বিনয় কৃষ্ণ মন্ডল,আশুলিয়া থেকেঃমরনঘাতী করোনা ভাইরাসের ভয়ংকর থাবায় পুরো বিশ্ব যেখানে থমকে আছে, ঠিক সেই মুহুর্তে বাড়ি ভাড়ার চাপে দিশেহারা আশুলিয়ার দিনমজুরসহ লাখো ভাড়াটিয়ারা। এ যেন মরার উপর খড়ার ঘাঁ। এদিকে, দৃষ্টিগোচরে আসতে আশুলিয়ার দুই একজন বাড়িওয়ালা ভাড়া মওকুফ করলেও ঋণ করে বাড়ি করার দোহাই দিয়ে ভাড়ার টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন অধিকাংশ বাড়িওয়ালা। আশুলিয়া এলাকাটি শিল্লাঞ্চল হওয়ায় ভাড়া বাসায় থেকে কাজ করে লাখ লাখ শ্রমিক।

অঘোষিত লকডাউনের প্রভাবে যখন দেখা দিয়েছে খাদ্য সংকট, ঠিক সেই মুহুুর্তে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকান ও বাসা ভাড়ার চাপে ভুলে গেছেন করোনাভাইরাসের কথা। বাধ্য হয়ে অনেকেই রাস্তায় নেমেছেন রিকশা নিয়ে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকার ভাড়াটিয়া শ্রমজিবী মানুষের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

করোনাভাইরাসের করাল গ্রাসে দেশ ও জনগণকে বাঁচাতে অনেক আগেই দেশের সরকারি, বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান, গণপরিবহণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সকল শিল্প কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘর থেকে বাহিরে বের হচ্ছেন না সচেতন ব্যক্তিরা। কর্মহীন হয়ে পড়েছে দিন ভিত্তিক চুক্তিতে কাজ করা শ্রমিকসহ পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরা, ফুটপাত দোকানী, ছোট ছোট ব্যাবসায়ীসহ ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ীরা। তারা ঠিকঠাক যোগাতে পারছেন না দুই বেলা দুইমুঠো খাবার। তাদের কর্ম বন্ধ, হয়েছে বন্ধ আয়ের পথও। আর এই অবস্থায় বাড়ি ভাড়ার চাপ দিয়ে যাচ্ছেন বাড়িওয়ালারা।

মঙ্গলবার বিভিন্ন ভাড়াটিয়া শ্রমজীবি মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, মরনঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে দেশব্যাপী চলছে অঘোষিত লকডাউন। ফলে অধিকাংশ দিনমজুরের ঘরের খাবার শেষ হয়ে গেছে। ত্রাণের আশায় ঘরের দড়জার সামনে দাড়িয়ে থাকেন তারা। কে কখন ত্রাণ নিয়ে আসেন সেই প্রতিক্ষায়। রয়েছেন চরম বিপাকে। আবার এই মুহুর্তে বাড়িওয়ালারা ভাড়ার টাকার জন্য চাঁপ দিয়ে যাচ্ছেন।

তাজরীন ফ্যাশন দুর্ঘটনায় আহত পারভিন বলেন, আমরা কেউ কোন যায়গায় কাজ করতে পারি না। কাজ চাইতে গেলে তাজরীনের শ্রমিক বলে কেউ কাজে নেয় না। তারা বলে আমরা নাকি কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। কোন মতে খেয়ে না খেয়ে তিন সন্তান নিয়ে চলছি। প্রতি মাসেই বাসা বাড়া দিতে ঝামেলা হয়। সময়মত দিতে পারি না। এবার তো দিতেই পারবো না। বাড়িওয়ালা বাসা ছেড়ে দিতে বলেছে। আর যদি এই বাসায় থাকি তাহলে প্রতি মাসের ৮ তারিখের মধ্যে ভাড়া দিতে হবে। সব মিলে মানুষিক চাপের মহাসাগরে আছি, একবার মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছি। করোনায় নয় মনে হয় মানুষিক চাপেই মরে যাবো এবার।

আশুলিয়ার হোটেল ব্যবসায়ী মিস্টার বলেন, হোটেলের ভাড়া প্রতিমাসে ৩০ হাজার টাকা। মার্চ মাসে সমস্যা থাকার কারণে হোটেল ভাড়া দেইনি। এখন দুই মাসে ৬০ হাজার টাকা হয়ে গেলে, আর হোটেল বন্ধ আেেছ প্রায় ১ মাস ধরে। মনে হয় আমি আর ব্যবসা করতে পারবো না। কারণ ভাড়া দিতেই আমার সব মুলধন চলে যাবে। আমি যে এখন কি করবো কার কাছে যাবো কিছুই বুঝতে পারছি না। যদি এর কোন ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তাহলে গলায় রশি দিয়ে মরা ছাড়া আর কোন বুদ্ধি থাকবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাড়িওয়া বলেন, আমরা ঋণ করে বাড়ি করেছি। আজ পর্যন্ত ঘর ভাড়ার সব টাকা কিস্তি দিতেই যাচ্ছে। একটি টাকা দিয়েও বাজার করে খেতে পারি নাই। আর ব্যাংক তো আমাদের ছাড় দেবে না, এ টাকা তারা নেবেই। সুতরাং বাড়ি ভাড়া ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়। ব্যাংক যদি কিস্তি মওকুফ করে দিতো আমরাও বাড়ি ভাড়া মওকুফ করতাম। আর শ্রমিকরা কোথায় টাকা পাবে এটা চিন্তা করে লাভ নেই। তারা এতদিন চাকরি করে কি করেছে, কোন টাকা জমায়নি কেন। বিপদের জন্য মানুষ ঠিকই টাকা জমায়। এখন সবার বিপদের সময় টাকা তো দিতেই হবে তাই না।

এব্যাপারে আশুলিয়া ভাড়াটিয়া পরিষদের সভাপতি সারোয়ার হোসেন বলেন, প্রথমেই আশুলিয়ার সেই বাড়িওয়ালাদের কৃতজ্ঞতা জানাই যারা নিজ উদ্যোগে ভাড়া মওকুফ করে দিয়েছেন। আর যারা বাড়ি ভাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন আমি তাদের উদ্দেশ্য বলবো, ‘আপনারা মানবিক হোন’ এই দুর্যোগে আপনারাও যোদ্ধা হিসেবে যোগদান করেন। সবকিছু সরকারের আশায় থাকলে হবে না। নিজেদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আপনাদের ব্যাংক ঋণ নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত ব্যাংকের কোন কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল কোন বিল আপনাদের দিতে হবে না এ মাসে। সরকার এতো ছাড় দিচ্ছে আপনারা ১ মাসের বাড়ি ভাড়া ছেড়ে দিতে পারেন না। তাই আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ শ্রমিকদের প্রতি একটু মানবিক হোন। তাদের পাশে দাড়ান। আপনারাও করোনা যুদ্ধে যার যার অবস্থান থেকে যোগ দেন। তাহলেই হয়তো আমরা এবারের মত জয়ী হতে পারবো।