আহমদ রফিক : সংবাদপত্র, সংক্ষেপে ‘দৈনিক’ বলে যা বুঝি, বিশ্বের সঙ্গে হাজার চোখে আমাদের সাংস্কৃতিক মিলন ঘটায়। স্থানিক-অস্থানিক, জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিচিত্র সংবাদ-সম্ভার আমাদের মনন সমৃদ্ধ করে, জানার কৌতূহল মেটায়। এরই মধ্যে এক ফাঁকে সাপ্তাহিক অবসরে সাহিত্যপ্রেমী পাঠকের সাংস্কৃতিক তৃষ্ণাও মেটায়, পরিচয় ঘটায় দেশ বিদেশের সাহিত্যের সঙ্গে, অবশ্য অতি সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে। মননশীল পাঠকের বিশেষ আকর্ষণ এদিকে—অনেক সময় এ হিসাবে কোনো কোনো সংবাদপত্র পাঠকবিশেষের প্রিয় বিবেচিত হয়ে ওঠে।

সংবাদপত্রের এই বিশেষ অংশটুকুকে আমরা চিনি সাধারণভাবে ‘সাহিত্য-সাময়িকী’ নামে। বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গে মূলত পঞ্চাশের দশকে মাত্র দু’-তিনটে পত্রিকায় সাহিত্য-সাময়িকীর প্রকাশ দেখা যেত পাতা দুয়েকের ‘সাপ্লিমেন্ট’ হিসেবে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এদিক থেকে প্রথম পর্বে ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’ পরে ‘ দৈনিক পাকিস্তান’ এবং ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকার সঙ্গে।

পূর্ববঙ্গের সাহিত্যচর্চা বিভাগোত্তর কালে তার কৈশোর-তারুণ্য পার করছে, মূলত কবিতায় ও ছোটগল্পে, অংশত প্রবন্ধে-উপন্যাসে। স্বভাবতই অবজার্ভারের সাহিত্য-সাময়িকীটি সমৃদ্ধ ছিল অনেকাংশে বিদেশি সাহিত্যের মূল্যায়নে। ফলে তরুণ সংবাদপত্র পাঠকের সুযোগ ঘটত বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হবার, বিশেষ করে প্রবন্ধ পাঠে, কবিতা পাঠে কিংবা সমালোচনার ধারালো ভাষ্যে।

সত্যি বলতে কি আমি নিজেও সমৃদ্ধ হয়েছি বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে নানামাত্রিকতায়—যেমন মূল রচনা পাঠে, তেমনি সমালোচনার ধারালো মূল্যায়নে। দু’-একটি উদাহরণ এখনো স্মৃতিতে উজ্জ্বল। যেমন কবিতা সম্পর্কে আর্থার কোয়েমলারের তীক্ষ্ণ শল্যচেরা ভাষ্য। কবিতার দুই ধারার আলোচনা শেষে তার মতে সৃষ্টির প্রক্রিয়া হলো ‘Tight rope walk on the line of intersection of the tragic and trivial planes of existance.’ সাহিত্যে প্রচারধর্মিতা বা শিল্পসর্বস্বতা এ দুই বিতর্কিত মেরু এড়াতে কোয়েমলারের এই ব্যবস্থাপত্র।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। স্তালিনোত্তর যুগে ক্রুশ্চেভের স্তালিনবিরোধী বোমা-ফাটানো বক্তৃতা বিশ্বজুড়ে যে আলোড়ন ও হতাশা সৃষ্টি করেছিল, তারই প্রকাশ বিখ্যাত মার্কিন ঔপন্যাসিক হাওয়ার্ড ফাস্টের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায়। তার দীর্ঘ রচনাটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল অবজার্ভার-এ। তাও ছিল যেমন আত্মসমালোচনা তেমনি আদর্শিক বিস্ফোরণ। সেসব পড়ে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সে স্মৃতি এখনো সজীব। হেমিংওয়ে থেকে নেরুদা প্রমুখ অনেকের সঙ্গে পরিচয় অবজার্ভার সাহিত্য-সাময়িকীর কল্যাণে।

দুই

একই সময়ে নয়, কিছুটা পরে দৈনিক বাংলার সাহিত্য পাতায় রাজনীতি ও সাহিত্যের স্থানিক রচনাদি নান্দনিক তীক্ষ্ণতা নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তেমনি উঠেছে বিদেশি সাহিত্যের কিছু প্রকাশ—বিশেষভাবে লাতিন আমেরিকান ও স্পেনীয় সাহিত্যের একাধিক নমুনা। আর পরবর্তী সময়ে সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে খ্যাতিমান আবুল হাসনাত দৈনিক ‘সংবাদ’কে পাঠকপ্রিয় করে তোলেন তার সুযোগ্য সম্পাদনায়। যেমন প্রতিষ্ঠিতদের লেখা, তেমনি সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে পেতে তাদের লেখা ছেপে ভিন্ন এক সাময়িকীর অধ্যায় সৃষ্টি করেন হাসনাত। তার সম্পাদনা-প্রতিভা এখন সক্রিয় কালি ও কলম সাহিত্য পত্রিকায়।

পাকিস্তানি আমলে দৈনিক পত্রিকায় সাহিত্য পাতায় যে নতুনত্ব ও অভিনবত্ব সৃষ্টি যা পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত ধারণ করেছিল আমার অভিজ্ঞতায় বিশেষভাবে চারটে পত্রিকা—পাকিস্তান অবজার্ভার, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক ইত্তেফাক। খাজা পরিবারের মালিকানাধীন পত্রিকা মর্ণিং নিউজ রাষ্ট্রভাষা বাংলা-বিরোধী ও প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের কারণে পাঠ তালিকায় না থাকায় তার সাহিত্য পাতার গুণমান আমার অভিজ্ঞতার বাইরে। এমনটাই ছিল প্রাক-স্বাধীনতাপর্বে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য-সাময়িকীর চিত্র চরিত্র সংক্ষিপ্ত কথায়। এ পর্বটিকে আমার বিবেচনায় সেকাল বলা যেতে পারে। ইত্তেফাক-এর জনপ্রিয়তা ছিল তীক্ষ্ণ সংবাদ ভাষ্যের কারণে।

তিন

স্বাধীন বাংলাদেশে সংবাদপত্র ভুবনে সমারোহ সৃষ্টি হয়ে ছিল তার মধ্যে গুণমানে বিশিষ্টের সংখ্যাও কম নয়। তাদের সাহিত্য পাতাও ছিল মনোদিক বিচারে আকর্ষণীয়। এর একটি বড় কারণ বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে তরুণ ও যুবা লেখক কবিদের সংখ্যা গণনার অধিক। ভাষা আন্দোলনে যার সূচনা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কবি ও কবিতার বিস্ফোরক প্রকাশ। সেই ধারাবাহিকতায় আবির্ভাব প্রতিভাবান সাংবাদিক-সম্পাদকদের। হিসাবে বাদ পড়ে না সাহিত্য পাতার সম্পাদকগণ।

তারা প্রধানত কবি অথবা গদ্যসাহিত্যের লেখক, সাংবাদিকতার সূত্রে সাহিত্য-সাময়িকী কর্ণধার। পত্রিকার সংখ্যা এত বেশি যে পাঠকচিত্ত জয়ে প্রতিযোগিতার দিকটি কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। কে কত নতুনত্ব, অভিনবত্ব উপহার দিতে পারবেন তার ওপর নির্ভর করবে সাহিত্য ক্ষেত্রে ওই পত্রিকার পাঠকপ্রিয়তা। আর মানমর্যাদা।

পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত ও খ্যাতিমান দৈনিকগুলোকে তাদের নিজস্ব গৌরবে একপাশে সরিয়ে রেখে চোখে পড়ে অনেক ক’টি উল্লেখযোগ্য দৈনিক পত্রিকা যেগুলো একই সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহ, পরিবেশন ও বিশ্লেষণে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি তাদের সাহিত্য-সাময়িকী নিজগুণে পাঠকপ্রিয়। পুরনোদের এমন দৈনিকও আছে যা শুধু সাহিত্য-সাময়িকীর গুণে উল্লেখযোগ্যের তালিকায় পড়ে। যেমন দৈনিক সংবাদ। অনেকে একদা যেমন পত্রিকাটি কিনতেন এর সাহিত্য পাতার গুণে, তেমনি একালেও স্বল্প প্রচার পত্রিকাটি পূর্বোক্ত গুণে চিহ্নিত।

একালের বলতে উল্লেখযোগ্য দৈনিকগুলো সাহিত্য-সাময়িকীর গুণেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল সেগুলোর বিশিষ্ট ধারাবাহিকতার বিচারে আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, প্রথম আলো, আলাদাভাবে নাম উল্লেখ করতে গেলে বরাদ্দ পাতা তাতেই শেষ হয়ে যাবে।

সাহিত্য-সাময়িকী (আমার ভাষায় ‘সাহিত্য পাতা’) নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে যে বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সেকাল থেকে একালে এসে সাহিত্য-সাময়িকীর গভীর চরিত্র বদল ঘটে গেছে, অনেকটা বিপ্লবাত্মক গুণগার্বমায়। সেকালের সাহিত্য পাতা বা সাপ্লিমেন্ট এখন আপন গুণে ভাস্বর। সাহিত্য সম্পাদকদের সর্বাধিক নজর এখন সাহিত্য-সাময়িকীর দিকে। তাই সেখানে নতুনত্ব, অভিনত্ব প্রকাশের চেষ্টা, একে অপরকে অতিক্রম করার উদ্দেশ্যে।

যেমন চেহারায় সুদর্শন হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা তেমনি পরিবেশিত রচনায় বিদেশি আবহ সৃষ্টির প্রয়াস, অনেকের নজর লাতিন আমেরিকার সৃষ্টিকর্মের দিকে। নেরুদা, মার্কেজকে পুনরাধিকারের প্রয়াস। মনে আছে অনেক আগে একসময় ‘যায়যায় দিন’-এ রাজু আলাউদ্দিন লাতিন আমেরিকান সাহিত্য নিয়ে আলোচনায় পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালায়। পরে নিজেই সেখানে পাড়ি জমায়, ফিরে আসে সপরিবারে বিদেশিনীকে নিয়ে। বিদেশি ভাষাটাও বেশ রপ্ত করে ফেলেছে।

কোনো কোনো দৈনিক স্বতন্ত্রভাবে সাহিত্য-সাময়িকী নতুন নামে ভিন্ন মোড়কে বিচিত্র রচনায় সমৃদ্ধ করে আপন বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটিয়েছে। এগুলোতে বেশ উচ্চমান রচনা যেমন বিদেশি সাহিত্যিক তেমনি স্বদেশী সাহিত্যিকদের নিয়ে। নামেও চমক—‘শিলালিপি’ (কালের কণ্ঠ), ‘কালের খেয়া’ (সমকাল)। মাহবুব আজিজ এদিক থেকে বেশ করিতকর্মা। দিনকয় আগে শিলালিপিতে ভালো একটা লেখা পড়লাম—‘যেভাবে তৈরি হলেন মার্কেস’।’

এই যে সাহিত্য-সাময়িকীর নতুন ফর্ম—‘শিলালিপি’, ‘কালের খেয়া’ ইত্যাদি সাহিত্য ও সাহিত্যিক বিশেষকে নিয়ে অ্যালবাম জাতীয় পরিচিতিপত্র উপহার দেবার ধারা চালু করেছে—এটা পাঠক ও সাহিত্যিক উভয়ের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে—জনপ্রিয়তা বেড়েছে সাহিত্য-সাময়িকীর। তাই এতে দেখায় বিদেশি সাহিত্যিকের জলছবি, তেমনি স্থানীয় স্বনামখ্যাতদের তৈলচিত্র। বেশ জমজমাট উপহার—কূট সমালোচক বলবেন—সাহিত্যবাণিজ্য।

হাতের কাছে বেশ কয়েকটা অ্যালবাম—তাদে কেখা যাচ্ছে সর্বাধিক পাঠকপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদকে সরস সংলাপে। আর একটিতে সৈয়দ শামসুল হক দুইদিকে ডানা মেলে শোভা পাচ্ছেন। কখনো দেখা যায় নির্মলেন্দু গুণকে কিংবা শামসুর রাহমান বা আল মাহমুদকে। বাদ যান না তরুণ মেধাবী কবি-কথা সাহিত্যিক।

লেখাটা শেষ করা যায় কিছু আস্তবাক্যের উচ্চারণে—বহুকথিত যদিও, তবু বাস্তবতা বিচারে সত্য। ভালো সাহিত্যের বা সাহিত্য-সাময়িকী যেমন ভালো লেখক সৃষ্টিতে বিশেষ ভ‚মিকা রাখে, তেমনি মননশীল মেধাবী কবি সাহিত্যিকের আলোয় আলোকিত ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে সাহিত্যপত্র—তাদের সংখ্যা বিস্তারও ঘটে। সাহিত্য-সাময়িকীর অবস্থান একই কাতারে। এখানটিতে তার গৌরবের ভূমিকা।

এখন অনলাইনের যুগ। আমার প্রত্যাশা সাহিত্য-সাময়িকীর সাথে পাল্লা দিয়ে অনলাইনের সাহিত্যও আকর্ষণীয় নতুন নতুন ধারার সূচনা ঘটাক।