নিজস্ব প্রতিবেদক : সরকার পরিচালনা করতে গেলে অবশ্যই প্রধানকে আমলাদের ওপরে নির্ভর করতে হয়। সরকারী কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া একটি রাজনৈতিক দল তার নির্বাচনী কর্মসূচী এবং জনগনের কাছে দেওয়া অঙ্গিকার পূরণ করতে পারে না। কারণ সরকার ব্যবস্থার কাঠামোটাই এমন। যেখানে প্রজাতন্ত্র পরিচালিত হয় মূলত সরকারী কর্মকর্তাদের দ্বারাই। কাজেই সরকারী কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া রাজনৈতিক কর্মসূচী বাস্তবায়ন বাংলাদেশের মতো আমলা নির্ভর রাষ্ট্রে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু অন্যদিকে সরকারী কর্মকর্তারা আবার প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করা আইনগতভাবে সম্ভব নয়। যদিও বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো রাজনীতি যুক্ত আমলাতন্ত্র নেই। এখানে আমলাতন্ত্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে বিযুক্ত করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পক্ষপাত হতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো যে, যখনই যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে সেই সরকারের আদর্শ মনোভাবাপন্ন হয়ে সরকারকে সফল ও ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করেছেন। যার জন্য এখন প্রশাসন ও আমলাদের মধ্যে দেখা যাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুইটা দলে বিভক্ত। দীর্ঘদিন ধরেই এটা চলে আসছে। আওয়ামী লীগ যখন ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন আমলাতন্ত্রের একটা বড় অংশই ছিল আওয়ামী বিরোধী। কারণ বিভিন্ন সময় জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ দ্বারা নিয়োগকৃত ছিল আমলারা। সেই সময় গোপালগঞ্জ, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন আওয়ামী লীগ প্রধান এলাকা থেকে কেউ সরকারী চাকরির জন্য পরীক্ষা দিলে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা হতো নানা কৌশলে। যার ফলে আমলাতন্ত্রে আওয়ামী লীগ মনোভাবাপন্ন বা আওয়ামী লীগে বিশ্বাসী লোকংসখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু এই স্বল্প সংখ্যক আওয়ামী মনোভাবাপন্ন বা আওয়ামী মনোভাবে বিশ্বাসী আমলাতন্ত্রর মাঝে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী এলাকায় ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য অনেকখানি নির্ভর করতে হয় এই আমলাদের উপরই।

উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ সালে বিজয়ী হওয়ার প্রেক্ষাপট ছিলো জনতার মঞ্চ। সেই জনতার মঞ্চ গঠনের ক্ষেত্রে আমলাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই সময় সচিব শফিউর রহমান এবং ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে পরিচিত হন এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অবশ্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আমলাতন্ত্র থেকে তিনি রাজনীতিবিদে পরিনত হন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সভাপতির বিশ্বস্ত বা আস্থাভাজন আমলাদের মধ্যে ছিলেন ড. সামাদ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়াও ড. মশিউর রহমানও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একজন আমলা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নানা বিষয়ে তাদের ওপর নির্ভর করতেন, তাদের অনেক পরামর্শ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি গ্রহণ করতেন বলে জানা যায়।

২০০১ সালে বিএনপি জামাত ক্ষমতায় আসে। এ সময় আমলারা সবাই ভোল পাল্টে বিএনপি- জামাত হয়ে যায়। কিন্তু তার মধ্যে কয়েকজন আমলা গোপনে আওয়ামী লীগ সভাপতির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। তার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে শলা-পরামর্শ করেছেন। ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কোন কোন জায়গায় নজড় দেওয়া দরকার সেই ব্যাপারে মত বিনিময় করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর সচিব, পরে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। তাকে তিন বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দেওয়া হয়েছিল। তবে মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িয়ে পড়ায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হলেও একসময় প্রধানমন্ত্রীর বলয় থেকে ছিটকে পরেন।

২০০৯ থেকে বিভিন্ন আমলারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। এদের অনেকেই আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বস্ততা অর্জন করেছেন। এদের মধ্যে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি হলেন আবুল কালাম আজাদ। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। এরপর তিনি বিদ্যুৎ জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ইআরডির সচিব হন এবং তারপর তিনি আসেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। প্রথমে সচিব পরে মুখ্য সচিব। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আমলাদের অন্যতম বলে তাকে মনে করা হয়। তিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বাস্তবায়নের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ড. নজরুল ইসলাম খান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব থেকে পরবর্তীতে সচিব হয়েছিলেন। সেখান থেকে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যান। সেখানে গিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার কারণে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও তার দূরত্ব তৈরী হয় বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তিনি চাকরীকালীন অবস্থাতেই প্রধানমন্ত্রীর বলয় বৃত্ত থেকে বের হয়ে যান বলে প্রশাসনের বিভিন্ন মহল থেকে জানা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর আমলাদের জন্য আরেকজন ছিলেন ড. কামাল চৌধুরী। আওয়ামী লীগ সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রথমে অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি তথ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা থেকে তিনি যান জনপ্রশাসনে। প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং আস্থাভাজন হিসেবে তিনি পরিচিত। তার চাকরি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষকীর উদযাপন কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রীর এখনো ঘনিষ্ঠ এবং আস্থাভাজন মানুষ হিসেবে তিনি পরিচিত।

আমলাদের মধ্যে ড. মোজাম্মেল হোসেন খানও প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং আস্থাভাজন ছিলেন। তাকেই প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব করার কথা ছিল। কিন্তু আমলাতন্ত্রের ভিতরকার রাজনীতিতে তিনি ছিটকে পড়েছেন। বর্তমানে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। তবে তিনি এখনো প্রধানমন্ত্রীর প্রিয় ভাজন।

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করেছেন ড. এস এ মালেক। তিনি প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে তিনি স্থায়ী মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকে তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। যদিও সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা আগের মতো জোড়ালো নয়। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর প্রিয়ভাজন হিসেবে আমলাতন্ত্রের মধ্যে তিনি পরিচিত।

কবির বিন আনোয়ার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি সচিব হয়ে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন সাজ্জাদ হোসেন। এখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বলা হচ্ছে যে, আবুল কালাম আজাদের পরবর্তী আমলাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর যার ওপর সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস স্থাপন করেছেন এবং যার ওপর সবচেয়ে বেশি আস্থাশীল তাদের অন্যতম হলেন সাজ্জাদ হোসেন। সাজ্জাদ হোসেন এবং ফয়েজ আহম্মদ ৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা যারা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এবং আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের অনেকগুলো দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ চারদফায় প্রধানমন্ত্রী। কাজেই তিনি আমলাতন্ত্রের নারী নক্ষত্র সবই জানেন। দেখা যাচ্ছে যে, শুধুমাত্র প্রশাসনের উচ্চ কর্মকর্তা নয়, বরং একদম তরুণতম ব্যাচেরও ঠিকুজি জানেন প্রধানমন্ত্রী। কারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বাসী এবং কারা মেধাবী ইত্যাদির সব খবরই প্রধানমন্ত্রীর কাছে আছে। সেভাবেই আওয়ামী লীগ সভাপতি আমলাতন্ত্রের বিন্যাস করেন এবং তাদেরকে গড়ে তোলার জন্য চেষ্টা করেন। দেখা গেছে যে, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্রশাসনের কোন কর্মকর্তা কিরকম কতটুকু দক্ষ বা কি মনোভাবাপন্ন সেটা অন্য যে কারো চেয়ে ভালো জানেন। দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রীত্ব করার কারণে আমলাতন্ত্রের তৃনমূল পর্যন্ত নজরদারী আছে তার। যার কারণে দক্ষ আমলাদের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। এটা স্বীকার করেন আমলারাই। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমলাদের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং আমলাদের পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি অন্যদের যে কারো চেয়ে দক্ষ।