কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) পৃথ্বীরঞ্জন দাস : ক’দিন ধরেই দেখছি, চারদিকে যুদ্ধ-যুদ্ধ রব। যাঁরা এই যুদ্ধের হুঙ্কার দিচ্ছেন, তাঁরা কেউ যুদ্ধে যাওয়া তো দূর, ক’জন কাশ্মীরের সীমান্ত দেখেছেন তা নিয়েই আমার সন্দেহ রয়েছে। তবু তাঁরাই রাতদিন ‘যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ চাই’ বলে চলেছেন। যত এ সব শুনছি, ততই যেন ফিরে যাচ্ছি নব্বই দশকের কাশ্মীরের উত্তাল দিনগুলোতে। আর বারবার মনে পড়ছে সর্দার প্রীতম সিংহের কথা।

তখন আমি মেজর। নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে হাজারে বলে একটা জায়গায় সেনা ছাউনির দায়িত্বে রয়েছি। সেখানেই জলের পাইপ বসাতে এসেছিলেন সর্দার প্রীতম সিংহ। মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের বয়স্ক কর্মী। সে দিন বেশ খুশি ছিলেন সর্দারজি। নাতি ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়েছে। আমি কথায় কথায় বলেছিলাম, সর্দারজি, অনেক তো বয়স হল। কেন আসেন এমন বিপজ্জনক জায়গায়? উনি বলেছিলেন, স্যর, দো দিন বাদ মেরা পোতা ভি আপকে তরাহ্‌ অফিসার বন জায়েগা। আপ লোগোকে সাথ মেরা এক দিল কা রিস্তা বন গ্যয়া। ম্যায় তো ইঁহা আপনে মর্জি সে আতা হু।

পাইপ বসানোর কাজ শেষও হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ পাইপের মাঝে একটা জায়গা থেকে জল লিক করা শুরু হল। তা দেখে রেঞ্চ হাতে সেই পাইপের ভালভ আটকাতে গিয়েছিলেন সর্দারজি। আর সেই সময়েই ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এল পাকিস্তানি সেনার মেশিনগানের গুলি। দেখলাম, রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়লেন প্রৌঢ় শিখ। এটাই কাশ্মীরের সেনা ক্যাম্পের বাস্তব!

সে দিন সর্দার প্রীতম সিংহকে লুটিয়ে পড়তে দেখেও আমরা কেউ ছুটে তাঁকে তুলে আনতে যাইনি। কারণ, সর্দারজিকে মারা পাক সেনার শুধু লক্ষ্যই ছিল না, ওটা ছিল একটা ফাঁদও। আমাদের জওয়ানেরা আগুপিছু না-ভেবে সর্দারজিকে তুলে আনতে গেলে সীমান্তের ও পারে থাকা মেশিনগানের গুলি ওদেরও ঝাঁঝরা করে দিত। কষ্ট হলেও সারা দিন সর্দারজির দেহ তুলে আনতে পারিনি। এ পার থেকে গুলি করে পাল্টা জবাব দিয়ে বিকেলে নিয়ে এসেছিলাম নিথর মানুষটাকে। এটাই সেনাদের ক্যাম্পের জীবন। যেখানে প্রতি পা হিসেব কষে ফেলতে হয়। তা না হলেই বিপদ অনিবার্য।

আসলে সেনাদের জীবন সিনেমার মতো নয়। রোমাঞ্চ নিশ্চয়ই থাকে, কিন্তু তাতে কোনও নিপুণ চিত্রনাট্যকারের গল্প থাকে না। বরং নিত্যদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি থাকে। যেমন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয় শারীরিক কসরত। মিনিট পঁয়তাল্লিশের সেই কসরত শেষ হওয়ার পরে নিজেদের সঙ্গের যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হয়। তার পরে স্নান সেরে জলখাবার খেয়ে যে যার কাজে লেগে পড়ে। কেউ বন্দুক নিয়ে ডিউটিতে যায়, গাড়ির চালক গাড়ি পরীক্ষা করে। মাঝে এক বার চা মেলে। তার পর দুপুরের খাবার। তার পর ক্যাম্পের আশপাশে ঘাস, আগাছা কাটতে হয় জওয়ানদের। অফিসারদের নানান কাগজপত্র সইসাবুদ, লেখাজোখার কাজ সারতে হয়। বিকেলে খেলাধুলো করার সময় মেলে। সন্ধ্যায় এক জন সুবেদার এসে পরের দিন কার কী ডিউটি তা জানিয়ে দেয়। প্রতি তিন রাত অন্তর এক-এক জওয়ানকে নাইট ডিউটি করতে হয়। সারা রাত তাঁর পাহারার দায়িত্ব থাকে। আর ক্যাম্পের স্বাচ্ছন্দ্য! প্রীতম সিংহ এসেছিলেন জলের পাইপ বসাতে। কারণ, ওই ক্যাম্পে জলের জোগান ছিল না। রোজ জওয়ানদের পাহাড় বেয়ে নীচে নেমে জল তুলে আনতে হত।

এ তো গেল রোজকার রুটিন। কিন্তু যদি কাজের চাপ থাকে, সীমান্তে উত্তেজনা থাকে, তা হলে কোনও রুটিনই থাকে না। সারা দিন জংলা উর্দি পরে, কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে, গোলাবারুদ নিয়ে ডিউটি করে যাও। অনেকেই ভাবেন, সেনার চাকরি মানেই তো শুধু হইহল্লা, মদ খাওয়া। আসলে ছবিটা তার থেকে অনেক অনেক আলাদা। মনে রাখবেন, দুশমনের চোখে চোখ রেখে বসে থাকায় শুধু শরীর নয়, মনের উপরেও চাপ পড়ে। কর্পোরেট ভাষায় যাকে বলে স্ট্রেস!

এ তো গেল কাশ্মীরের কথা। যদি আরও একটু উপরে উঠে যাই লে, লাদাখ কিংবা সিয়াচেনে! কম অক্সিজেন, চারপাশে শুধু বরফ আর বরফ। তার মধ্যেই কোথাও রয়েছে চোরা ফাটল! কখনও আবার নেমে আসে তুষারধস। তীব্র ঠান্ডায় তুষারক্ষতে অঙ্গহানির ভয় রয়েছে। পদে পদে সেই ভয় নিয়েই জওয়ানেরা থাকে। সেখানে শুধু পাকিস্তান বা চিন নয়, বিপক্ষ প্রকৃতিও। ওই কঠিন পরিস্থিতিতে থাকার অনুভব বসার ঘরের নরম সোফায় বসে আঁচ করা অসম্ভব।

ঠিক যেমন সেনা অপারেশন মানেই ‘হাউ ইজ় দ্য জোশ’ বলে চেঁচানো নয়। সব রেজিমেন্টেরই নিজস্ব রণহুঙ্কার রয়েছে। কিন্তু কম্যান্ডোদের ক্ষেত্রে কোনও রণহুঙ্কার থাকে না। কারণ ওদের অভিযান নিশ্চুপে সারতে হয়। সেখানে গিয়ে ‘হাউ ইজ় দ্য জোশ’ বলে চেঁচালে শত্রুর হাতে খতম হওয়ার আশঙ্কা ষোলোর উপরে আঠেরো আনা। তবে অপারেশনে বেরোনোর আগে কম্যান্ডোদের চাঙ্গা করতে ‘হাউ ইজ় দ্য জোশ’ জিজ্ঞাসা করেন কম্যান্ডিং অফিসার। ওইটুকুই! বাকিটা অপারেশন, সিনেমা নয়।

আসলে চারপাশের সঙ্গে মিলিয়ে সেনা ছাউনির ভিতরটাও বদলে গিয়েছে। চাকরি জীবনের গোড়ায় দেখতাম, ছাউনির ভিতরে সাধারণ জওয়ানেরা একে অন্যকে ‘রাম রাম’ বলে অভিবাদন করত। বাঙালি চোখে একটু কেমন যেন ‘গোঁড়ামি’ লেগেছিল। ভারতীয় সেনা মানেই তো শুধু একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকজন না। তবে আমরা অফিসারেরা ইংরেজি অভিবাদনই করতাম। সেই ‘রাম রাম’ কিন্তু এখন আর নেই। এখন ছাউনিতে অভিবাদন মানে ‘জয় হিন্দ’।

কাশ্মীর প্রথম গিয়েছিলাম ১৯৮৩ সালে। তখন আমি আর্টিলারি রেজিমেন্টের সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। চাকরির অঙ্গ হিসেবে গুলমার্গের হাই অল্টিটিউড ওয়ারফেয়ার স্কুলে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলাম। তখন ভূস্বর্গ উত্তপ্ত হয়নি, চারপাশ দেখে মনে হত, সত্যিই স্বর্গে রয়েছি। আর পর্যটকদের প্রিয় জায়গা বলে কাশ্মীর কি কলি-ও কম থাকত না। আর থাকত কিছু নবদম্পতি। মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল বাঙালি গৃহবধূরা কাশ্মীরে গিয়ে সালোয়ার পরে ছবি তুলত। সেই সালোয়ারগুলি অবধারিত ভাবেই চেহারার তুলনায় বেঢপ হত! পরে যে কাশ্মীরকে দেখেছি, এখন যে কাশ্মীরকে দেখছি, তার সঙ্গে সেই ১৯৮৩-র কাশ্মীরকে কিছুতেই মেলানো যায় না।

আসলে উপদ্রুত এলাকায় শুধু নল উঁচিয়ে কাজ হয় না, অনেক সময় হাত জোড় করেও কাজ হাসিল করতে হয়। মনে রাখতে হবে, আমি গিয়েছি এলাকা শান্ত করতে, আমি কত রাগী সেনা অফিসার তা প্রমাণ করতে নয়। এই সারকথা আমি বুঝেছিলাম চাকরিজীবনের শুরুতেই, ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ এবং পরবর্তী কালে অশান্ত পঞ্জাব সামলাতে গিয়ে।

যাই হোক, ১৯৮৩-র পর ফের কাশ্মীরে গেলাম ১৯৯০ সালে। তখন কাশ্মীর জ্বলছে, সীমান্তে জঙ্গি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তৎপর আমরা। সে সময় রাতের পর রাত গ্রামের ভিতরে লুকিয়ে থাকতে হত। কারণ, গ্রামের কোনও বাড়িতে রাত কাটিয়ে ভোরবেলা পাকিস্তান থেকে ঢুকে পড়া জঙ্গিরা পালাত। সেই সময় শুরু হত সেনাদের অভিযান। গ্রামের কুকুরদের সামলে কনকনে ঠান্ডায় রাতভর ঝোপের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকা কতটা কঠিন কাজ, তা যাঁরা করেছেন একমাত্র তাঁরাই জানেন। টিভির পর্দায় সিনেমা দেখে সেই অনুমান করা মোটেই সহজ নয়। শুধু কি তাই, সে কালে গ্রামের মহিলারা অন্ধকার থাকতেই কাছের জঙ্গলে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেতেন। তাঁরা যাতে অস্বস্তিতে না পড়েন, তাই সেই মতো জায়গা বাছতে হতো। সেও চাট্টিখানি কাজ নয়।

আসলে সীমান্তের এই ক্যাম্প মানেই পদে পদে বিপদ। চিত্রনাট্যের নাটকীয়তায় ভরা জীবন নয়, ঘোর বাস্তব। কাশ্মীরের এক ক্যাম্পে দেখেছিলাম, রাতের বেলা কারা যেন পাইপের মতো সরু সরু নল লাগিয়ে যায়। তার পর সূর্য চড়লেই কোথা থেকে ছোট ছোট রকেট উড়ে এসে জওয়ানদের ঘায়েল করে। তল্লাশি করে বুঝলাম, পাক জঙ্গিরাই ওই নলে রকেট পুরে যায়। সঙ্গে থার্মাল সেন্সর লাগানো। রোদের উত্তাপেই তা রকেট ছুড়ে দেয়। হাত লাগালে সেই উত্তাপেও তা হতে পারে। আমি তো এক বার ভুল করে হাত দিতে গিয়েও সরিয়ে নিয়েছিলাম। পরের দিনই অন্য এক অফিসার সেই একই ভুল করল! ভুলের খেসারতও দিতে হল তাঁকে। এটাই ক্যাম্পের জীবন।

যারা যুদ্ধ-যুদ্ধ করে চেঁচায় তারা ভুলে যায় যে উর্দি পরা লোকগুলোও মানুষ, কোনও ভিডিয়ো গেমের চরিত্র নয়। স্ত্রী-সন্তান-পরিবার ছেড়ে তাঁরা দুর্গম জায়গায় থাকেন বটে, কিন্তু মানসিক কষ্ট তাঁদেরও হয়। পরিবারকে কাছে পেয়েও সরিয়ে দিতে হয়, কারণ উপদ্রুত এলাকায় নিরাপত্তার কোনও স্থিরতা থাকে না।

এ প্রসঙ্গে ছোট্ট একটা গল্প বলি, তবে ঘটনাস্থল কাশ্মীর নয়, অশান্ত মণিপুর। আমি সেখানে, আর আমার স্ত্রী, দুই ছেলে কলকাতায়। গরমের ছুটিতে ওরা মণিপুর গিয়েছিল। কিন্তু যে দিন পৌঁছল সে দিনই জঙ্গিরা একটা টেলিফোন টাওয়ার উড়িয়ে দিল। রাতেই বাহিনীকে নিয়ে অভিযানে বেরোলাম। গুলির লড়াইয়ে দুজন জঙ্গিকে পাকড়াও করে পুলিশের হাতে তুলে দিই। পর দিন সকালেই দেখি কম্যান্ডিং অফিসার এসে হাজির। এই হাঙ্গামা থেকে তিনি আমার স্ত্রী, ছেলেদের সরিয়ে নিয়ে গেলেন। আর পরের রাতেই হামলা হল আমার ছাউনিতে! যদিও সে যাত্রায় সেনাদের কেউ হতাহত হয়নি।

কয়েক দিন পর ছোট ছেলের জন্মদিনে ওরা আমার ছাউনির কোয়াটার্সে এসেছিল। তখন পরিস্থিতি তুলনায় শান্ত। মনে আছে, ১০ জুন ওরা ফিরবে। ইম্ফল থেকে কলকাতার প্লেন ধরার কথা। আমার ছাউনি থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে ছোট একটা জনপদ পেরিয়ে ডিমাপুর, আর ডান দিকে গেলে ইম্ফল। ওই জনপদের একটা মন্দিরে এক বাঙালি পুরোহিত ছিলেন, নদিয়ার মানুষ। আমার সঙ্গে ভালই আলাপ ছিল। প্লেন ধরার আগে সপরিবার ওই মন্দিরে গিয়েছিলাম। যাওয়ার সময় দেখলাম, একটা মোটরসাইকেলে দুটো ছেলে ফলো করছে। তবে বেশি দূর গেল না। যাই হোক, মন্দির ঘুরে ইম্ফল থেকে প্লেনে তুলে দিলাম ওদের। সন্ধের পর নিরাপত্তার নিয়ম মেনে অন্য একটা গাড়িতে দুজন কম্যান্ডোকে নিয়ে ফিরলাম ছাউনিতে।

পর দিন সকালে কম্যান্ডিং অফিসারের ফোন পেয়ে গায়ে যেন বিদ্যুতের শিহরন খেলে গেল! এখনও কানে বাজে সেই কথাগুলো। ফোনে বললেন, তোমাদের ঈশ্বর রক্ষা করেছেন। জানো কী হয়েছিল? তোমাদের খতম করতে ইম্ফলের রাস্তায় ওত পেতে বসে ছিল জঙ্গিরা। তুমি ডিমাপুরের রাস্তায় যাচ্ছ দেখে ওরা তখনকার মতো সরে গিয়েছিল। পরে যখন বুঝতে পারে তোমরা হয়তো ওদের বোকা বানাতে মন্দির ঘুরে এসেছ, তখন তুমি বিকেলে ফিরবে এই ভেবে আবার বসে ছিল। কিন্তু তুমি সন্ধের পর অন্য গাড়িতে ফেরায় ওদের

সেই ছকও বাতিল হয়। তোমার দেরি দেখে ওরা ভেবেছিল, তুমি বুঝি পরের দিন ফিরবে। গতকাল রাতেই আমরা এক জঙ্গিকে ধরেছি। ওই এ সমস্ত কথা উগরে দিয়েছে।

যাঁরা ঘরে বসে টেলিভিশন দেখে যুদ্ধকে খেলা ভাবেন, তাঁরা জানেন না, জীবন ও মৃত্যুর ফারাক খুবই সামান্য। তাঁরা জানেন না, নিজে বেঁচে গেলেও সহযোদ্ধার মৃত্যু কতটা আঘাত দিয়ে যায়। তাঁরা জানেন না, দেশের কোনও বিপথগামী তরুণকে গুলি করলেও জওয়ানের বুকে সেই ধাক্কা লাগে। হয়তো সবার সেই কষ্ট মালুম হয় না, কিন্তু অনেকেরই হয়।

সেনার চাকরি থেকে অবসর নিয়েও তাই পুরনো কথাগুলো ভুলতে পারি না। কানের কাছে গুনগুন করতেই থাকে সেই গানের কলি, তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল!

আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় থেকে।