ফিরোজ সুলতান, ঠাকুরগাঁও : ঈদকে সামনে রেখে বর্ষা মৌসুমে ঠাকুরগাঁওয়ে গো-খাদ্যের মূল্য অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে জেলার কৃষক ও খামারীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে কোরবানীর ঈদ এগিয়ে আসায় খামারীরা উচ্চ মূল্যে গো-খাদ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে গরু পালনে ব্যয় বেড়েছে স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে ২-৩ গুণ। জানা গেছে, জেলা সদর উপজেলাসহ, বালিয়াডাঙ্গী, রাণীশংকৈল, হরিপুর, পীরগঞ্জ উপজেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অনেক গো-খামার গড়ে উঠেছে। মুলত কোরবানীর ঈদে প্রাণীর চাহিদা থাকায় অল্প সময়ে গরু মোটাতাজা করে লাভবান হতে এ সব খামারে হাজার হাজার উন্নত জাতের গরু লালন-পালনের মাধ্যমে অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। আবার বানিজ্যিক ভিত্তিতে মোটা অংকের টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে গো-খামার থেকে খামারীরা মুনাফা লাভ করে আসছেন।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের কৃষক আনোয়ার ইসলাম (৩২) জানান, এ জেলার ৫ উপজেলায় ফসলী মাঠে বর্ষাকালীন বোনা ও রোপা আমন ধানের নিবিড় আবাদ হওয়ায় বর্তমান সময়ে মাঠে গরু নামানই সম্ভব নয়। কারণ সর্বত্রই বিভিন্ন ফসলের আবাদ হওয়ায় গবাদী পশুর খাদ্য কাঁচা ঘাস জোগাতে পারছেন না খামারী ও কৃষকরা। ফলে তাদের পালন করা গরু এক অর্থে বাড়িতেই বেধে রেখে বাজার থেকে কেনা খাবার দিতে হচ্ছে। 

তিনি আরো বলেন, দেড় থেকে দুই দশক আগে খামারী ও কৃষক তাদের গবাদী পশুকে মাঠে কাঁচা ঘাস খাওয়াত। এ জন্য রাখাল রেখে গরু মাঠে চড়ানো হত। এতে করে গরুগুলো কাঁচা ঘাস পেয়ে অধিক পরিমান দুধ দিত ও মাংস বৃদ্ধি হত। বিশেষ করে দুধেল গাভীর জন্য কাঁচা ঘাস অপরিহার্য ছিল। তাছাড়া উন্নত জাতের নেপিয়ার ঘাসের আবাদ করে গরুকে খাওয়ানো হতো। 

বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলায় নিচু জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যেমন সবুজ ঘাস চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না তেমনি খামারী কৃষক তাদের পালিত গবাদি পশু মাঠে নামাতে পারছেন না। যার কারণে বছরের ৫-৬ মাস এ অঞ্চলের গরু বাড়ীতে রেখেই কৃষক ও খামারীদের বাজারের কেনা খাবারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। ফলে গবাদী পশুর মালিকদের গরু লালনপালনে আগের চেয়ে খরচ ২-৩ গুন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে খামারীরা জানান। 

এদিকে ঈদকে সামনে রেখে ঠাকুরগাঁওয়ে গো-খাদ্য পাওয়া যায় এমন হাট-বাজারে বর্তমানে গরুর প্রধান খাদ্য খড় উচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। পীরগঞ্জ উপজেলার লোহাগাড়া বাজারে গোখাদ্যের আড়ৎদার সফিউল ইসলাম (৩৫)  জানান, বর্তমান বাজারে প্রতিমন খড় এখন বিক্রি হচ্ছে  ৩৫০-৪০০ টাকায়। অথচ ওই খড়ের দাম ৫০-১০০ টাকার বেশি নয়। এছাড়া এ্যাংকার ভুষি প্রতি ৩০ কেজির বস্তা ১০৫০, খেসারীর ভুষি ৩০ কেজির বস্তা ১১০০, ধানের গুড়া প্রতি ৪০ কেজির বস্তা  ৪০০-৪৫০, তিলের খইল ৭৪ কেজির প্রতি বস্তা ২৩০০, গমের ভুষি প্রতি ৩৭ কেজির বস্তা ১২০০-১২৫০, ১টিন নালী ৯০০টাকা, বাজারে বিভিন্ন কোম্পানীর গরুর খাদ্য ২৫ কেজির বস্তা প্রকারভেদে ৮০০- ১০০০, মাশকালাইয়ের ভূষির ৪০ কেজির প্রতি বস্তা ৯০০, মুসুরে ভুষি ৩০ কেজির বস্তা ৮০০, ভুট্রার খোসা প্রতি ১৫ কেজি ৩৬০ টাকা, ভুট্রার গুড়া ২৩ কেজির বস্তা ৪৭০ টাকাসহ প্রায় সব ধরনের গো-খাদ্যের দাম পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। 

আর গো-খাদ্যের সংকট ও উচ্চ মূল্যে গো-খামারের জন্য বিখ্যাত রুহিয়া, পীরগঞ্জ, লোহাগড়া, এলাকায় আরও বেশী। রাণীশংকৈলের খামারী বেলাল বলেন, ঠাকুরগাঁও এলাকার খামারগুলিতে খড় পরিবহনে ট্রলী, লছিমন, করিমন যোগে বেশী দামে খড় কিনে খামার এলাকায় নিতে হয় বলে গো-খাদ্যে খড় ও অন্যান প্রাণী খাদ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে। তবে বোরো আবাদ না ওঠা পর্যন্ত যেমন গরু মাঠে নামতে পারবে না তেমনি পর্যাপ্ত খাদ্যও মিলবে না। এতে করে উচ্চ মূল্যে গো-খাদ্য কিনে ঠাকুরগাঁওয়ে খামারী ও কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।