শাহ্‌দীন মালিক : দেশে চাঞ্চল্যকর যে কোনো খুনের পর আসামি গ্রেফতার ও বিচার প্রসঙ্গে ক’দিন খুব তোড়জোড় চলে। দিন কয়েকের মধ্যে দেখা যায় আমরা ভুলে যেতে থাকি খুনের ঘটনাটি, আরেক খুনের ঘটনা এসে পুরনো খুনের ঘটনাকে বিস্মৃতির অন্ধকারে নিয়ে যায়। অনেকেই বলেন, বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রতার কারণেই ঘটে এ ঘটনা। আদালতের শ্নথগতি, আমলাতন্ত্র একের পর এক খুনের মামলা ঝুলিয়ে দেয় কালের গহ্বরে।

আসলে তা নয়। আদালত চলে সাক্ষ্য ও তদন্তের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে। ঘটনা যখন ঘটে, তার পরপরই বেশ কয়েকজন সাক্ষী ঠিক করে মামলা দেওয়া হয়। এরপর আদালতে যখন সাক্ষ্যপ্রমাণ করবার পালা আসে, সাক্ষীরা অনুপস্থিত হয়ে যায়। তখন আদালতের কী করবার থাকে? যদি আসামি ধরাও পড়ে ইতিমধ্যে, উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে আদালত বিচারকার্য যথার্থভাবে করতে অপারগ হন।

এভাবে যে বিচার দীর্ঘায়িত হয় বা আদৌ বিচারই হয় না; তার দায় কোনোভাবেই আদালতের নয়। এই দায় প্রাথমিকভাবে পুলিশের যোগ্যতা, দক্ষতাহীনতার। অবশ্য পুলিশকেই বা পুরো দোষ দিই কী করে? দেশে আনুমানিক দুই লাখ পুলিশ আছে, এর শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ পুলিশ দেশের থানা, জেলা থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের প্রটোকল দেওয়ার জন্য নিযুক্ত হয়ে আছে! এখন বাকি পুলিশ কীভাবে টহল দেবে; আর কীভাবেই-বা তদন্তকাজ সম্পাদন করবে! ২০১৮ সালে, আমার জানামতে, প্রায় চার হাজারের কাছাকছি খুন হয়েছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে ৫০০টির বেশি খুনের মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। কীভাবে অগ্রগতি হবে? পুলিশ তদন্তকাজই শেষ করতে পারে না, তো মামলা এগোবে কী করে?

বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি। ২০১৮ সালে দেশে গড়ে খুন হয় আনুমানিক চার হাজারের কাছাকাছি। অন্যদিকে মেক্সিকোর কথা ভাবুন। ১৩ কোটি মানুষের দেশে গত বছর খুন হয়েছে ৩২ হাজারের কাছাকাছি। পার্থক্য এই, মেক্সিকোতে খুন করে পার পায় না লোকে, আর বাংলাদেশে পুলিশি তদন্তের অভাবে বেশিরভাগ খুনের মামলা থমকে যায়।

জবাবদিহিহীনতা সমাজে আঁকড়ে বসলেই এ ধরনের অভিঘাত সমাজে তৈরি হয়। বরগুনার সাম্প্রতিক রিফাত হত্যাই কেবল নয়, যে কোনো হত্যার বিচার নিয়ে প্রশ্ন ও দীর্ঘসূত্রতার একই কারণ। আমাদের মূলে হাত দিতে হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় নয়; এর জন্য যা যা করা প্রয়োজন- পুলিশ বিভাগে লোকবল ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে তদন্ত শুরু ও শেষ করবার সামর্থ্য ও সাহস যুক্ত করতে হবে। ফেসবুক ভিডিও দিয়ে বিচার করা যাবে না; এতে অচিরে ডক্টরিং শুরু হবে। এটা কোনোভাবেই আদালতে টিকবে না। কাজেই আবেগচালিত না হয়ে আমাদের যুক্তিগ্রাহ্য সমাধানে আসতে হবে। সমাজে অস্থিরতা আছে, থাকবে; সেটা দ্রুত সমাধানযোগ্যও নয়; তবে অপরাধের বিচার হলে অনেক অস্থিরতা কমে আসে, আসবে। শুধু রিফাত কেন, প্রতিটি হত্যার অনুপুঙ্খ বিচার অবশ্যই হওয়া জরুরি।

বরগুনার ঘটনার কথায় আসি। নয়ন যদি ধরাও পড়ে, যে পরিস্থিতি এখন পুলিশ বিভাগে; সে ছাড়া পেয়ে যাবে। এর আগেও এই দুর্বৃত্ত নয়ন বারকয়েক অপরাধ করে জেলহাজতে গেছে। কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়েও এসেছে। আদালত কোনোভাবেই ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে রেহাই দেয়নি; বা ভবিষ্যতেও ইচ্ছাকৃতভাবে ছাড়বে না। সে পদ্ধতির গলদে ছাড় পেয়েছে এবং ভবিষ্যতেও পাবে। এ ধরনের মামলা হলো ফৌজদারি মামলা। রাষ্ট্র বনাম অভিযুক্ত ব্যক্তির এই মামলায় পুলিশের দায়িত্ব থাকবে সাক্ষী কে হবেন, তা ঠিক করা এবং আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা। দেখা যাবে, উপযুক্ত তদন্তকারী পুলিশের অভাবে দুই বছর কেটে যাচ্ছে, পুলিশ মামলার সাক্ষী ও প্রমাণাদি আদালতে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মাসের পর মাস অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালত জামিন না দিয়ে জেলহাজতে আটকে রাখতে পারেন না। অভিযুক্ত খুনি তখন জামিনে বেরিয়ে আসে। মামলাও এরপর ঝুলে যায়।

তাহলে এই সমস্যার সমাধান কী? খুনের বিচার কি হবে না এদেশে? এ জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ রয়েছে- সেটি পুলিশ বিভাগ। প্রটোকল বা অন্যান্য কাজে সিংহভাগ পুলিশ ব্যবহার করে কীভাবে খুনের তদন্ত পুলিশের দ্বারা সম্ভব হবে? এই নূ্যনতম প্রশ্নের উত্তর জানবার মতো সৎসাহস দায়িত্বরতরা দেখাতে পারলেই দেশে প্রতিটি খুনের বিচার সম্ভব।