দিলীপ কুমার আগরওয়ালা : রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিপুল প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের স্বজনরা আহাজারি করছেন। দুই দিন আগেও রিকশা-গাড়ি আর মানুষে সরগরম ছিল নন্দকুমার দত্ত গলি। মুহূর্তের আগুনে পুড়ে চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড় এখন ধ্বংসস্তূপ। শোকে স্তব্ধ সারাদেশ। ধ্বংসস্তূপ, হাসপাতাল আর মর্গে অনেকে ছোটাছুটি করেছেন নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে। প্রিয়জনের শেষ বিদায়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন কেউ কেউ। মানুষের হৃদয়বিদারক এমন দৃশ্যে ভারি হয়ে যায় আশপাশের বাতাস।

আরো খবর পড়তে ক্লিক করুন
রাজশাহীতে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের নতুন শাখা উদ্বোধন
সর্বোচ্চ করদাতা পুরস্কার পেলেন দিলীপ কুমার আগরওয়ালা
সিআইপি দিলীপ কুমারকে চুয়াডাঙ্গা চেম্বারের সংর্বধনা

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বাইরে বাতাস ভারী হয়েছে স্বজনদের বিলাপে। সামান্য স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়েছে মানুষের জীবন। ‘জীবনের চেয়ে বাণিজ্য বড়’—এটিই যেন নতুন করে প্রমাণ করে দিয়ে গেল চকবাজারের অগ্নিকাণ্ড। হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করতে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নিহত শ্রমিকদের প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা সহায়তা দিচ্ছে শ্রম মন্ত্রণালয়। তাদের চিকিৎসার জন্য দেওয়া হবে ৫০ হাজার টাকা। চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। যত কিছুই করা হোক না কেন, স্বজন বিয়োগের ঘটনা কি ভুলতে পারবে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা?
চকবাজারের চুড়িহাট্টা হাজী ওয়াহেদ মিয়ার বাড়িতে আগুনের সূত্রপাত। দ্রুত আগুন ধারে-কাছের আরও চারটি বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তবে পানি সংকটে আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের হিমশিম খেতে হয়। অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী আশপাশের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। অগ্নিকাণ্ডে যে পাঁচটি বাড়ি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এর প্রতিটির নিচতলায় পারফিউমারি ও প্লাস্টিক সামগ্রীর দোকান ও গুদাম ছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর স্বভাবতই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের হিমশিম খেতে হয়। বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির পাশাপাশি অগ্নিদগ্ধ হয়ে এবং ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে বিপুলসংখ্যক লোক আহত হয়েছেন। তাদের কারও কারও অবস্থা আশঙ্কাজনক।
স্মর্তব্য, প্রায় নয় বছর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যালের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়।
আগুনে পোড়া লাশের মিছিল দেশের ১৬ কোটির বেশি মানুষের হৃদয়কে ব্যথাতুর করেছে। শুক্রবার সারা দেশে মসজিদে মসজিদে দোয়া, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডায় উচ্চারিত হয়েছে একই ধরনের আর্তস্বর। নিমতলীর পর চকবাজারে কয়েক শ পরিবার যে ট্র্যাজেডির শিকার হলো তার প্রধানতম কারণ ঘিঞ্জি জনপদে কেমিক্যাল বা দাহ্য পদার্থের গুদাম বা দোকানের অবস্থান। নিমতলী ঘটনারই প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্তি ঘটেছে বুধবার রাতে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার চুড়িহাট্টায়। দায়িত্বহীনভাবে ফেলে রাখা বিপজ্জনক সব কেমিক্যাল নিমতলী স্টাইলে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে মহল্লার পাঁচটি বিশাল অট্টালিকা। কেড়ে নিয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণ। রাজধানীর চানখাঁরপুল-সংলগ্ন নিমতলীতে ২০১০ সালের ৩ জুন রাতে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের বিস্ফোরণে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে ১২৩ জন প্রাণ হারান। আহত হন অর্ধশতাধিক। পুড়ে যায় ২৩টি বসতবাড়ি, দোকান, কারখানা, আর অসংখ্য মানুষের অজস্র স্বপ্ন। উভয় ঘটনাস্থলের পাশে ছিল বিপজ্জনক কেমিক্যালের গুদাম। দাহ্য পদার্থ ছিল চারপাশজুড়েই।
আমরা আশা করব, চকবাজার ট্র্যাজেডির পর পুরান ঢাকার জনপদ থেকে কেমিক্যাল গোডাউন স্থানান্তর অচিরেই শুরু হবে।
চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আমরা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত এবং হতাহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। এ ধরনের আর কোনো ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করতে পুরান ঢাকার জনবসতি এলাকা থেকে বিস্ফোরক দ্রব্যের দোকান ও গুদাম দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে- এমনটিও কাম্য।

লেখক: পরিচালক, এফবিসিসিআই, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেড।