তৈয়ব আলী জোয়ার্দ্দার

ডেভিড ফ্রস্ট : ওরা ঠিক কখন আপনাকে গ্রেফতার করে? সময়টা কি রাত দেড়টা?
শেখ মুজিব : ঘটনার সূত্রপাত মেশিনগানের বৃষ্টি দিয়ে। আমার বাড়ির চারিদিকে অবিরাম আগ্নেয় বৃষ্টি …
ফ্রস্ট: পাক বাহিনী যখন আপনার বাড়িতে পৌঁছে তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
শেখ মুজিব : আমি শোবার ঘরে বসেছিলাম। চারদিক থেকে অগ্নিবৃষ্টি হতে থাকে। আগুনের ফুলকির মতো জানালা দিয়ে গুলি ঢুকে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যায়।

ফ্রস্ট: তাহলেতো ঘরের সব কিছুই বিনষ্ট হয়?
শেখ মুজিব : তাতো স্বাভাবিক। আমি আমার পরিবারের সাথে ছিলাম। হঠাৎ একটা বুলেট এসে আমার শোবার ঘরে ঢোকে …
ফ্রস্ট: পাকিস্তান বাহিনী কোন পথে এখানে ঢোকে।
শেখ মুজিব : এমনিতে সারা বাড়ি ঘিরে রেখেছিল। তারপর ঘরের জানালা লক্ষ্য করে অবিরাম গুলিবর্ষণ চলছিল। এই অবস্থায় আমি আমার স্ত্রীকে সন্তানদের কাছে থাকতে বলি এবং এদের রেখে ঐ ঘর পরিত্যাগ করি।
ফ্রস্ট: আসার পথে আপনার স্ত্রী কি আপনাকে কিছু বলেছিলেন?
শেখ মুজিব : না। ঘটনার অকস্মিকতায় সে হতবাক। আমি শুধু তাকে বিদায় চুম্বন দেই। তারপর কপাট খুলে বের হয়ে এসে গুলি থামাতে বলি, “আমি এখানে, তোমরা গুলি বন্ধ কর। আমি জানতে চাই কিসের জন্য এবং কেনই বা গোলাগুলি করছ?” আমার কথা তাদের কানে যেতেই আরো বিপুল উদ্যোগে অগ্নিবান নিক্ষেপ হতে থাকে এবং কয়েক জন এসে আমাকে ঘিরে ফেলে। আমার উপর বেয়নেট ধরে। একজন অফিসার আমাকে চেপে ধরে বলেন, “একে মেরো না”।
ফ্রস্ট: মাত্র একজন অফিসার।
শেখ মুজিব : মাত্র একজন। আমার পিঠে এবং সামনে উভয় দিকে অস্ত্র দিয়ে গুঁতোতে থাকে এবং তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী এদিক ওদিক ঠেলে নিয়ে যেতে থাকে। অফিসারটি আমাকে ধরে রেখেছিল, তবু তারা আমাকে বিশ্রীভাবে নিচের দিকে ঠেলেছিল। আমি তখন তাদের বলি, এভাবে ঠেলবে না, একটু দাঁড়াও, আমি আমার পাইপটি নিয়ে আসি। পাইপ আর তামাক আমার খুব প্রিয় প্রয়োজনীয়। আমার স্ত্রীর কাছে থেকে ওগুলো আনার অনুমতি দাও। আমাকে ওরা উপরে যেতে দেয়। আমার স্ত্রীকে বাচ্চা দুটোর সাথে দাঁড়ানো অবস্থায় চোখে পড়ে। ওরা আমাকে পাইপ আর একটা ছোট স্যুটকেস এনে দেয়। আমি নিঃশব্দে আসি। আমার দৃষ্টিসীমার চারদিকে জুড়ে ছিল একরাশ আগুনের লেলিহান শিখা, উষ্ণ লাভার মতো।
ফ্রস্ট: আপনিতাে তাদের চোখে অপরাধী; আপনার বিচার কিভাবে করা হয়?
শেখ মুজিব : আমার বিচারের জন্য পাঁচ জন সামরিক অফিসারের সাথে সব অসামরিক অফিসার মিলে আমার বিরুদ্ধে সামরিক আইনের ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিল।
ফ্রস্ট: আপনার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ?
শেখ মুজিব : রাজদ্রোহের। পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ইত্যাদি। সব মিলিয়ে ১২টা অভিযোগ। তার মধ্যে ছয়টার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
ফ্রস্ট: আপনি কি আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন?
শেখ মুজিব : বিচারের বাণী যেখানে নীরবে নিভৃতে কাঁদে সেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়ার মানে ভাওতার আশ্রয় নেয়া। পাকিস্তান সরকার যেখানে আমার বিচার করতে বদ্ধপরিকর সেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কোথায়? কোর্টে নেয়ার পর আমি কোর্টের কাছে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য একজন আইনজ্ঞ নিয়োগের অনুমতি প্রার্থনা করি। কেননা আমি একজন অসামরিক ব্যক্তি। একজন অসামরিক ব্যক্তির বিচার সামরিক আদালতে কখনও হতে পারে না, কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান ইয়াহিয়া খান শুধুমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান নন, প্রধান সামরিক আইন শাসকও। কাজেই সামরিক আদালত ডাকার ক্ষমতা একমাত্র তারই। তাছাড়া সবাই জানে বিচারের নামে একটা প্রহসন চলছিল।
ফ্রস্ট: তাহলে কি আপনার বিচারে শাস্তির সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিল ইয়াহিয়া খানের।
শেখ মুজিব : হ্যা, তিনি ছিলেন সিদ্ধান্তদাতা।
ফ্রস্ট : তারা কি যথাযথ রায় দিতে সক্ষম হয়েছিল?
শেখ মুজিব : ডিসেম্বর মাসে চারদিন কোর্ট মুলতবী ঘোষণা করে ইয়াহিয়া খান সব বিচারক, লেঃ কর্ণেল, ব্রিগেডিয়ার সবাইকে নিয়ে রাওয়ালপিন্ডিতে এক জরুরি সভায় মিলিত হয়ে বিচারের রায় কি হবে সে সম্বন্ধে তার মতামত ব্যক্ত করেন। সর্বসম্মতিক্রমে আমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
ফ্রস্ট : আপনি কি তখন আপনার পাশের সেলে আপনার কবর আবিষ্কার করেন?
শেখ মুজিব : হ্যা আমার সেলের খুব কাছেই আমার কবর খোঁড়া হয়। কবরটাকে স্বচোখে দেখেছি।
ফ্রস্ট: ইয়াহিয়া খান যখন আপনাকে হত্যা করার জন্য নিতে আসে তখন জেল প্রশাসক আপনাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন বলে আমি খবরের কাগজে পড়েছি। তথ্যটা কি সঠিক?
শেখ মুজিব : ইয়াহিয়া খানের সাগরেদরা জেলের ভেতর একটা তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলেছিলেন। কিছু কয়েদিকে আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে ভালো হয়েছিল। খুব ভোরে আমাকে আক্রমণ করে। হত্যা করার একটি পরিকল্পনা আঁটা হয়েছিল, কিন্তু জেলের একজন অফিসার আমার প্রতি বেশ সদয় ছিলেন। তিনি ইয়াহিয়া খানের জেলে আসার দিনক্ষণ সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখতেন। একদিন রাত ৩টার সময় তিনি আমাকে কারাগারের বাইরে নিয়ে এসে তার বাংলোয় আমাকে মিলিটারি পাহারা ছাড়াই লুকিয়ে রাখেন। দুই দিন পর আমাকে ঐ বাংলো থেকে সরিয়ে রাখেন। সেখানে তিনি আমাকে চার-পাঁচ কিংবা ছয় দিন লুকিয়ে রাখেন। কেউ আমার অবস্থান জানতো না। জেলের কয়েক জন অফিসার শুধু আমার সন্ধান জানতো।
ফ্রস্ট: ইয়াহিয়া খান যখন আপনাকে ভুট্টোর হাতে তুলে দেন তখন তিনি আপনাকে আবার ফাঁসি দেবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন—এটা কি সত্য?
শেখ মুজিব : নির্ভেজাল সত্য। এ প্রসঙ্গে মিঃ ভুট্টো আমাকে একটা মজার গল্প বলেছিলেন। ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় ইয়াহিয়া খান মিঃ ভুট্টোকে বলেছিলেন, “শেখ মুজিবকে হত্যা না করে আমি একটি বিরাট ভুল করে ফেলেছি।”
ফ্রস্ট: ইয়াহিয়া খান কি ঠিক এ কথাই বলেছিলেন?
শেখ মুজিব : হ্যা, ইয়াহিয়া খান ভুট্টোকে বলেছিলেন ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে মুজিবকে হত্যার অনুমতি দিন। তিনি আবারো বলেছিলেন দিন তারিখ পিছিয়ে দিন, ক্ষতি নেই। কিন্তু দয়া করে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে মুজিবকে হত্যা করার অনুমতি দিন। কিন্তু ভুট্টো মত দেননি। প্রস্তাবটি প্রত্যাখান করেছেন।
ফ্রস্ট: এর জবাবে ভুট্টো কি বলেছিলেন তা কি তিনি আপনাকে বলেছিলেন?
শেখ মুজিব : হ্যা, ভুট্টো বলেছিলেন, তিনি তা পারেন না, কারণ এর প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী হতে বাধ্য। এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য এবং বেসামরিক ব্যক্তি তখন বাংলাদেশে বন্দি, বাংলাদেশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর কজায় তারা দিন কাটাচ্ছে। এ ছাড়া পাঁচ থেকে দশ লক্ষ অবাঙালির অবস্থান বাংলাদেশে। এ অবস্থায় শেখ মুজিবকে যদি হত্যা করা হয় এবং আমি যদি ক্ষমতা দখল করি তাহলে বাংলাদেশ থেকে একজন পাকিস্তানীও পশ্চিম পাকিস্তানে আর কোনোদিন ফিরে আসতে পারবে না। এরা ফেরৎ না এলে পশ্চিম পাকিস্তানে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে এবং আমার অবস্থাও শোচনীয় হবে।
তথ্য সুত্র : ফ্যাক্টস্ এন্ড ডকুমেন্টস্ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড – অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, গৌরব, সংগ্রামের নোটবুক
লেখক ও সংগ্রাহক : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক এই আমার দেশ।