ভারতের সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে সবাইকে চমকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও মোদির বিজেপির গেরুয়া ঝড়ে প্রায় তছনছ মমতার দুর্গ। ২০১৪ সালে তৃণমূলের ঘাঁটি খ্যাত এ রাজ্যে বিজেপি মাত্র দুইটি আসন পেলেও এবার তারা মুখ্যমন্ত্রী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের দুর্গে জোর কামড় বসিয়েছে। বুথফেরত জরিপের অনুমান ছিল পশ্চিমবঙ্গে ১৩ থেকে ১৬টি আসন পেতে পারে বিজেপি। তবে গতকাল চূড়ান্ত ফলে দেখা গেছে, তৃণমূল ২২, বিজেপি ১৮ এবং কংগ্রেস দুটি আসন পেয়েছে। সংবাদসূত্র : এনডিটিভি, এবিপি

বৃহস্পতিবার সকালে ভোট গণনা শুরু হতেই ইঙ্গিত এসেছিল, পশ্চিমবঙ্গে মিলে যেতে পারে বুথফেরত জরিপের পূর্বাভাস। তারপর থেকে গণনা যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে বিজেপির বড় ধরনের উত্থানের ইঙ্গিত। তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির কড়া টক্করের ছবি একের পর এক উঠে এসেছে রাজ্যটির প্রায় সব প্রান্ত থেকেই।

পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা নির্বাচনে এবার সবার বিশেষ নজর ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কাকে বেছে নিচ্ছে, তার দিকে তাকিয়ে ছিল গোটা ভারত। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে এতটা উত্তাপ ছিল না। কিন্তু এবার এই রাজ্যের গুরুত্ব অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে আসন সংখ্যা বাড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করায় এই রাজ্যের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিজেপি তৃণমূলের যে দুর্গগুলোতে হানা দিতে সক্ষম হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম, আলিপুরদুয়ার, আসানসোল, বনগাঁ, বাঁকুড়া, ব্যারাকপুর, বর্ধমান-দুর্গাপুর, বিষ্ণুপুর, ঝাড়গ্রাম, জলপাইগুড়ি, রাণাঘাট, মালদহ দক্ষিণ, মালদহ উত্তর, পুরুলিয়া এবং মেদিনীপুর।

এবার তৃণমূল কংগ্রেসের ধরে রাখা আসনগুলো হলো, আরামবাগ, বালুরঘাট, বারাসাত, বর্ধমান, বসিরহাট, বীরভূম, বোলপুর, কোচবিহার, দার্জিলিং, ডায়মন্ড হারবার, দমদম, ঘাটাল, হুগলি, হাওড়া, যাদবপুর, জঙ্গিপুর, জয়নগর, কাঁথি, কলকাতা দক্ষিণ, কলকাতা উত্তর, কৃষ্ণনগর, মথুরাপুর, মুর্শিদাবাদ, রায়গঞ্জ, শ্রীরামপুর। আর কংগ্রেসের একমাত্র আসনটি হলো বহরমপুর।

‘বিজেপি হঠাও, দেশ বাঁচাও’- এ স্স্নোগানকে সামনে রেখেই এবার নির্বাচনী প্রচারে নেমেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মমতার টার্গেট ছিলেন একজনই, নরেন্দ্র মোদি। ‘এক্সপায়ারি প্রধানমন্ত্রী’ হোক কিংবা ‘ঝুটা প্রধানমন্ত্রী’, মোদিকে নিয়ে মমতার আক্রমণাত্মক এসব শব্দচয়নে সরগরম হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। অন্যদিকে, রাজ্যটিতে একের পর এক নির্বাচনী সভা থেকে চিটফান্ড কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে মমতাকে আক্রমণ করেছেন মোদি। মমতাকে ‘উন্নয়নের স্পিড ব্রেকার’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন তিনি।

এদিকে, শাসক দলের ভোটপ্রাপ্তির এই হার ২০০৯ সালের নির্বাচনের সঙ্গে বেশ মিলে গেছে। সেই নির্বাচনে বামপন্থীদের বিপর্যস্ত করে তৃণমূল ইঙ্গিত দিয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল আসছে। সেবার তৃণমূলের ভোটপ্রাপ্তির হার ছিল ৩১.১৮ শতাংশ। তবে সেবার রাজ্যের ২৮টি আসনে তৃণমূল লড়েছিল। বাকি ১৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল তৃণমূলের তৎকালীন জোটসঙ্গী কংগ্রেস এবং দলটি পেয়েছিল ১৩.৪৫ শতাংশ ভোট। আর পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন শাসক দল বামফ্রন্টের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৪৩.৩০ শতাংশ। অর্থাৎ, এবার তৃণমূল যে রকম ভোট পেয়েছে, তার কাছাকাছিই ছিল।

চূড়ান্ত ভোট গণনা শেষে দেখা যাচ্ছে, এই রাজ্যে সবচেয়ে সংকটে পড়েছে বামপন্থীরা। এ রাজ্যের দুই বিদায়ী বাম এমপি মোহাম্মদ সেলিম (রায়গঞ্জ) এবং বদরুদ্দোজা খান (মুর্শিদাবাদ) লড়াইয়ে থাকতে পারার ইঙ্গিত দিতে ব্যর্থ। যাদবপুরে যে বাম প্রার্থী লড়াই করতে পারেন বলে মনে করা হয়েছিল, সেই বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও তৃতীয় স্থানে রয়েছেন।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এ রাজ্যে ৩৪টি আসন পেয়েছিল মমতার তৃণমূল। এবার সর্বমোট ২০টি আসন হাতছাড়া হচ্ছে দলটির। অন্যদিকে গতবারের চেয়ে এবার বিজেপির আসন বেড়েছে ১৭টি। ভোটের ফল সামনে আসতে শুরু করার পর থেকেই যেটা অনেকের কপালে ভাঁজ ফেলতে শুরু করেছিল।

২০১৬ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি যেভাবে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে তাদের ভোট বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে, আর মোটামুটিভাবে দ্বিতীয় স্থানটা ধরে রাখতে পারছে, তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন ঘটনা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।