নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

প্রায় তিন বছর পর গতকাল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ১৪ দলীয় জোটের শরীক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলেন জোটপ্রধান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে ‘ক্ষমতার বাইরে থাকা’ শরিকরা নিজেদের ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন।

শরিক নেতারা বলেন, জোটভুক্ত হয়ে ভোট করেছি, আমাদেরকে কেন বিরোধী দলে যেতে বলা হলো! এটা কতটা যুক্তিসংগত! তারা বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি, জোটের কর্মপরিধি কী হবে তা এখনই পরিষ্কার করা দরকার।

গতকাল গণভবনে বেলা ১১টা থেকে টানা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত বৈঠক চলে। বৈঠকে ক্ষমতা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও করোনাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বের প্রশংসা করেন শরিক দলের নেতারা। অবশ্য জোট নেতাদের নিরাশ করেননি শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, একসঙ্গে আছি, একসঙ্গেই থাকব। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে একসঙ্গেই লড়াই করব। জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসব। বৈঠকে জোটের শরিক দলের সিনিয়র নেতারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম কমানোর তাগিদ দেন তারা। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

জোটপ্রধান ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন ১৪-দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও মুখপাত্র আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, প্রচার সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাধারণ সম্পাদক শিরিন আক্তার, জাতীয় পার্টি (জেপি)সভাপতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, তরিকত ফেডারেশনের সভাপতি নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, বাংলাদেশ গণআজাদী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এস কে সিকদার, ন্যাপের কার্যকরী সভাপতি আইভি আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, মজদুর পার্টির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাৎ হোসেন, বাসদের রেজাউর রশিদ প্রমুখ।

তবে ১৪ দল থেকে ঘোষণা দিয়ে বের না হলেও শরিফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদ বৈঠকে অংশ নেয়নি।

বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘকাল করোনা থাকায় একসঙ্গে বসতে পারিনি। খুব কঠিন সময় গেছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে আমি ঘরবন্দি। এ অবস্থায় ফাইল সই করি, ফাইল দেখি। আমার বাসার নিচে রান্না হয়। কাজের লোক সিঁড়িতে দিয়ে যায়। পরে খাই। সব কাজ করেছি বাসায় বসে। স্বজনদেরও ঠিকমতো সরাসরি সাক্ষাৎ পাইনি। বাংলাদেশকে ডিজিটাল করতে পেরেছিলাম বলেই ভার্চুয়ালি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। মোবাইল ফোনে যাবতীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছি। এভাবেই জীবন কেটেছে। এ সময় করোনাকালে টিকা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করাসহ দুর্যোগে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা নিয়ে কথা বলেন।

জোটপ্রধান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সূচনা বক্তব্যের পর কথা বলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, আমরা জোট করলাম, ভোট করলাম একসঙ্গে কিন্তু আমাদের কেন বিরোধী দলে যেতে বলা হলো? এটা কতটা যুক্তিসংগত! সাবেক মন্ত্রী মেনন বলেন, মন্ত্রী হওয়া বড় কথা নয়, আমাদের একসঙ্গে থাকাটা হলো বড় কথা। সামনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সব বিষয় এখনই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।

সাম্প্রদায়িক অপশক্তি ও দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়েও কথা বলেন রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, আমরা যারা রাজনীতি করি, তারা যেন কোনোভাবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কাছে বন্দি না হয়ে যাই। পরিস্থিতি সেদিকেই কিন্তু যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার (প্রধানমন্ত্রী) গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে আগামীতে বিষয়টি আরও খারাপের দিকে যাবে।

তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক ঘটনার সঙ্গে আমাদের অনেক নেতা-কর্মী সরাসরি জড়িয়ে পড়ছেন। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যাতে আমাদের কোনো নেতা-কর্মীর এমন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত না হতে পারে।

১৪-দলীয় জোট নেতাদের সম্মান ও জোটের ঐক্যের বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানিয়ে মেনন বলেন, আমাদের জোটে শরিক দলের যেসব নেতা রয়েছেন, তাদের যেন অসম্মান না হয় সেদিকে আপনাকে (প্রধানমন্ত্রী) নজর দিতে হবে। যেন আমাদের জোটের ঐক্য ভেঙে না যায়।

বৈঠকে আমলাতন্ত্র নিয়ে কথা বলেন সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়াও। তিনি বলেন, আমলারা ভোল পাল্টাতে সময় নেয় না। কাজেই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া পদক্ষেপের প্রসংশা করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, আন্তর্জাতিক নানা চাপ থাকা সত্ত্বেও আপনি (প্রধানমন্ত্রী) দেশের স্বার্থ রক্ষা করেছেন। সঠিক সময়ে করোনার টিকা সংগ্রহ, ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি করতে সক্ষমতা দেখিয়েছেন।

সাবেক তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, ১৪ দলের বর্তমান কী ভূমিকা হওয়া দরকার, আগামী নির্বাচন কীভাবে হবে, সরকার গঠন করাসহ কিছু বিষয়ে আপনার (প্রধানমন্ত্রী) দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা বসে নেই। আমাদের বসে থাকলে চলবে না। ষড়যন্ত্রকারী হেফাজতী, জামায়াতিরা পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে চায়। এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরে ন্যাপের কার্যকরী সভাপতি আইভি আহম্মেদ বলেন, আপনার কঠোর পরিশ্রম এবং সময় উপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে আজ দেশের চেহারা বদলে গেছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠেছে। জনগণের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার অনুরোধ জানান তিনি।

জোট নেতাদের দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ে কথার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান আন্তর্জাতিক বিশ্বের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো তার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে। নিত্যপণ্যের ঊর্ধমুখী চলমান সমস্যা নিয়ে তাঁর সরকার কাজ করছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই এর রেজাল্ট পাওয়া যাবে।

জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মন্ত্রীদের ‘অতিকথনের’ বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অনেকে লাগামহীন কথাবার্তা বলেন। এতে অনেক সময় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কে কোন বিষয়ে কথা বলবেন এটা ঠিক করে দেওয়া দরকার। তিনি বলেন, ২৩ দফার ভিত্তিতে ১৪-দলীয় জোট গঠন হয়েছিল। সবাই কিন্তু এই দফাগুলোর সঙ্গে একমত নন। তিনি আরও বলেন, নেত্রী আপনার কাঁধে বন্দুক রেখে অনেকেই চলার চেষ্টা করছেন। এ ব্যাপারটিতে সজাগ থাকা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো মন্তব্য করেননি।

১৪ দলের বৈঠকে উপস্থিত ছিল না বাংলাদেশ জাসদের (আম্বিয়া) কোনো নেতা। এ বিষয়টি উল্লেখ করেন কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, এর আগে তো তাদের একটি সিট (আসন) ছিল। এবার সেটিও নেই। এ কারণে হয়তো অভিমান করেছেন। মিটিংয়ে তারা কেউ আসেননি। তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী তার বক্তব্যে বলেন, নেত্রী আপনিই আমাদের ভরসা। আপনি ছাড়া আমাদের অস্তিত্ব নেই। জেলা-উপজেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে ১৪ দলের প্রতিনিধি রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সংলাপে যোগদান করায় ১৪ দলের নেতাদের ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি বিএনপির অংশ না নেওয়ার কঠোর সমালোচনা করে তাদের ‘নেতৃত্বের শূন্যতা’ তুলে ধরেন।

বৈঠকের একপর্যায়ে আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের পরিকল্পনা কী হবে বা এ বিষয়ে কিছু ভাবছেন কি না জোট শরিক দলের এক নেতার এমন প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, বিগত নির্বাচনের মতোই আগামী দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশগ্রহণ করব। এ সময় উপস্থিত নেতাদের জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান।

বৈঠক শেষে জোটের মুখপাত্র ও সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু সাংবাদিকদের বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪ দল জোটবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করবে। ১৪ দলের ঐক্য বজায় থাকবে। জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করা হবে। সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানে ১৪ দলের যে ভূমিকা সেটিও অব্যাহত থাকবে।

নির্বাচনে আসন বণ্টনের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবীণ এ নেতা বলেন, এখনই আসনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে না। এ জন্য আরও আলোচনা প্রয়োজন। অনেক বিষয়ের ওপর আসন বণ্টন নির্ভর করে। এ আলোচনা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরে হবে।

বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসে তখন কি জোটবদ্ধ নির্বাচন হবে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আমু বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আসবে না এটা তারা বলছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কী করবে এটা দেখার পর আমরা সিদ্ধান্ত নেব।

বিএনপির দেশব্যাপী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ১৪ দল মাঠে নামবে জানিয়ে আমু বলেন, বিএনপির আন্দোলনের বিরুদ্ধে ১৪ দল মাঠে নামবে। প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগকে যে নির্দেশ দেবেন, সে অনুযায়ী ১৪ দলকে ঐক্যবদ্ধ করে কাজ শুরু করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীকে মেননের বই উপহার : ১৪ দলের সভা শেষে গণভবনে শেখ হাসিনাকে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন তার লেখা আত্মজীবনী ‘এক জীবন (প্রথম পর্ব) স্বাধীনতার সূর্যোদয়’ বইটি উপহার দেন।

১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে উপস্থিত থাকা একাধিক নেতা জানান, দীর্ঘদিন পর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪-দলীয় জোটের আলোচনায় সব থেকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জোটকে মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে সক্রিয় করা। মূলত দীর্ঘদিন ধরেই নিষ্ক্রিয় ১৪-দলীয় জোটের সাংগঠনিক কার্যক্রম।