ফারহানা পারভীন : ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সায়মা নাসরিন কিছুটা ক্ষোভ নিয়েই বলছিলেন সম্প্রতি তার এক অভিজ্ঞতার কথা। ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তার একজন আত্মীয়।

জরুরী ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন ছিল তার ঐ রোগীর। কিন্তু যিনি রক্ত দিবেন তাকে জোগার করা গেলেও সময়মত পৌঁছাতে পারেননি তিনি।

কারণ কি? সায়মা বলছিলেন ঐ সময়ে ঐ রাস্তা দিয়ে কোন একজন ভিআইপি যাওয়ার কথা থাকায় রাস্তা বন্ধ রাখা হয়।

তিনি বলছিলেন, “ঢাকার সরকারি হাসপাতালে যদি কোন ভিআইপি যায় তাহলে তার প্রটোকল এত জোরদার করা হয় যে অন্য রোগীরা ঢুকতে পারেন না। এমনকি মরণাপন্ন রোগিরাও এম্বুলেন্সে থাকতে হয়। আমার রোগীর রক্তদাতা পৌঁছাতে পারিনি। মারাত্মক অবস্থা তৈরি হয় পরে আমরা অন্যভাবে ম্যানেজ করি।”

ঢাকার আরেকজন শিক্ষার্থী সুলতানা রহমান থাকেন ঢাকার মিরপুরে। তিনি বলছিলেন, ভিআইপি চলাচলের সময় রাস্তা বন্ধ থাকায় তাকে পরীক্ষার হলে এক ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছান। তিনি বলছিলেন, সেই ক্ষতি তিনি শিক্ষাজীবনের আর কখনোই পুষিয়ে নিতে পারেন নি।

সেটা আরো বাড়ে যখন কোন ভিআইপি রাস্তায় চলাচল করেন

তিনি বলছিলেন “দশটার পরীক্ষার জন্য সকাল সাতটায় বের হয়েছিলাম। কিন্তু কোন একজন ভিআইপি জন্য আমিসহ অনেকেই সেদিন একঘণ্টা পরে পরীক্ষার হলে যায়। যে ক্ষতি আজও মেটাতে পারিনি। একটা বিশেষ পদের জন্য তারা বিশেষ সুবিধা পান এটা ঠিক। আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে একটা সুবিধা নিয়ে অন্য দশজনের অসুবিধার কারণ হতে পারি না। সেখানে রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে তারা কিভাবে পারেন?”

বাংলাদেশে ভিভিআইপি যেমন প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট এবং বিদেশি রাষ্ট্রীয় অতিথি, ভিআইপির মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রী,এমপি এবং সেই পদমর্যাদার অসংখ্য ব্যক্তি।

এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে রপ্তানি এবং ব্যবসায়ে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য সিআইপি হিসেবে মনোনয়ন পান প্রতিবছর।

বাংলাদেশে প্রশাসনিকভাবে কতজন এই ভিআইপির সুবিধা পান তার সঠিক হিসেব দিতে পারেন নি কর্তৃপক্ষ। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ২০০৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত এই ১০ বছরে ১২৩৮ জনকে সিআইপি মনোনয়ন দেয়া হয়েছে।

আর এই ভিআইপি এবং সিআইপির সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। কি ধরণের সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন তারা?

প্রশাসনের পক্ষে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ বলছিলেন, ভিআইপিরা গাড়ী, বাড়ী/ ফ্ল্যাট এবং পুলিশি সুরক্ষা পেয়ে থাকেন। এছাড়া সড়ক, নৌ এবং বিমান পথে যাতায়াতের জন্য বিশেষ সুবিধা পেয়ে থাকেন।

সাবরিনা সুলতানা মনে করেন করদাতাদের অর্থে ভিআইপিরা সুযোগ ভোগ করেন যেটা জনগণের কোন সুবিধা দেয় না

কিন্তু এই ভিআইপিদের বিশেষ সুবিধা যেটা ভিআইপি কালচার বা সংস্কৃতি নামে লোক মুখে পরিচিত সেটার কারণে চরম দুর্ভোগে পরেন সাধারণ মানুষ।

সমস্যগুলোর মধ্যে প্রতিদিন যেটার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয় সেটা হল ঢাকার রাস্তায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশে ভিআইপি কালচার বহু পুরনো। তবে সেই সংস্কৃতি এখন পুনমূল্যায়ন করার সময় এসেছে কিনা সেটাই নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছিলেন, জনদুর্ভোগের সাথে সাথে ভিআইপিরা যেসব সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকেন সেগুলোর অপব্যবহার করার সুনির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত রয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছিলেন “এমপিরা গাড়ী আমদানির সুযোগ পেয়ে থাকেন বিদেশ থেকে। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী দেখা যায় এটার ব্যাপক অপব্যবহার হয়। শুল্ক-বিহীন আমদানির ফলে পাওয়া গাড়ি কিভাবে ব্যবহার হচ্ছে কোন অন্তত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ক্ষতিয়ে দেখা হয়নি। যে বাড়ি পেয়ে থাকেন সেখানে তারা থাকছেন না। এখানে আইনের লঙ্ঘন হচ্ছে এবং নিয়মের ব্যত্যয় হচ্ছে”।

তিনি মনে করেন, বিমানবন্দরে ভিআইপিরা তাদের জন্য নিরাপত্তা চেকিং না যে রাখারা প্রস্তাব করেছিলেন সেটাও নিয়মের বাইরে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে ঢাকার কোন কোন বাসিন্দা মনে করেন ভিআইপিদের এই সুযোগ সুবিধাগুলো কমিয়ে দেয়া উচিত যাতে করে তাদের দৈনন্দিন জীবনের দুর্ভোগ কিছুটা কমে।

একজন নারী বলছিলেন “ওনারা আমাদের প্রতিনিধি, আমরা ট্যাক্স পে করছি, এনারা এটা থেকেই সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। কিন্তু আমরা ট্যাক্স পে করছি যাতে করে আমরা কিছু সুযোগ-সুবিধা পাই নাগরিক হিসেবে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। আমি মনে করি এব্যাপারে অবশ্যই তাদের সুযোগ সুবিধা যেগুলো পাচ্ছে সেগুলোর ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয় উচিত।”

সাবরিনা সুলতানা মনে করেন করদাতাদের অর্থে ভিআইপিরা সুযোগ ভোগ করেন যেটা জনগণের কোন সুবিধা দেয় না

আরেকজন পথচারী বলছিলেন “মন্ত্রী হওয়ার আগে তারাও সাধারণ মানুষ ছিল। জ্যামের সাথে সবাই পরিচিত আমরা। তাই মন্ত্রী এমপি হওয়ার পর তারা দুর্ভোগ পোহাবে না এটা মানতে পারি না। আমরা সাধারণ জনগণ যদি তাদের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে থাকি তাদের সেই বিষয়টা বিবেচনা করা উচিত। তাদের উচিত সাধারণ মানুষের মত জ্যাম ঠেলেই রাস্তায় যাতায়াত করা।”

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম থেকে বলা হচ্ছে, শুধুমাত্র ভিভিআইপিদের রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাস্তার একপাশ ফাঁকা করে দেয়ার নিয়ম আছে।

তাসনিয়া ইনাম মনে করেন ভিআইপিদের সাধারণ মানুষদের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করা উচিত v

আর কোন ভিআইপির জন্য রাস্তা ফাঁকা করে দেয়ার নিয়ম নেই। তবে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার নজির আছে বাংলাদেশে।

দেশব্যাপী ব্যাপক সংখ্যায় যে প্রশাসনিক ভিআইপিরা রয়েছেন তাদের প্রোটকলের বিষয়টি দেখেন মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের সাথে আমি কথা বলেছিলাম মানুষের এই দুর্ভোগের বিষয় নিয়ে।

তিনি বলছিলেন, “মন্ত্রীরা কোন আলাদা সুবিধা নেন না। তারা একটা প্রটেকশন গাড়ী, এবং গানম্যান নেন। তাদের রাস্তা বন্ধ করার নিয়ম নে। এটা শুধু ভিভিআইপিদের জন্য আছে সেটা এসএসএফ আইন।”

প্রশ্ন: অনেক সময় দেখা গেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী গাড়ী উল্টা দিক দিয়ে যাচ্ছে..

উত্তর: এটা গত ছয়মাসে আপনি কি দেখেছেন? দেখেননি। এমনি কোন নিয়ম নেই।

প্রশ্ন: সুবিধা অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে সেই ব্যাপারে কি বলবেন?

উত্তর: এখানে বাড়ি বা গাড়ী অপব্যবহার করার কোন সুযোগ নেই

এর বাইরে বাংলাদেশে অনেকেই নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য গানম্যান রাখেন।

সেই ক্ষেত্রে তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে জানাতে হয়। উল্লেখিত ব্যক্তির রিস্ক বা জীবনের হুমকি বিবেচনা করে অনুমোদন দেয়া হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছিলেন, বাংলাদেশে এখন সময় এসেছে ভিআইপি কালচার পুনমূল্যায়নের।

তিনি বলছিলেন, “দুটি কারণে এটা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। একটা হল অপব্যবহার হচ্ছে, অন্যটা হল জনগণের দুর্ভোগ হচ্ছে। এবং বোঝাটা জনগণকেই বইতে হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটাকে জনগণের মতামত নিতে হবে কারণ ব্যয়ের বোঝাটা তাদের বইতে হয়। এটা হলে বোঝা যাবে কতটা সুযোগ-সুবিধা দেয়ার আদৌ দরকার আছে।”

গতবছর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার জরুরি সেবা এবং ভিআইপিদের গাড়ি চলাচলের সুবিধার জন্য সড়কে আলাদা লেন তৈরি করার প্রস্তাব দিয়েছিল মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ।

কিন্তু যেখানে ঢাকার তীব্র যানজটে নগর জীবন যখন থমকে যাচ্ছে, সে সময় ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন করার প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এবং এর বাস্তবায়নের আর কোন পদক্ষেপ দেখা যায়নি।