রেজাউল করিম রাজা : ধানমন্ডির ৫ নম্বর সড়কে লেক ঘেঁষা শেষ বাড়িটা আর দশটা সাধারণ বাড়ির মতোই দেখতে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া নেই কোনো বাড়তি জৌলুস। চাকচিক্যহীন অতি সাধারণ একটি বাড়ি। দেখে কিছুতেই বোঝার উপায় নেই, এই বাড়িটাই দেশের ইতিহাসে একটি বিশেষ বাড়ি। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি, স্বাধীনতা বিরোধীদের উত্থানরোধের আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু এই বাড়িটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পারিবারিক বাসভবন। বাড়িটির নাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রয়াত স্বামী প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ওরফে সুধা মিয়ার নামে। সুধাসদন নামেই এই বাড়িটি সকলের কাছে পরিচিত।

১৯৬৭ সালে ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিয়ে হয়। ঢাকাতে ওয়াজেদ মিয়ার নিজস্ব কোনো বাড়ি ছিল না। তিনি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ড. ওয়াজেদ মিয়া তৎকালীন পূর্তমন্ত্রী সোহরাব হোসেন বরাবর একটি প্লটের আবেদন করেন। ১৯৭৪ সালের প্রথমদিকে ধানমন্ডির এই প্লটটি ড. ওয়াজেদ মিয়ার নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তৎকালীন সময়ে ১৪ কাঠার এই প্লটটির মূল্য ছিল ৭০ হাজার টাকা। এই টাকা ওয়াজেদ মিয়া কয়েক কিস্তিতে পরিশোধ করেন।

বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার, তেমনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সূতিকাগার এই সুধাসদন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন আন্দোলনের সকল স্রোত এসে মিশে ছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে, ঠিক তেমনি গণতন্ত্র রক্ষা এবং মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলনের স্রোত এসে মিশে ছিল এই সুধাসদনে।

পঁচাত্তর সালের ১৫ আগস্ট ঘটে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। এবছরের ২৫ আগস্ট ড. ওয়াজেদ মিয়া স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভারতের দিল্লীতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে চলে আসেন। দিল্লীর পান্ডারা রোডে একটি ছোট বাড়িতে সাড়ে ছয় বছর কাটে তাঁদের। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হলে, তিনি ঐ বছরেরই ১৭ মে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরে আসার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু কন্যাকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি তৎকালীন সরকার। ওয়াজেদ মিয়া এবং শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাসায় থাকতেন।

১৯৮২ সালে এই সুধাসদনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রথমে একতলা নির্মান করা হয়। এরপর বাড়ি নির্মাণের জন্য হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশন থেকে ৬ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করা হয়। এরপরেও বাড়ি নির্মানের ব্যয় সংকুলান না হওয়ায় ঋণ নেয়া হয় আরব বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে। এভাবেই বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কয়েকধাপে ওয়াজেদ মিয়া এই বাড়িটি নির্মান করেন।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা থাকার সুবাধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পদচারণায় সর্বদাই মুখরিত থাকতো সুধাসদন। কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের নেতারাও আসতেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে এবং দলীয় নানা বিষয়ে আলোচনা করতে। ৯১ সালের নির্বাচন, ৯৬ সালের নির্বাচন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের অলিখিত হেডকোয়ার্টার ছিল সুধাসদন। নির্বাচনকালীন সেই সময়ে বাড়িটিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভিড় লেগেই থাকতো। সেসময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভিড় বাড়ি ছাপিয়ে সড়ক পর্যন্ত চলে যেত।

২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ফখরুদ্দিন-মঈন উদ্দিনের তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই বাড়ি থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ২০০৮ সালের ১১ জুন কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এই বাড়িতেই ফিরে আসেন। সেদিন শেখ হাসিনার এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অশ্রুজলে সিক্ত হয়েছিল সুধাসদন। সেদিন সকাল থেকেই সুধাসদনসহ আশেপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণীত হয়। শেখ হাসিনা সেদিন নিজেও কেঁদেছেন এবং কাঁদিয়েছেন হাজারো ভক্ত-অনুরাগীকে। সেদিন মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে আন্দোলনের সংগ্রামের অঙ্গীকার করে তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের ভালোবাসাই আমার প্রাণশক্তি।’

২০০৪ সালে ২১ আগস্ট শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন সুধাসদন থেকেই। দেশের ইতিহাসের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর আহত অবস্থায় যখন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজন তাঁকে গাড়িতে করে সরিয়ে নিয়ে আসছিলেন, তখন শেখ হাসিনা বলেন, ‘গাড়ি থামাও, এত আহত লোকজন রেখে আমি সুধাসদন যাবো না, সবাইকে দেখে তারপর আমি সুধা সদন যাবো।’

সুধাসদনের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করা একজনের কাছে বর্তমান সুধাসদনে কারা বসবাস করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে এই বাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর নাতি (ওয়াজেদ মিয়ার চাচাত ভাইয়ের ছেলের ছেলে) টুটুল হাজী এবং তার স্ত্রী এখানে বসবাস করেন। রাজনৈতিক নেতারা সুধাসদনে আসেন কিন জানতে চাইলে তিনি বলেন, না এখন আর আগের মতন নেতাকর্মীরা এখানে আসেন না। তিনি আরও বলেন, বাড়িটিকে রাজনৈতিক নানা ঝামেলা থেকে মুক্ত রাখতেই নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি একসময় যেমন গণমানুষের রাজনীতির তীর্থভূমিতে পরিণত হয়েছিল, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি মিউজিয়াম হয়ে যাবার পর গণমানুষের রাজনীতির তীর্থভুমিতে পরিণত হয় এই সুধাসদন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দুই বাড়ির অবদান যথেষ্ট। এই দুই বাড়ি তৈরির ইতিহাস প্রায় একইরকম। যুগে যুগে বিশ্ব ইতিহাসে দেখা যায় মহান নেতাদের বাসভবন, রাজনৈতিক কার্যালয় ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তী প্রজন্ম এইসব স্থাপনা দেখে দেশের ইতিহাস ও দেশকে ভালো করে জানতে এবং বুঝতে পারে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের উৎসভূমি এই সুধাসদনও যে একদিন বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনি একটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে বিবেচিত হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সুধাসদনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে এবং গণতন্ত্রের পথে দেশকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা করাই যায়।