এই আমার দেশ ডেক্স :একটি নেটে ব্যাট করছিলেন কেদার যাদব। আরেকটিতে দিনেশ কার্তিক। একাদশে জায়গা নিশ্চিত নয় দুজনের কারও। তবু নেটের পাশে সংবাদকর্মীদের ভিড়ে জায়গা পাওয়াই দায়। ক্রমাগত চলছে ক্যামেরার শাটার, জ্বলছে ফ্ল্যাশ। আরেকটি নেটে যে ছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি! সবার চোখ কিংবা ক্যামেরার চোখ, তাক করা তার দিকেই। টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ সেমি-ফাইনালের আগে সবার আগ্রহের কেন্দ্রে যেন এই ভারতীয় কিংবদন্তি।

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি, তবে নিশ্চিতভাবেই এটি তার শেষ বিশ্বকাপ। সেমি-ফাইনালে নিউ জিল্যান্ডের কাছে ভারত হেরে গেলে? কে জানে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩৮ বছর বয়সী ধোনির শেষ দিনটি হতে পারে মঙ্গলবারই।

লোকের আগ্রহের কেন্দ্রে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শুরুর সময় থেকেই। তখন থেকেই বলা হচ্ছিল, হয়তো ভারতীয় ক্রিকেটের পরবর্তী বিস্ময়। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে, বাংলাদেশে অভিষেক সিরিজে চেনাতে পারেননি নিজেকে। আলোচনা হয়েছে তার ব্যর্থতা নিয়ে। পরের সিরিজেই, ক্যারিয়ারের পঞ্চম ওয়ানডেতে চিরপ্রতিন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথমবার তিনে ব্যাট করার সুযোগ পেয়ে খেললেন ১২৫ বলে ১৪৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। সমালোচনা রূপ নিল বিস্ময়ে।

দ্রুতই তিন সংস্করণে ভারতীয় দলের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠা, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বয়স তিন বছর হওয়ার আগেই নেতৃত্ব পাওয়া, অধিনায়কত্বের প্রথম অভিযানেই ভারতকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দেওয়া, তার নেতৃত্বেই প্রথমবার টেস্ট র‌্যাঙ্কিংয়ে ভারতের শীর্ষে ওঠা, ২০১১ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়, ফাইনালের ম্যাচ সেরা, আইপিএলের সফল অধিনায়ক, ক্রমে ধোনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় ক্রিকেটের রূপকথার নায়ক।

জনপ্রিয়তার চূড়ায় ছিলেন, লোকের কৌতূহলের শেষ ছিল না। তার ক্রিকেট, তার ব্যক্তিজীবন, ফুলে-ফেঁপে ওঠা ব্যাংক ব্যালান্স, আয়ে এমনকি শচিন টেন্ডুলকারকেও ছাড়িয়ে যাওয়া, তার খাওয়া-দাওয়া, তার ছুটি কাটানো, লোকে জানতে চেয়েছে তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিস্তারিত।

রূপকথাময় জীবন শেষ হয়েছে বাস্তবতার ছোবলে। তাকে নিয়ে আলোচনায় গত কয়েক বছর থেকে যোগ হয়েছে সংশয়, এখনকার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন। কখনও তিনি জবাব দিতে পেরেছেন প্রশ্নগুলোর, কখনও প্রশ্নগুলোকে আরও উচ্চকিত করেছে তার বিবর্ণ পারফরম্যান্স।

এই বিশ্বকাপেও তাকে নিয়ে আলোচনার বেশিরভাগই ছিল নেতিবাচক। তার স্ট্রাইক রেট, ব্যাটিংয়ে তার অভিপ্রায়, এসব নিয়ে প্রশ্ন। বিশেষ করে যখন রিশাভ পান্তের মতো তরুণ কিপার ও বিস্ফোরক ব্যাটসম্যান উঠে আসছেন, এই দলের লোকেশ রাহুলও কিপিং করেন। বাইরে অপেক্ষায় সম্ভাবনাময় আরও বেশ কজন।

নামের পাশে প্রশ্নের ছাপ লেগে থাকার এই পুরো সময় ধোনিকে দারুণভাবে আগলে রেখেছেন বিরাট কোহলি। ধোনির নেতৃত্বেই কোহলির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু। ধোনির নেতৃত্বেই সম্ভাবনাময় তরুণ থেকে তার বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে চলা। তবে সেই কৃতজ্ঞতাবোধই একমাত্র কারণ নয়। অধিনায়ক কোহলির যে ধোনিকে লাগতই!

ব্যাট হাতে আগের সেই ম্যাচ জেতানো বিধ্বংসী চেহারা না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন মাঝেমধ্যেই। তবে ব্যাটিংয়ের চেয়ে বেশি জরুরি মাঠে ধোনির উপস্থিতি। মাঠে পরিকল্পনা, বোলিং পরিবর্তন, ফিল্ডিং সাজানো, তাৎক্ষনিক কোনো সিদ্ধান্ত, চাপের মুহূর্তগুলোয় মাথা ঠাণ্ডা রেখে এগোনো, কোহলির নেতৃত্বের পুরো সময়টাতেই ধোনিকে এসবে দেখা গেছে দারুণ সক্রিয়। ধোনির কোনো বোলিং পরিবর্তন, কোনো ফিল্ডিং সাজানো দলকে উইকেট এনে দিয়েছে, গত কয়েক বছরে এটি দেখা গেছে অসংখ্যবার। তাই অধিনায়ক কোহলি হলেও ছায়া অধিনায়ক অনেকে মনে করেন ধোনিকেই।

রোববার জীবনের ইনিংসে ৩৮ পূর্ণ করলেন ধোনি। তার সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে আবেগঘন টুইটে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কোহলি। সেমি-ফাইনালের আগের দিন ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে সংবাদ সম্মেলনেও ভারত অধিনায়ককে কথা বলতে হলো ধোনিকে নিয়ে।
এবার অবশ্য ধোনির ব্যাটিং নিয়ে বিতর্কের কোনো প্রশ্ন নয়, জানতে চাওয়া হলো তার ব্যক্তিত্ব ও দলে প্রভাব নিয়ে। থামস আপ দেখিয়ে, চওড়া হাসিতে উত্তর দিলেন কোহলি।

আমি খুশি যে আপনি ধোনির ব্যক্তিত্ব নিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, গত কিছুদিনে অন্য কিছু নিয়েই অনেক কথা হয়েছে। একজন কেউ যখন দলের জন্য এতটা করে, ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য এত কিছু করেছে এবং গোটা বিশ্বে ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে, তাকে মূল্যায়ন করতেই হবে। সেদিক থেকে আমরা তার প্রতি দারুণ কৃতজ্ঞ।”

আগের দুটি সেমি-ফাইনাল ধোনির জন্য ছিল দুইরকম অভিজ্ঞতা। ২০১১ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে ভারত। গত বিশ্বকাপে বিদায় নেয় অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে। আগের দুইবারই ছিলেন অধিনায়ক। এবার ‘সাধারণ’ সদস্য। তবে এই সাধারণ ধোনিই যে কত অসাধারণ, সেটি ফুটে উঠল কোহলির কথায়। নেতৃত্ব ছাড়ার পরের ধোনির জন্য এখনকার অধিনায়কের কেবল প্রশংসাই আছে।

“শ্রদ্ধার দিক থেকে, ধোনির জন্য সেটি সবসময়ই থাকবে আকাশ সমান। বিশেষ করে আমার চোখে। কারণ আমি জানি, অধিনায়কত্বের পর পরিবর্তনের পথটা কতটা কঠিন। এত বছর নেতৃত্ব দেওয়ার পর একই দলে শুধু খেলোয়াড় হিসেবে খেলে যাওয়া, নিজেকে জাহির করতে না চাওয়া ও কিছু চাপিয়ে দিতে না চাওয়া অনেক বড় ব্যাপার।

পাশাপাশি তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সবসময়ই পরামর্শ দিচ্ছেন। কখনোই পিছপা হননি। সব মিলিয়ে তিনি অসাধারণ। আমি উচ্ছ্বসিত যে এত বছর তার পাশে খেলতে পেরেছি।

পাশাপাশি সময়টা হয়তো ফুরিয়ে আসছে দ্রুত। টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন অনেকটা হুট করে, ২০১৪-১৫ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়া সফরের মাঝপথে। চমকে গিয়েছিলেন এমনকি সতীর্থরাও। এখন ৩৮ পূর্ণ করেছেন, বিশ্বকাপের পর খেলে গেলে সেটিই হবে বিস্ময়ের।

ধোনির সঙ্গে খেলার, ধোনির খেলা দেখার, উপভোগের আর কেবল হয়তো একটি কিংবা দুটি ম্যাচ। কিংবদন্তির শেষ বেলা কি রাঙাতে পারবে তার দল?