হাসান চৌধুরী- মানিকগঞ্জ সংবাদদাতাঃ মানিকগঞ্জের শিবালয়ের ঐতিহ্যবাহী অক্সফোর্ড একাডেমি নামে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুল মতিন খানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাত, নানা অনিয়াম-দুর্ণীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় দেড় ডজন অভিযোগ সংক্রান্ত ফিরিস্তি উর্দ্ধতন কর্মকর্তার দপ্তরে পেশ করা হয়েছে। ইতিপূর্বে অবৈধভাবে স্কুল পরিচালনা কমিটি-এসএমসি গঠন সংক্রান্ত এক অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ব সত্য বলে প্রতিয়মান হয়েছে। জানা গেছে, এ বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিনের সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি, অযোগ্যতা ও ব্যর্থতার বিষয়ে উর্দ্ধতন মহলে অভিযোগ করা হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, শিবালয় সার্কেল তানিয়া সুলতানা স্বাক্ষরিত এক তদন্ত প্রতিবেদনের একাংশে বলা হয়, উক্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিনের চতুরতার কারনে ২০১৯ সালে ভুয়া অভিভাবক সাজিয়ে এবিএম জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকিকে এডহক কমিটির অভিভাবক  সদস্য করা হয় এবং একাডেমীর ব্যাংক হিসাব শূণ্য করে ফেলায় বর্তমানে শিক্ষক কর্মচারিরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।  উল্লেখ্য, উক্ত জাহাঙ্গীর আলম স্থানীয় সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ পদে রয়েছেন। এদিকে, প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ সংক্রান্ত এক ফিরিস্তি মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের দপ্তরে জমা দেয়া হয়েছে। উক্ত অভিযোগে নানা তথ্য-উপাত্ব বিদ্যালয়ের অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিরোধী অপতৎপরতার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখিত কিছু তথ্য উপাত্ত নিম্নে দেয়া হলো- প্রথমত; এনটিআরসিএ কর্তৃক ২০১৯ সালে নিয়োগকৃত বিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষককে এমপিও ভুক্তিকরণের অজুহাত এবং ২০০৩ সালের শিক্ষক নিয়োগ কমিটির রেজুলেশন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে তিনি বিপুল পরিমান টাকা হাতিয়ে নেয়। সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে চলতি বছর উন্নয়ন/নির্মাণের নামে শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে ৩’শ টাকা হারে ১৫০০ শিক্ষার্থীর নিকট থেকে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা আদায় করে। এ নিয়ে অভিযোগ উঠলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, শিবালয়, মানিকগঞ্জ মহোদয় শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে নেয়া অর্থ ফেরত বা মাসিক বেতনের সাথে সমন্বয়ের আদেশ দেন। কিন্তু আব্দুল মতিন সে আদেশ অমান্য ও রেজুলেশন ঘষামাজা করে অদ্যাবধি অর্থ ফেরত না দিয়ে আত্নসাতের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। প্রধান শিক্ষক মতিন স্বেচ্ছাচারি হিসেবে একাডেমীর প্রতিষ্ঠাকালীন সহকারী শিক্ষক (হিন্দুধর্ম) রেখা রানী দত্তকে বাদ দিয়ে মর্জিনা আক্তারকে সহকারি গ্রন্থাগারিক হিসাবে অবৈধ নিয়োগ দেন। এ বিষয় বিজ্ঞ আদাত পর্যন্ত গড়ায়। বিজ্ঞ আদালত রেখা রানী দত্তের অনুকূলে রায় দেয়। এডহক কমিটি রেখা রানী দত্তকে পূনরায় যোগদান ও বকেয়া বেতন পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত দিলেও মতিন অদ্যাবধি তা না দিয়ে টালবাহানা করে আসছে। দাখিলকৃত ফিরিস্থিতিতে আরো বলা হয়, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কানাডা প্রবাসী ড. আজিম উদ্দিন মল্লিক উক্ত অক্সফোর্ড একাডেমীর ফলাফলে সন্তোষ্ট হয়ে তিনটি শিক্ষা বৃত্তি হিসেবে ৩০ হাজার টাকা দেন। শর্ত ছিল, উক্ত টাকা ব্যাংকে রেখে লভ্যাংশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয়া হবে। কিন্তু প্রধান শিক্ষক মতিন এ টাকা ব্যাংকে না রেখে নিজেই আত্নসাত করেন। এছাড়া, টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে স্থানীয় হাফিজুর রহমান খান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রধান শিক্ষক মতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে উক্ত মন্ত্রণালয় নিরীক্ষা ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সরেজমিনে তদন্তে আসেন। তদন্তে আসা কর্মকর্তা অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ভূয়া শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন দায়ী বলে উক্ত তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। এগারো নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, অক্সফোর্ড একাডেমীর সম্পত্তি সংক্রান্তে স্থানীয় শংকর গংদের সাথে ২০০৩ থেকে প্রায় ৭ বছর মামলা চলে। এতে মোটা টাকা ব্যয় হলেও একাডেমির পক্ষে ডিক্রি পায়। কিন্তু মতিন খতিয়ানে শংকর গংদের ১০৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভূমি একাডেমীর অনুকূলে ক্রয় করার কথা বলে একাডেমীর টাকা, পুকুরের মাছ ও পুকুর পাড়ের গাছের বিনিময়ে আপোষের নামে সমস্ত সম্পত্তি নিজ ও স্ত্রী-পুত্র এবং শ্যালকদের নামে রেজিস্ট্রি করে নেয়। পরবর্তিতে একাডেমীর দখলকৃত ৩২ শতাংশ অর্পিত সম্পত্তি নিজ নামে নিয়ে এ বছর একাডেমীকে বেদখল দেখায়। একাডেমীর অর্থ আত্মসাৎ ও স্বেচ্ছাচারিতার দায়ে ম্যানেজিং কমিটি গত ১০ মার্চ ২০১৪ সালে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিনকে সাময়িক বরখাস্ত করে। দীর্ঘদিন বরখাস্ত থাকার পর ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার এক অফিস আদেশে মতিনকে অবৈধভাবে স্বপদে বহাল করেন।  মতিনের এ পুনর্বহাল আদেশ একাডেমীর পূর্ণাঙ্গ ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে করতে হবে এমন মন্তব্য উল্লেখ থাকলেও অদ্যাবধি ম্যানেজিং কমিটি গঠন হয়নি। মতিনের এহেন অবৈধ যোগদানের বিরুদ্ধে একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোঃ আবু বকর সিদ্দিক বিজ্ঞ হাইকোর্টে ১১৮৭/২০১৭ রীট পিটিশন দাখিল করেন যা বর্তমানে চলমান আছে। সাময়িক বরখাস্তের পর আব্দুল মতিন একাডেমীর মূল্যবান কাগজপত্র চুরি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে হত্যার হুমকি দিলে বিজ্ঞ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মানিকগঞ্জে সিআর ২০নম্বর মামলা দাখিল করা হয়। এটাও চলমান রয়েছে। সবশেষে মতিনের এমন বেপরোয়া আচরণ ও বিদ্যালয়ের স্বার্থ পরিপন্থি অপতৎপরতার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাসহ ফৌজদারী অপরাধের মামলা দায়ের ও গ্রেফতার করে দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি দেয়া ছাড়া একাডেমির অস্তিত্ব রক্ষা সম্ভব নয় বলে সচেতন অভিভাবক ও সুধিমহল মত প্রকাশ করেছেন। এছাড়া, সুষ্টুভাবে বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য বিধি মোতাবেক শীঘ্র পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের দাবী করা হয়েছে। প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন খান এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ একটি মহল আমার বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগ তুলছে। তাতে কোন অসুবিধা নেই। এখন আমার চাকরি গেলেই বাঁচি। আরও জানা যাই গত ৪ঠা জুন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোঃ আবু বকর সিদ্দিক মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের নিকট এ-সংকান্ত দুর্ণীতির ফিরিস্তির একটি অভিযোগ দাখিল করেছেন।