশে, উল্লাপাড়ার মোহানপুর, বড়বাঙ্গালা ও উধুনিয়া ইউনিয়নসহ এসব উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে  অর্ধশত শুঁটকির চাতাল। চাতালগুলোয় চেলা, চ্যাং, পুঁটি, টেংরা, বাতাসি, চাপিলা, খলিশা, মলা, টাকি, গোচই, বাইম, শোল, বোয়াল, গজার, মাগুর, শিং, কৈসহ মিঠাপানির বিভিন্ন ধরনের দেশীয় মাছের শুঁটকি উৎপাদন হচ্ছে। প্রতি বছর অক্টোবরের শেষ থেকে শুরু হয়ে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলে দেশী মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির কাজ। উৎপাদিত শুঁটকি মাছ ঢাকা, সৈয়দপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়  বাজারজাত করা হচ্ছে। এসব শুঁটকি  পাইকারি বাজার থেকে কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করেও হিমসিম খেতে হচ্ছে পাইকারদের।
তাড়াশ উপজেলার মান্নাননগর গ্রামের জুলমাত শেখ জানান, শুঁটকির চাহিদা থাকলেও আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। সকালে এক দামে কিনলেও বিকালেই বাধ্য হয়ে তাদের ইচ্ছামাফিক মণপ্রতি ১-২ হাজার টাকা কমে বিক্রি করতে হয়। ফলে শুঁটকি উৎপাদনকারীরা লোকসানের মুখে পড়েন। আলু সংরক্ষণের মতো শুঁটকি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে আমরা  সারা মৌসুম  বিক্রি করে বেশি লাভবান হতে পারতাম। আক্কাস আলী নামের শুঁটকি ব্যবসায়ী বলেন, চাহিদা থাকায় আমাদের এলাকার শুঁটকি ভারতেও রফতানি হয়। দুই বছর আগে ভারতের ব্যবসায়ীরা সরাসরি আমাদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে শুঁটকি মাছ কিনেছেন। কিন্তু বর্তমানে সৈয়দপুরের আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে ভারতীয়দের আমাদের কাছে আসতেই দেন না। সরকারের নজরদারি ও পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় আমরা জিম্মি হয়ে তাদের কাছে কম দামে শুঁটকি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। এ বছর  শুঁটকি উৎপাদনে প্রায় ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। এর প্রভাবে এখন বাজারের যে অবস্থা তাতে লগ্নিকৃত টাকা ফিরে পাওয়াই দায় হয়ে পড়েছে।সৈয়দপুরের ইসলামপুর এলাকার আড়তদার শাকিল বলেন, আমরা সারা দেশেই শুঁটকি সরবরাহ করি। এছাড়া ভারতেও রফতানি হয়। বাজারে যখন যে দাম থাকে আমরা উৎপাদনকারীদের সেই দাম দিই। মহিষলুটি মাছের আড়তের ইজারাদার মোহাম্মদ আলী জানান, চলনবিলের মাছের শুঁটকি সুস্বাদু হয়। দিনে দিনে বিলে মাছ কমে গেলেও দেশে-বিদেশে শুঁটকির চাহিদা বাড়ছে। তাই উন্নত মানের শুঁটকি তৈরি ও সংরক্ষণে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তাহলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, দেশ ও বিদেশে জেলার শুঁটকির সুনাম ও চাহিদা দুটোই রয়েছে। আমরা এ শুঁটকির মান বৃদ্ধির জন্য চাতালমালিকদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতা দেয়ার কথা বিবেচনা করছি। প্রক্রিয়াটি শুরু হলে এ অঞ্চলের শুঁটকি ব্যবসা আরো প্রসারিত হবে। তিনি জানান, গত বছর এ অঞ্চলে ১৭৫ টন শুঁটকি উৎপাদন হয়। এখনো অনেকটা সময় বাকি রয়েছে। ফলে এ বছর শুঁটকি উৎপাদন ২০০ টন ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।