১৯১৮ সালে দক্ষিণ ইউরোপে সার্বিয়া, মন্টেনিগ্রো, স্লোভেনিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, ক্রোয়েশিয়া এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা মিলে নতুন রাষ্ট্র যুগোশ্লাভিয়া গঠন করে।

১৯৪৩ সালে মার্শাল টিটোর নেতৃত্বে যুগোশ্লাভিয়া জাতীয় মুক্তি মোর্চা প্রতিষ্ঠা করে অস্থায়ী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৯৪৫ সালে যুগোশ্লাভিয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের অস্থায়ী সরকার স্থাপন করে।

পরে নব্বইয়ের দশকে একে একে চারটি দেশ যুদ্ধের মাধ্যমে ক্রোয়েশিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং স্লোভেনিয়া স্বাধীন হয়ে যায়। ২০০৬ সালে মন্টেনিগ্রো স্বাধীন হয়ে গেলে ইতিহাসে বিলীন হয়ে যায় যুগোশ্লোভিয়া নামের দেশটি।

পরবর্তীতে সার্বিয়া ভেঙ্গে দুটি রাষ্ট্র হয়। একটি সার্বিয়া আরেকটি কসোভো। যুদ্ধ মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করে, অনেকে নিজ দেশ ছেড়ে ভিন দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কেউ ভিন দেশে নতুন জীবন শুরু করে এবং ইতিহাস তৈরি করে।

এই কথা সত্যি হয়েছিল বসনিয়ার সেফিক আর ক্রোয়েশিয়ার জুরকার জীবনে। অভিবাসি হয়ে সুইডেনে এসেছিল তারা নতুন জীবন গড়ার জন্য। এখানে আসার পর দুজনার মধ্যে পরিচয় এবং পরে হয়েছিল মন বিনিময়। নতুন দেশে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং শুভলগ্নে হয়েছিল পরিণয়। পরে তাদের ঘরে জন্ম নেয় যে ছেলেটি তার নাম জ্লাতান (Zlatan)। জ্লাতানের বাবা-মার সম্পর্কটা খুব বেশিদিন টেকেনি। জীবনের শুরুতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হয় তাকে।

ছোট্ট জ্লাতান প্রথমে মা জুরকা পরে বাবা সেফিকের সঙ্গে বসবাস করে। জীবনের প্রথম ১৬টি বছর কেটেছে অভাব আর অনটনের মধ্যদিয়ে তার। যেমন এমনও দিন ছিলো, বাসায় রুটি আর দুধ ছাড়া কিছুই মেলেনি তার। যত কষ্টই হোক না কেন ফুটবল খেলা বন্ধ করেনি কখনও। আমি জীবনে বহু মানুষ দেখেছি, বড় মনের মানুষও দেখেছি। তবে জ্লাতানকে দেখার আগে তার অনেক গল্পও শুনেছি। যেমন সে ছোট বেলায় খুব দুষ্ট ছিল, লেখাপড়া করতে পছন্দ করেনি। তার একজন শিক্ষক বলেছেন ৩০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে আমার দেখা সবচেয়ে গর্দভ পাঁচ ছাত্রের একজন সে। জ্লাতান নিজেও স্বীকার করে পড়াশোনা জিনিসটা তার মাথায় কোনোদিন ঢোকেনি।

তবে সুইডেনের বাধ্যতামূলক জুনিয়র হাইস্কুল পর্যন্ত সে পড়েছে। দোকানে ঢুকে ছোট খাটো জিনিস চুরি করেছে। বাবা-মার ডিভোর্সের কারণে হয়তবা এমনটি হয়েছিল। যাই হোক না কেনো তার হৃদয়ে একটি জিনিস সে বেছে নিয়েছিল তা হলো ফুটবল।

সে পুরোপুরি মন দিয়েছিল ফুটবলে। ফুটবল বেছে নিয়ে খুব একটা ভুল সে করেনি, তা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৬ বছর বয়সে পাঁচ বছর পর আমি কি করব, বিষয়ক এক রচনায় জ্লাতান লিখেছিল, ইতালিতে পেশাদার ফুটবল খেলব, প্রচুর অর্থ থাকবে, সাগরপারে বাড়ি করব, হব বিত্তশালী। পাঁচ বছর পর সে ঠিকই পেশাদার ফুটবলার হয়েছে।

ইতালিতে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল এর তিন বছর পরে। বাবার দেশ বসনিয়ার হয়ে খেলার জন্য ২০০০ সালে সারায়েভোতে গিয়েছিল জ্লাতান, কিন্তু কোচ জাতীয় দলে না নিয়ে অলিম্পিক দলে নিতে চাইলে ফিরে এসে সে সুইডেনের হয়ে খেলতে শুরু করে।

প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। সে একবার বলেছিল, আমি হতে চাই মোহাম্মদ আলীর মতো, অবিসংবাদিত বিশ্বসেরা। বিশ্বসেরাদের একজন সে, কোনো সন্দেহ নেই। ফুটবল ছাড়া শৃঙ্খলাপরায়ণ সুনামটা জ্লাতানের কখনোই ছিল না। তবে ব্যক্তিগত জীবনে ভীষণ পারিবারিক আর শৌখিন সে। ফুটবলের পাশে সে প্যাডেল টেনিস এবং টেনিসও খেলে টুকটাক। নানা দেশ ভ্রমণ এবং আগ্রহের কারণে সে সুইডিশ ভাষার পাশাপাশি ইতালিয়ান, বসনিয়ান, ইংলিশ এবং স্প্যানিশে কথা বলতে পারে। তার জার্সির পেছনে আগে লেখা থাকত জ্লাতান। কিন্তু বাবার প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০০৪-০৫ মৌসুম থেকে লিখছে ইব্রাহিমোভিচ (Ibrahimovic)। কয়েক বছর আগে টেনিসের কোর্টে আমার সঙ্গে তার দেখা মেলে। আমার মেয়ে জেসিকা সেই একই জায়গায় সেদিন টেনিস খেলছে। খেলার শেষে কিছুক্ষণ হয়েছিল কথোপকথন আমাদের মাঝে। মজার বিষয় তার সুইডিশ এজেন্ট জেসিকাকে তার ব্রান্ডের ফ্যাশন শো প্যারিসে দাওয়াত করেছিল। যদিও জেসিকার খুবই ইচ্ছে ছিল প্যারিসে জ্লাতানের ব্রান্ড ফ্যাশন শোতে যোগ দেয়ার।

কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই একই সপ্তাহে জেসিকার ইংল্যান্ডে খেলা থাকায় সে যেতে পারেনি। কেউ কি কখনও এমন একটি মানুষ দেখেছেন যাকে দেখলে পুরো শরীরের লোম গুলো দাড়িয়ে পড়ে? জ্লাতানকে দেখলে, তার জীবনী এবং তার কথা ভাবলে আমার শরীরের লোমগুলো দাঁড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সে যখন সারা বিশ্বের মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয় তার জীবনের ঘটে যাওয়া রিয়েল স্টোরির মাধ্যমে। সে যখন বলে আমি যখন পেরেছি তোমরা কেনো পারবে না? সে জন্মসূত্রে সুইডিশ হওয়ার পরও বার বার তাকে প্রমানিত করতে হয়েছে সে ভিন্ন ধরণের এক নতুন সুইডিশ, যে অন্য কোনো সাধারণ সুইডিশ থেকে আলাদা।

তার বাবা-মা সুইডিশ নয় বিধায় তাকে উৎসর্গ করতে হয়েছে অনেকের চেয়ে বেশি। তারপরও সে নতুন প্রজন্মের আইডল। তার সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাস করেছে তাকে বিশ্বসেরা। জ্লাতান শুধু সুইডিশ জাতির নয়, গোটা বিশ্বের ফুটবলের এক কিংবদন্তি (লিজেন্ড)।

জ্লাতানের মত আমার মনে বিশ্বাস ঢুকেছে আমরাও পারব লাল সবুজের পতাকাকে ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলের মাঠে তুলে ধরতে। আমার বিশ্বাস ৬৮ হাজার গ্রাম খুঁজলে নিশ্চয় আমরা জ্লাতানের মত খেলোয়াড় খুঁজে পাবো। বাংলাদেশ ফুটবলার হান্ট একাডেমী তেমন একটি আশা নিয়ে মাঠে নেমেছে। প্লীজ সঙ্গে থাকুন এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন, সফল আমরা হবই।