ডেস্ক রিপোর্ট: আমার কর্মব্যস্ততা নিছক ব্যস্ততা। আসলে এর কোন মানে হয় না। মানে হয় না বলতে, এটি কোন ফল আনায়ন করে না। জীবনে চলতে হয়, তাই চলি। চাকরি করি আবার ছাড়ি। যখন ছাড়ি; তখন বেকার থাকি। চাকরি খুঁজি, আবার পেয়ে ছাড়ি। কেন জানি, জীবন-জীবিকা আমাকে আকর্ষণ করে না। কিছুদিন যাবৎ আমি বেকার আছি। হয়তো বা প্রাইভেট কোন কোম্পানিতে আবারও জব পেয়ে যাব। ততদিন বেকারের তকমা গায়ে লেগে আছে।

রাতের গভীরতা আমার ক্লান্তির ছাপকে লুকিয়ে ফেলে। আবার সকাল হলে প্রতিদিনের মতো কর্মব্যস্ত ছুটে চলা। আজ ঘুম ভাঙলো একটু দেরীতে। অ্যালার্ম আমার কানে পৌঁছলো না। কী করেই বা পৌঁছবে! ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। মৃদু বাতাস আর বৃষ্টির শব্দ এক নতুন আবেশে ঘুমরাজ্যে আমাকে নিয়ে গেছে। সেখানে পরীদের দেখা মেলেনি। তবে সে রাজ্য প্রশান্তি এনেছে। এমন কথা নিশ্চয়ই আমার বন্ধু মামুন বিশ্বাস করবে না। কারণ গতরাতে বাসায় ফেরার আগে মামুনের বাসায় আমি, জুয়েল, মমিন ও আসিফ মিলে যে আসর জমালাম, তাতে বাংলা মদের সাথে হুইস্কির ডামাডোলও ছিল। ফলে এ ঘুম হয়তো তারই ফল।

সে যা-ই হোক, বেকারত্বের দ্বায় ঘোচাতে আজ এমন বাদল দিনে আমি বাইরে বের না হলে রাষ্ট্রের তেমন কোন ক্ষতি হবে না। সুতরাং সিদ্ধান্ত স্থির করলাম, আজকের দিনটি আমার প্রিয় শিল্পী সুবীর নন্দীর গাওয়া গান শুনে কাটাবো। প্রেম-ভালোবাসা, দেশের গান বা চলচ্চিত্র সব জায়গায় এ গুণি শিল্পীর পদচারণা রয়েছে। তার কণ্ঠ যে কাউকে বিমোহিত করবে।

আসলে গান শুনতে আমি ছোটবেলা থেকেই দারুণ পছন্দ করি। আমি নিজে শিল্পী হওয়ার চেষ্টা করেছি বারবার। তবে বেসুরো গলায় আমার গাওয়া গান শুনে পাড়া-পড়শি থেকে শুরু করে বন্ধুমহলে ব্যাপক নিন্দিত হয়েছি। ফলে বাবার পরামর্শে সে আশা ছেড়েছি বহু আগে। আমি শিল্পী হতে পারিনি। তবে শিল্পের প্রতি মমত্ববোধ আমার রয়েছে।

এবার যে গানটি প্লে লিস্টে, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমার জনপ্রিয় গান ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’। গানটির জন্য সুবীর নন্দী জাতীয় পুরস্কারও পান। গানটি আমার দারুণ ভালো লাগে। তবে বাদল দিনে রোমান্টিক আবহে সোনার কন্যা আমার মনে নাড়া দিয়ে যায়।

হুম, একদম তাই। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। আজ থেকে প্রায় দশ-এগারো বছর আগে। কলা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে আলাপচারিতায় ব্যস্ত। হুট করে আমার চোখে আলোর ঝলকানি। সূর্যের আলোর সাথে স্বর্ণের স্পর্শে যে আলোর বিচ্ছুরণ, তা চোখে লাগলে চোখ ঝলসাবে-এটি স্বাভাবিক। প্রথম দিনে সে ভালো লাগা আমার মনকে ঝলসিয়ে ক্ষত তৈরি করেছিল। তারপর কোন একদিন বিকেলে ক্যাম্পাসের মূল ফটকে তার সাথে আমার পরিচয়। আমরা দুজন একই ব্যাচের, শুধু বিভাগটা আলাদা। তবে এতদিন বাদে পরিচয়! সে প্রথম বর্ষে অনিয়মিত ছিল। ফলে একই ভবনে পাশাপাশি বিভাগ হওয়া সত্ত্বেও আমি তাকে সেদিন প্রথম দেখলাম। যদিও আমার বন্ধুরা কয়েকজন আগে থেকেই তাকে চিনতো।

তার পরনে ছিল গোলাপি রঙের ড্রেস, সাথে ম্যাচিং করা হাতব্যাগ। মৃদু হাসি, মেঘবরণ কেশ সবকিছু মিলিয়ে এক ভিন্ন আবহ ছিল। এমন নান্দনিক আবহে সে যে সোনার কন্যা এটি নিয়ে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। দীর্ঘ একবছর আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম, তারপর প্রেম। যদিও সে আমাকে প্রপোজ করেছিল। কারণ আমি এতই লাজুক ছিলাম যে, ভালোবাসি কথাটি বলতে গেলে জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয় আমার। তারপর আমাদের সময়গুলো দারুণ কেটেছে। ছোটভাই সাহিদুল যদিও আমার এ প্রেমে হিংসাত্মক মনোভাব পোষণ করতো। এর কারণ হলো আমি প্রেমে মজনু কিন্তু সে নিজেও একজনকে পছন্দ করে। তবে আজও তার সাথে প্রেম করা হয়ে ওঠেনি প্রিয় অনুজের। ফলে ভাই হিসেবে সে নিজের অন্তর্জ্বালা আমাকে কটাক্ষ করে মেটায়।

বৃষ্টি কেন জানি তার আপন মহিমায় ঝরে পড়ছে। শহুরে আবহে যদিও এর আপন সৌন্দর্য অবলোকন সম্ভব নয়। তবে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ধরার যে খেলা, তাতে এক নতুন আবেশ জন্ম নেয়। গান এক এক করে বাজছে। স্বপ্ন বুননের সে কল্পনা মনে নাড়া দিয়ে চলেছে। হাতের সিগারেট কখন যে জ্বলে শেষ হলো, তা বোঝার আগেই মনের আগুনে দগ্ধ হতে হলো।

সোনার কন্যার নামটি বলা হয়নি। মৃদু বাতাস আমাকে স্পর্শ করে তার নামটি বলে গেল। নাম তার তনু। তনুর সাথে আমার প্রেমের পর আমরা দারুণ সময় কাটিয়েছি। এমন বাদল দিনে আহসান মঞ্জিলের মাঠে কিংবা বুড়িগঙ্গায় দুজনে আপন মনে ভিজেছি। উপভোগ করেছি প্রকৃতিকে। হাতে হাত ধরে ক্যাম্পাসে কত না হেঁটেছি। বন্ধু মমিন এর সাক্ষী হয়ে আজও বেকার রয়েছে। তার টিউশনির টাকায় কত বাদাম কিনে খাইয়েছে তার হিসাব বলা মুশকিল। এমন দিনে তার ফোনে আমাকে ঘরে আটকে রাখা ছিল মুশকিল। কারণ ক্যাম্পাসের কাছেই আমরা দুজন থাকতাম। মেঘের ডাক কিংবা বজ্রপাতের শব্দ আমাদের কখনো আলাদা করতে পারেনি। আমি ছুটে যেতাম তনুর কাছে। তার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষায় থেকে কত ভিজেছি। সে ভেজায় পরম আনন্দ ছিল। অনেক সময় জ্বর হয়েছে। আর সেজন্য তনুর কাছ থেকে বকাও খেয়েছি কম নয়! তাকে বাসা থেকে নিয়ে আলতো করে জড়িয়ে বীরের মত দুজন দুজনকে আলিঙ্গন করেছি। পরম মমতায় কাছে নিয়েছি। সে সুখস্মৃতি আজ এ আবহে কেন জানি বড়ই মনে পড়ছে।

আমার কলেজের বন্ধু মামুন। নটর ডেম কলেজে আমরা একই গ্রুপে পড়েছি। সে এখন শহরের বড়মাপের আইনজীবী। তরুণ এ আইনজীবীর শহরে বড় নাম-ডাক। ফলে মাঝে-মধ্যে বেকার বন্ধুদের নিয়ে পার্টি করে। গতকাল ছিল সেরকম একটি রাত। আমি তো এমন ছিলাম না। সময় আসলে অনেক কিছু পরিবর্তন করে। সরকারি চাকরির ভাইভা দিয়েছি ১৩ বার। কিন্তু নিয়োগপত্র জোটেনি। তনুর বিয়ে ঠিক হলো, ছেলে পেশায় সহকারী পুলিশ সুপার। অভিজাত এক ব্যাপার। আমি সেবার তাকে ধৈর্য ধরতে বললাম আমার ব্যাংকের নিয়োগের রেজাল্ট পর্যন্ত। সে নিয়োগপত্র আমার কপালে জোটেনি। তবে জুটেছিল তার বিয়ের দাওয়াতপত্র। ফলে আজ এ অফিস তো কাল সে অফিস করে আমার সময় পার।

তনুর বিয়ের দাওয়াত আমার কাছে তার এক বন্ধু মারফত পাঠিয়েছিল। আমার আসলে তখন আকাশ ভেঙে মাথায় পড়বার মত অবস্থা। আর সেদিন থেকে তার ফোন বন্ধ পেলাম। পরবর্তীতে অনেক চেষ্টা করেছি তার সাথে যোগাযোগ করতে। তবে সেটি আর সম্ভব হয়নি। তনুর যেদিন বিয়ে, আমি সে রাতে অনেক কেঁদেছি। সে অশ্রু বিসর্জন অর্থহীন। আমি তো একে নির্মম ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই বলতে পারি না।

বিলাসী-মৃত্যুঞ্জয়ের মত প্রেম যেমন মনে নাড়া দেয়; তেমনি আমার আক্ষেপ জন্ম নেয়। চাকরিই কি বিয়ের একমাত্র মাপকাঠি। মনকে যে জয় করেছে, সেটি যে ছোটখাটো কোন বিষয় নয়। মানুষের মন জয় হিমালয় জয়ের চেয়েও কঠিন। কিন্তু তার কোন পুরস্কার এ সমাজ দিতে চায় না। তারা চাকরিকে যোগ্যতার মাপকাঠি মনে করে। মনকে বাণিজ্যিকীকরণে এ সমাজ সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তনু বা তার পরিবার আমাকে সময় দিয়েছে এটি সত্য। তবে একই স্রোতধারায় সমাজ প্রবাহিত হয়ে চলেছে হাজার বছর ধরে।

আমি চাকরি পাইনি যোগ্যতার মাপকাঠিতে। যা প্রাপ্য এটিও সত্য। তাই বলে তনুকে অন্যের হাতে তুলে দেবে! এটি কোন নিরপেক্ষ বিচারকের রায় হতে পারে না।

তনুর বিয়ের দুদিন পর আমি একটি চিঠি হাতে পেলাম। তাতে যা লেখা ছিল, তা না-ই বা বললাম। তবে যা লেখা ছিল তা পড়ে আমি নিজেকে সংযত রাখতে পারিনি। বৃষ্টিতে ভিজে আমি যতক্ষণে তার পাশে গিয়ে পৌঁছেছি, তা বড্ড দেরিতে। আমি তনুকে শেষবার দেখে এসেছি। তবে দূর থেকে তার চিরনিদ্রায় আমি সাক্ষী হতে পেরেছি। এটিও আমার কম প্রাপ্তি নয়।

আমি বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করেছি। সেদিন আমার অশ্রু আর বৃষ্টির পানি এক হয়ে ঝরেছিল। শোকস্তব্ধ আমি নির্বাক ছিলাম। ছোটভাই সাহিদুলের বুকে মাথা রেখে দুভাই ভিজেছি। সে ভেজায় কোন স্বস্তি ছিল না। সমাজ হাজার বছর ধরে একই স্রোতধারায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে। এখানে মনের কোন মূল্য নেই। কিন্তুু তার জন্য অনেক সময় চড়ামূল্য দিতে হয়।