দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ   মাসখানেক আগে থেকে ব্যাটারিচালিত অটো চুরির পরিকল্পনা করেন চক্রটি। চুরি করতে এসে মিলের দরজার চাবি না দেওয়ায় মিলে থাকা নছির উদ্দিন (৬৫) কে লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারপিট করেন তারা। এতেও সে চাবি দিতে রাজি না হওয়ায় তাদের কাছে থাকা চাকু দিয়ে মাথায় আঘাত করেন তারা।  পরে নছির উদ্দিন অজ্ঞান হয়ে পড়লে তার পরনের লুঙ্গী দিয়ে হাত পা বেঁধে শাখা যমুনানদীর পাড়ে ফেলে রেখে দুটো অটোনিয়ে পালিয়ে যায় তারা। 

এভাবেই দিনাজপুরের বিরামপুরে হরিহরপুর গ্রামের নছির উদ্দিন (৬৫) কে খুন করে অটোচুরির ঘটনা বর্ণনাদেয় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া দুই ব্যক্তি। এই হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা কারায় আরো তিন ব্যক্তিকে আটক করেছে থানাপুলিশ।তবে চুরি যাওয়া দুটো ব্যাটারি চালিত অটোর মধ্যে ১টি উদ্ধার করলেও অন্যটি উদ্ধারের কাজ অব্যাহত রয়েছে। বিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি মো. মনিরুজ্জামান মনির এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছেন।

এই হত্যাকান্ডে জড়িতরা হলেন, দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার উত্তর দরগাপাড়ার কফুল উদ্দিনের ছেলে মো. মোজাহার হোসেন (৪২) এবং ফুলবাড়ি উপজেলার পূর্ব রামচন্দ্রপুর গ্রামের  আবুল হোসেন ওরফে সায়েদ আলীর ছেলে মো.এবাদত হোসেন ছোটন (২৫)। ছোটন নবাবগঞ্জ উপজেলার আফতাবগঞ্জ কাজীপাড়া ধরের পাড়া এলাকায় শশুর বাড়িতে থাকতেন।

হত্যার সহযোগিতা করার অপরাধে, রংপুর বদরগঞ্জ উপজেলার মোকছেদপুর ফাঠকের ডাঙ্গা এলাকার মজিবুল ইসলামের ছেলে মো.জাহিদুল ইসলাম(৩২)একই উপজেলার মোসলমারি গাছুয়াপাড়া এলাকার আব্দুর রশিদ মন্ডলের ছেলে জিয়াউর রহমান বাবু এবং রংপুর গঙ্গাচড়া উপজেলার পাকুড়িয়া শরিফ এলাকার বাবর আলীর ছেলে মোস্তাফা ওরফে মোস্ত(৫৫)কে আটক করা হয়েছে।  

বিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো.মনিরুজ্জামান মনির জানান, নছির উদ্দিন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত বিষয়ে দিনাজপুর আমলী আদালত-৬ এর জ্যেষ্ঠ বিচারক মো.রাশেদুল আমিন’র কাছে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আটক মো.মোজাহার হোসেন(৪২),মো.এবাদত হোসেন ছোটন (২৫)।

আদালতের জবানবন্দিতে ও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মোজাহার ও ছোটন বলেন,‘ উত্তরবঙ্গে তাদের একটি অটো চোর চক্র রয়েছে। তারা বেশ কিছু দিন থেকে ওই মিলের চার্জে দেওয়া অটোচুরির পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা  অনুযায়ী ২৪ জুন রাতে ওই মিলের আশে পাশে একত্র হয়ে সময়ের অপেক্ষা করতে থাকে। রাত ১.৩০ মিনিটের দিকে মোজাহার ও এবাদত হোসেন ওই হাসঙ্কিং মিলের দক্ষিণ পাশের বেড়া কেটে মিলে প্রবেশ করে। এরপর মিলের মধ্যে চার্জে দেওয়া অটোগুলোর মধ্যে নতুন দুটো অটো নেওয়ার পরিকল্পনা করেন তারা। কিন্তু মিলের মূল দরজায় তালা থাকায় মিলের মধ্যে শুয়ে থাকা নছির উদ্দিনের কাছে চাবি চায় তারা। এতে নছির উদ্দিন চাবি দিতে অস্বীকার করে এবং চিৎকারের চেষ্ঠা করলে তাকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে অজ্ঞান করে মাথায় চাকু দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে নছির উদ্দিনের পরনের লুঙ্গীদিয়ে হাত ও পা বেঁধে ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু দূরে শাখা যমুনানদীর কিনারে মৃত ভেবে ফেলে রেখে দুটো অটোনিয়ে পালিয়ে যায় তারা।  

নিহতের পরিবারসুত্রে জানা যায়, ২৪ জুন বুধবার দিবাগত গভীর রাতে কোন এক সময় খুনিরা হাসঙ্কিং মিলের দক্ষিন পাশের বেড়া কেটে প্রবেশ করে নছির উদ্দিনকে পিটিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে শাখা যমুনা নদীর পাড়ে হাত,পা,ও মূখ বেঁধে ফেলে রেখে মিলের ভেতর চার্জে থাকা দুটো অটোচার্জার নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ভোর রাতে প্রতিবেশিদের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন)  সকালে নিহতের বড়ছেলে নূরে আলম অজ্ঞাত নামা বেশ কয়েক জনকে আসামীকরে থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করেন। ওই দিন দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার মো.আনোয়ার হোসেন পিপিএম এর নির্দেশে বিরামপুর সার্কেলের সহকারী সিনিয়র পুলিশসুপার মিথুন সরকার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো.মনিরুজ্জামান মনির, ওসি (তদন্ত) মো.মতিয়ার রহমান প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধিদের ধরতে অভিযান শুরু করেন। ২৭ জুন রাতে মো.মোজাহার হোসেন(৪২),মো.এবাদত হোসেন ছোটন (২৫)কে আটক করেন তারা। 

ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা(ওসি) তদন্ত মো. মতিয়ার রহমান জানান, নছির উদ্দিনের খুনের ঘটনার পরদিন জেলা পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসের’র সার্বিক দিক নির্দেশনায় অপরাধিদের ধরতে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। প্রথমে মো.এবাদত হোসেন ছোটন (২৫) কে আটকের একদিন পর মো.মোজাহার হোসেন(৪২)কে আটক করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যে মো.জাহিদুল ইসলাম(৩২)কে আটক করা হয়। এরপর ৬ জুলাই সোমবার রাতে রংপুরের বদরগঞ্জ থেকে জিয়াউর রহমান বাবু (২৮) ও  রংপুর সদর থেকে মোস্তফা ওরফে মোস্তকে চুরি হওয়া অটোচার্জারসহ আটক করে মঙ্গলবার সকালে দিনাজপুর কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

বিরামপুর সার্কেলের সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার (এএসপি) মিথুন সরকার জানান, বেশকিছু দিন থেকে একটি অটোচোর চক্র বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, পার্বতীপুর, ফুলবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় অটোচুরি করত। চুরি করার সময় অনেক চালকে তারা হত্যা করেছিল। আমরা এর আগে এই চক্রের সহযোগীকে গ্রেফতার করতে পারলেও এবার মূল হোতাকে প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রেফতার করতে পেরেছি। চুরি যাওয়া অন্য অটোটি উদ্ধারের জোর আমাদের  চেষ্ঠা অব্যাহত রয়েছে’। 

দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার মো.আনোয়ার হোসেন বলেন, মামলাটির আসামিদের আমরা গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। আমার কাছে যেটি মনে হয়েছে এই সমস্ত ব্যাটারি চালিত অটোচুরির পেছনে পুরান ব্যাটারি ক্রয়বিক্রয়ের কিছুটা কারসাজি রয়েছে। চুরি যাওয়া দুটো অটোর মধ্যে একটি উদ্ধার করা হয়েছে। অন্য অটোটিও উদ্ধারের জোর চেষ্ঠা অব্যাহত রয়েছে।