রুবেল পিকে : মানুষের পোশাক নিয়ে গবেষণা কিংবা চর্চা বা অনুসন্ধান অনাদিকাল চলছে, আরও চলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ভারতবর্ষ তথা বাঙ্গালি তথা বাংলাদেশি নারীদের পোশাক বলতে আমরা শাড়িকেই বুঝে থাকি। নারীদের বসন হিসেবে শাড়ি কবে, কখন থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে তা সঠিক বলা মুশকিল। তবে পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে নারীর পোশাক হিসেবে শাড়ি ও শাড়ি শব্দটির প্রচলন শুরু হয়। কিন্তু পৃথিবীতে মানুষের বসবাসের ইতিহাস আরও প্রাচীন। অসভ্য মানুষেরা, আমাদের পূর্বসূরী,যখন বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো জীবিকার তাগিদে তখন তারা পোশাকের খুব একটা প্রয়োজনবোধ করতো না। পরবর্তীতে মানুষের মাঝে বিবর্তনের মাধ্যমে প্রাচীন সভ্যতার বিকাশ ঘটে। সেটাও প্রায় সাত হাজার বছর আগের কথা। মেসোপোটেমিয়া সভ্যতার কোনো সভ্যতাতেই শাড়ি শব্দটির ব্যবহার নেই যদিও কাপড়ের ব্যবহার ছিল। কারণ পরিস্কার; সভ্যতাগুলোর ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক পরিবেশ শাড়ির সঙ্গে পরিচিত কিংবা মানানসই ছিল না। প্রকারান্তরে, সিন্ধু সভ্যতায় শাড়ির মতো পোশাকের প্রচলন দেখা যা।

ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম অংশে প্রায় ২৮০০ খ্রীস্টপূর্ব অব্দে শাড়ির প্রচলনের কথা জানা যায়। কারণ এ সভ্যতার ধর্ম,সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক পরিবেশ শাড়ির সঙ্গে পরিচিত কিংবা মানানসই ছিল। তবে সে শাড়ি ছিল একপাটি ও একপ্যাঁচের শাড়ি যা মাথার ওড়না বা উত্তরীয়, বুকবন্ধনী বা সেমিজ এবং পেটিকোট বা নিচের অংশ এই তিনটি খন্ডের কাজ সম্পাদনে ব্যবহৃত হতো। কারণ তখনও সেলাইয়ের কাজ বা সিয়ান শিল্পের প্রচলন ঘটেনি। পরবর্তীতে সিয়ান শিল্পের প্রচলন শুরু হলে মানুষ সেলাইয়ের মাধ্যমে তার প্রয়োজন মতো শাড়ি পরার ধরন ও স্টাইল পরিবর্তন করতে লাগলো। শাড়ি পরার ধরন ও স্টাইলে আমুল পরিবর্তন এসেছে কোলকাতার ঠাকুর পরিবারের হাত ধরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী  কোলকাতায় শাড়ি পরার ভিন্ন শৈলীর প্রচলন ঘটান।এ জন্য শাড়ির নিচে সেমিজ বা জ্যাকেট ( ব্লাউজের পুরাতন নাম) এবং পেটিকোট পরার প্রয়োজন ছিল এবং এই পোশাকে তৎকালীন নারীদের অন্তরমহল থেকে বাইরে আসার প্রচলন ঘটেছিল।আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়,ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন ধর্মের দেবী বা প্রত্নতাত্ত্বিক মূর্তি বা ভাস্কর্যের যে নিদর্শন(নারী) পাওয়া যায় সেগুলোর প্রায় সবগুলোতেই শাড়ির যোগসাজশ রয়েছে। (এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টি বিবেচনা না করার অনুরোধ করছি। আমি শুধু বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনে সত্য ও যুক্তিসঙ্গত কথা লিখতে গিয়ে এ প্রসঙ্গের অবতারণা করছি মাত্র)।

সে থেকে প্রাচীন যুগের ধর্মপ্রাণ ও ধর্মভীরু মানুষেরা এর বাইরে চিন্তা করার কথা না। সঙ্গত কারণেই শাড়ি এদেশের তথা এ অঞ্চলের নারীদের পবিত্র তথা আবশ্যকীয় পোশাকে পরিণত হয়েছে। প্রাচীন কালে এমনকি মধ্যযুগের প্রারম্ভ পর্যন্ত এ অঞ্চলের সকল মানুষ বিভিন্ন দেবদেবী বা প্রতিমার উপাসনা করতো। পরবর্তীতে খেলাফত ও সালতানাতের মুসলিম শাসকগণ কর্তৃক ভারত জয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলে ভিন্ন ধর্ম,সংস্কৃতি ও সভ্যতার ছোঁয়া লাগে। ফলে নারীদের পোশাকে আসে আরও পরিবর্তন, আরও বৈচিত্র্য। এ আমলে আমরা দেখতে পাই অতি সংগোপনে প্রাচীন কালে বা মধ্যযুগে শাড়ির আঁচলের যে বাড়তি অংশটি কাজের সুবিধার্থে কোমরে পেচানো হতো সেটা মাথায় ঘোমটা হিসেবে পরা শুরু হলো। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাড়ির সঙ্গে ওড়নাও যুক্ত হয়ে গেল। তাছাড়া ব্লাউজের আকার ও আকৃতিতে আসে পরিবর্তন। হাতের কব্জি পর্যন্ত ব্লাউজের প্রচলন ঘটে এ সমযেই। 
তুর্কি,মোঘল, আফগান, আরব,পারস্য প্রভৃতি সংস্কৃতি ও সভ্যতার সংস্পর্শে এসে এ অঞ্চলের নারীদের পোশাকে আমুল পরিবর্তন সাধিত হয়। সবশেষে বৃটিশ উপনিবেশের বদৌলতে নারীদের শাড়িতে অত্যাধুনিকতার অবাঙ্গালি বৈশিষ্ট্য সন্নিবেশিত হয়। তখন নারীরা ঢিলেঢালা স্টাইলে শাড়ি পরার পরিবর্তে আঁটসাঁট স্টাইলে শাড়ি পরতে শুরু করে। অর্থাৎ ইহা পরিস্কার যে,শাড়ি ও শাড়ি পরার স্টাইল ও ফ্যাশনে কখনো ধীরে কখনো দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। মোটকথা বিবর্তনবাদের ছোঁয়া লেগেছে। ইহা অমোঘ সত্য, পৃথিবীর কোনো কিছুই বিবর্তনবাদের মতো নিষ্ঠুর আচরণ থেকে রেহাই পাবে না।উপরের বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে বিগত ৩০ আগস্ট ২০১৯ তারিখের দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘শাড়ি’ নিবন্ধটির কিছু অংশ উল্লেখ করে গঠনমূলক সমালোচনা করা যাক। নিবন্ধের শেষাংশে লিখেছেন, “শাড়ি সারা শরীর জড়িয়ে রাখা এক কাপড়ের একটা দীর্ঘ স্বপ্নখচিত জড়োয়া গয়না।” কী অপূর্ব শব্দ চয়ন! শব্দের দ্যোতনা! নারীর পোশাককে গয়নার সঙ্গে তুলনা করার আগে নারীর স্বাতন্ত্র্য কী বাকি থাকে তা কি একবার ভেবে দেখার প্রয়োজন ছিল না? নারী কি শুধু শাড়ি (পোশাক অর্থে নয়),গয়না পরিহিত একটি জড় পদার্থ প্রতিমূর্তি?

আরেক জায়গায় লিখেছেন,  “শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক। শুধু শালীন নয়, রুচিসম্পন্ন, সুস্মিত ও কারুকার্যময় পোশাক। নারী শরীরকে যতটুকু অনাবৃত রাখলে তা সবচেয়ে রহস্যচকিত হয়ে ওঠে, পোশাক হিসেবে শাড়ি তারই উপমা। শরীর আর পোশাকের ওই রমণীয় এলাকা বিভাজনের অনুপাত শারীর রচয়িতারা কি জেনে না না–জেনে খুঁজে পেয়েছিলেন, সে কথা বলা না গেলেও এর পেছনে যে গভীর সচেতন ও মুগ্ধ শিল্পবোধ কাজ করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ। শাড়ি তার রূপের শরীরে বইয়ে দেয় এক অলৌকিক বিদ্যুৎ হিল্লোল।”

আবু সায়ীদ স্যার সর্বজন শ্রদ্ধেয় সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে এত চটুল, এত হালকা চিন্তাপ্রসূত লেখা আশা করিনি। প্রাচীন ও মধযুগীয় কবি সাহিত্যিকগণের ন্যায় তিনিও নারীকে ভোগের ও পরাধীন স্বত্বা হিসেবে চিত্রায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন। নারীর শরীর শুধু যৌনাবেদন ছড়িয়ে যাবে আর পুরুষরা এর সুগন্ধি শুকবে রাস্তা-ঘাটে, মাঠে-ময়দানে! চরম বাস্তবতার যুগে এসে  আমাদেরকে এ ধরনের সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে হবে? নারীকে নিয়ে সাহিত্য রচনা করতে বাঁধা নেই। আপত্তি তখনই যখন দেখি সাহিত্যের উপজীব্য হিসেবে নারীর পোশাক, অলংকার, গয়না তথা রূপ-ই কেবল প্রাধান্য পায়। প্রাগৈতিহাসিক, প্রাচীন কিংবা মধ্যযুগে নারীকে নিয়ে সাহিত্যে অতিরঞ্জন অনেক হয়েছে। তাই বলে এখনও সাহিত্যের উপজীব্য হিসেবে নারী-ই ব্যবহৃত হবে? আমাদের কবি- সাহিত্যিকগণ সাহিত্য রচনার উপজীব্য খুঁজে পান না। নারী নিয়েই যদি সাহিত্য রচনা করতে হয় তবে পোশাক কেন,নারীর সাফল্য, নারীর সক্ষমতা, পারদর্শিতা ইত্যাদি নিয়ে সাহিত্য রচনা করে বিশ্ব সাহিত্যে নিজেকে তথা নারীকে উপস্থাপন করুন মানুষ হিসেবে তথাকথিত নারী হিসেবে নয়। এখন দেখছি, লিঙ্গ ও জেন্ডার নিয়ে শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে মিডিয়াতে আলোচনা করা প্রয়োজন যাতে করে আমাদের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে।
আবৃত, বিবৃত ও সংবৃতের মিশেল দিয়ে নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে লিখেছেন, “নানা জাতির দৈহিক বৈশিষ্ট্য একত্র হওয়ায় বাঙালির শরীর অধিকাংশ সময় সুগঠিত নয়। এই ত্রুটিকেও শাড়ির রুচি স্নিগ্ধ–শৈল্পিক আব্রুর মধ্যে এনে যেন বাঙালি মেয়েকে প্রাণে বাঁচিয়ে দেয়।
তাদের শরীরের অসম অংশগুলোকে লুকিয়ে ও সুষম অংশগুলোকে বিবৃত করে শাড়ি এই দুর্লভ কাজটি করে।”
কী চমৎকার জাদু মিশানো শৈল্পিক ভাষা ব্যবহারের পারঙ্গমতা! কী সাবধানতার সাথে অথচ অবলীলায় পোশাকের অজ্ঞতা ও উগ্রতা দুই-ই ব্যাখ্যা করেছেন মার্জিত ভঙ্গিতে, “বাকি পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই পোশাক হয় শরীরটাকে রমণীয় গুদামঘর বানিয়ে রাখে, নয়তো প্রায় বিবসনা করে রগরগে যৌনতার মৌতাত উদ্যাপন করে।

শাড়ির মধ্যে আছে এই দুইয়ের মিলিত জাদু। এ সৌন্দর্যের লালসাকেও বাদ দেয় না আবার আলোয়–ছায়ায়, মেঘে-রৌদ্রে শরীরকে যেন স্বপ্নরাজ্য বানিয়ে দেয়।” এখানে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করে প্রশ্ন রাখতে চাই নারী কি পোশাক পরে নিজের সৌন্দর্যে অন্যেরা মুগ্ধ হউক – এই প্রত্যাশায়? নাকি নারী পোশাক পরে তার শারীরিক, সামাজিক প্রয়োজনে তথা তার ব্যক্তিত্বকে প্রস্ফুটিত করার জন্যে? প্রেম-ভালোবাসা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি তাই বলে নারী সেই প্রেম-নিবেদন সরোবরে কোমল কমল হয়ে ফুটবে আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সে দৃশ্য নিয়ে কাব্য কিংবা সাহিত্য রচনা করবে – এমন কি আর হওয়া উচিত? মনে রাখা প্রয়োজন, সাহিত্যিক বা কবি গল্প, উপন্যাস বা কাব্যের নায়ক কর্তৃক তার কল্পনা জগতে নায়িকাকে যে পোশাকে চিত্রিত করেন সে পোশাক কিন্তু বাস্তবের নারীর না। নারী বা পুরুষ কিংবা মানুষ তার পোশাক নির্বাচন করবে তার বাস্তব প্রয়োজনে।সবশেষে লিখেছেন,  “আমার মনে হয়, এ রকম একটা অপরূপ পোশাককে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বাঙালি মেয়েরা সুবুদ্ধির পরিচয় দেয়নি।” নারীরা শাড়িকে ঝেঁটিয়ে না হয় বিদায় করছেন তা মেনে নিলাম। কিন্তু আমরা, পুরুষরা কি করছি? এখন শহর, নগর তো দূরের কথা গ্রাম – গঞ্জের কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি অফিসেও শিক্ষিত তো দূরের কথা অশিক্ষিত লোকও লুঙ্গি পরে ঢুকার সাহস পায় না,প্যান্ট-শার্ট পরে ঢুকতে হয়। যদিও পাঞ্জাবি গ্রহণযোগ্য। তাহলে পুরুষের বেলায় বাঙ্গালিত্ব কোথায় রইলো।