সংকলন ও প্রবেশক :: ভূঁইয়া ইকবাল

জীবনানন্দ দাশের একটি লুপ্ত কবিতা

জীবনানন্দ দাশ [১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯-২২ অক্টোবর, ১৯৫৪] অলঙ্করণ ::বোরহান আজাদ

এখানে গ্রথিত কবিতাটি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পত্রিকা মাসিক ‘প্রবাসী’তে যখন প্রথম প্রকাশ পায় [মাঘ, ১৩৩৪] তখন জীবনানন্দের বয়স তিরিশ বছর; কলকাতায় সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যের নবীন অধ্যাপক। নামের আগে এখনও ‘শ্রী’ যুক্ত এবং তিনি ‘দাশগুপ্ত’ উপাধিধারী। পত্রিকার ওই সংখ্যায় আরও কবিতা লেখেন রবীন্দ্রনাথ [‘সিয়াম’] ও হেমচন্দ্র বাগচী [‘নবীন মন্ত্র’]।

প্রবাসীতে জীবনানন্দের আরও দুটি কবিতা আগের বছর ছাপা হয়েছিল- ‘বেদিয়া’ [শ্রাবণ ১৩৩৩] ও ‘ডাহুকী’ [আশ্বিন ১৩৩৩]। কবিতা দুটি কবির প্রথম কাব্য ‘ঝরা পালকে’ (১৯২৭) স্থান পায়।

ব্রাহ্মসমাজীদের পত্রিকা ‘প্রবাসী’তে কবি-জননী কুসুমকুমারী দাসেরও দুটি কবিতার সন্ধান পাওয়া গেছে- ‘মায়ের প্রতি’ (জ্যৈষ্ঠ ১৩১৩) ও ‘পরলোক-বাসিনী’ (জ্যৈষ্ঠ ১৩১৬)।

কবির জীবিতকালে তার ছয়টি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত : ‘ঝরা পালক’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’, ‘বনলতা সেন’ এবং ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। ‘বনলতা সেন’-এর ষোলো পৃষ্ঠার একটি কৃশকায় পুস্তিকা-সংস্করণ বরিশাল থেকে প্রকাশরূপে জীবনানন্দের নামে মুদ্রিত হয়েছিল বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ভবনের ‘এক পয়সার একটি’ গ্রন্থমালার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে (১৯৪২)।

উল্লিখিত কাব্য সংকলনগুলোর মধ্যে প্রথম কাব্য ঝরা পালকে ‘কবি’ শিরোনামে (প্রথম চরণ : ভ্রমরীর মতো চুপে চুপে সৃজনের ছায়াধূপে ঘুরে মরে মন) একটি কবিতা গৃহীত। আবদুল মান্নান সৈয়দ জানিয়েছেন, ‘উত্তরসূরী’ পত্রিকায় ‘কবি’ নামে (কবিকে দেখে এলাম) আরও একটি কবিতা প্রকাশ পেয়েছিল (কার্তিক-পৌষ ১৩৬২)।

উদ্ধৃত এই কবিতাটি কবির কোনো কাব্যে কিংবা আবদুল মান্নান সৈয়দ-সম্পাদিত মহার্ঘ্য গ্রন্থে (প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতা সমগ্র) সংগ্রথিত হয়নি; তবে ওই গ্রন্থের পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা তালিকায় কবিতাটির উল্লেখ আছে।

‘প্রবাসী’র উল্লিখিত সংখ্যাটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ কোষ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত। কবিতাটি পেয়েছি মখসুদুর রহমানের সৌজন্যে।

কবি
শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত

বীণা-হাতে আমি তব সিংহাসনতলে
কালে-কালে আসি কবি,- কভু পরি গলে
জয়মালা,- কভু হিংস্র নির্দ্দয় বিদ্রূপ
তুলে’ লই অকুণ্ঠিতে,- খুঁজে ফিরি রূপ
সৃজনের ছায়াধূপে,- আকাশে আলোকে;
ধরণী ডুকারি’ ওঠে যে ব্যর্থতা- শোকে,
তারো মাঝে স্বপ্ন খুঁজি,- বীণাতারে বুনি
তারো সুর,- আনমনে গান গাই গুণী!
তুলিয়া ল’য়েছি আমি পতাকা তোমার,
হে সুন্দর,- আমি তব দৌবারিক,- দক্ষিণের দ্বার
উন্মুক্ত রেখেছি নবনবীনের লাগি’!
অন্ধকারে দীপ-হাতে আছি আমি জাগি’।
আমি হেরিয়াছি,- শুভ্র, তোমার গৌরব
ঘৃণ্য নগণ্যের মুখে,- কালে কালে করিয়াছি স্তব
বীভৎস কুৎসিত-কুণ্ডে, পঙ্কের ভাণ্ডারে
তোমারেই;- দেখিয়াছি তুমি আসি’ দাঁড়ায়েছ দ্বারে
অন্ধকারে,- রিক্ততারে করিয়াছ জয়ী
তোমার মঞ্জীরস্পর্শে চুপে রহি’ রহি’!
বিকৃত তৃষ্ণার ব্যথা- বন্ধনের রক্তকৃষ্ণরেখা
বিনাশিয়া অরুণিমা দিয়ে গেছ দেখা
রাত্রির যাত্রীর ভীত নিঃস্পন্দিত চোখে!-
অতি দূর অনাগত স্বপ্নের আলোকে
আগতের ভাবলোকে তুলেছ উৎসব!
কবি আমি, যুগে যুগে করি তব স্তব!
দিবসনিশার রক্ত-দহনের আলো
জাগায় বিনিন্দ্র ব্যথা,- তবু বাসি ভালো
সুর তার;- যা হারাল,- পাব নাক’ ফিরে’,
তারি খোঁজে নিত্য ঊষা গোধূলির তীরে
ফিরি আমি,- অশ্রুমান,- ব্যথার তাপস!
ভালোবাসি বেদনারে,- ঐশ্বর্য্যের যশ
চাহি নাক’,- মাগিনাক’ প্রসাদ- সম্মান;
আমি কবি,- পথে পথে গেয়ে যাব গান;
পদে পদে মৃত্তিকারে মঞ্জীরের মত
বাজায়ে চলিব আমি,- আমি অনাহত
আদি মানবের ছন্দে উঠিব ঝঙ্কারি’
নীলিমার জয়গান,- শ্যামশ্রষ্প নিঙাড়ি’ নিঙাড়ি’
ভরি’ লব শোণিতের সুরাপাত্রখানা!
যে-ছবি ফোটেনি আজো,- যেই রূপ অনামা, অজানা,
তাহারে হেরিব ঊষাসন্ধ্যারাগে শিশুর মতন!
সিন্ধুতীরে পেতে’ লব রৌদ্রের শয়ন;
তাম্রঅঙ্গে শঙ্খচূর্ণ ধুম্রবালু মাখি’
কলরবে পায়ে-চলা পথ যাব আঁকি’
সমুদ্রফেনার মত;- যেই কথা কহে নাই কেউ
যে গান গায়নি কেহ,- তারি সিন্ধু-ঢেউ
তুলে’ যাব কূলে কূলে,- পৃথিবীর প্রথম বয়স
ফিরায়ে আনিব আমি,- আদি ঊষা,- আদিম দিবস,
ঊর্ম্মিস্নাত মানবের অসীম উল্লাস,
প্রথম-রহস্য-ব্যথা,- বিস্ময়ের ত্রাস,
প্রকাশ করিব মোর স্নায়ুর যৌবনে!
আদিম সন্তান আমি,- রোম-শিহরণে
গাব গান;- স্বর্ণশীর্ষ নীবারমঞ্জরী’-
মধ্যাহ্নরৌদ্রের বুকে আপনারে ছিন্ন করি’ করি’!