মোস্তাফিজুর রহমান লালমনিরহাট প্রতিনিধি:উজানের ঢলে লালমনিরহাটে তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ফলে জেলার ৫ উপজেলায় তিস্তাও ধরলার তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষজন আবারও নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানি বৃদ্ধি পাশাপাশি দেখা দিয়েছে তিস্তা তীব্র ভাঙন। এদিকে পানির চাপে হুমকির মুখে তিস্তা ফ্লাডবাই পাস । পানি চাপে ভেঙে যেতে পারে। এজন্য ব্যারেজ সহ আসেপাশেএলাকাগুলোতে রেড এলাড জারি করা হয়েছে চলছে মাইকিং।
গত দুইদিনে ভাঙনে পাঁচশতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে বাঁধের রাস্তায় আশ্রায় নিয়েছে। একদিকে পানি অন্য দিকে ভাঙনে অসহায় হয়ে পড়ছে তিস্তা পাড়ের মানুষ। বাড়ছে দুভোর্গ।
এদিকে অব্যাহতভাবে পানি বাড়ার কারনে তিস্তা মধ্যবর্তী চর এলাকার লোকজনকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে।
রোববার (১২ জুলাই) রাত ১০টায় লালমনিরহাটের দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি আবারও হুহু করে বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার উপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১১০ সেন্টিমিটার। সকাল ৯ টায় ১৫ সেন্টিমিটার ও দুপুর ১২ টায় ২০ সেন্টিমিটার প্রবাহিত হয়। ব্যারাজটি নিয়ন্ত্রনে রাখতে ৪৪ টি গেট খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।গত শনিবার সন্ধায় ৬টায় তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ও রাত ৯টার দিকে ৪০ সেন্টিমিটার প্রবাহিত হয়েছে। পানির প্রবাহ (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার) উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চলতি বন্যায় তিস্তা নদীর এটাই সর্বোচ্চ পানি প্রবাহের রেকর্ড।ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, শুক্রবার রাত থেকে পানি বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। শনিবার রাতেও পানি বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার অতিক্রম করে। সেই কারণেই নদীর চরাঞ্চলের মানুষকে নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হয়েছে। তবে রোববার সকাল থেকে পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও সন্ধার দিকে পানি বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুন্ডা, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, কালীগঞ্জ উপজেলার, চর বৈরাতী, ভোটমারী, কাকিনা, হাতীবান্ধা উপজেলার সিদুর্ণা, গড্ডিমারী, দোয়ানী, ধুবনী, ডাউয়াবাড়ি এবং পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়নের লাক্ষাধিক পরিবার গত তিন দিন ধরে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে এসব এলাকার চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চর এলাকার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এসব এলাকায় ৪র্থ দফা বন্যার কারনে এসব এলাকায় দেখা দিয়ে চরম খাদ্য সংকট, বিশুদ্ধ পানির অভাবে ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি।এ দিকে লালমনিরহাটে হাতীবান্ধা উপজেলার পাটিকাপাড়া ও সিন্দুর্না ইউনিয়নের প্রায় তিন শতাধিক পারিবারে ঘরবাড়ি নদীর গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। এসব পরিবার স্থানীয় বাধে রাস্তায় তাবু টাংগিয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। পরিবার গুলোর মাঝে এখনও কোন সরকারী সাহায্য পায়নি। হুমকির মুখে পড়েছেন পাটিকাপাড়া ইউনিয়নে পশ্চিম হলদিবাড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পুর্ব হলদিবাড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় দুইটি। উপজেলার সিংঙ্গীমার ইউনিয়নের ধুবনী এলাকার ভেসীর বাঁধটি হুমকির মুখে পড়েছেন। তিস্তার প্রবল  বেগে পানি আসায় যে কোন সময় ভেঙ্গে যেতে পারে ফ্লাড বাইপাস সড়ক । স্থানীয়রা বালির বস্তা ফেলে ভাঙ্গান রোধে কাজ করছেন।পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের পুর্ব হলদিবাড়ি গ্রামের সাদেক আলী বলেন, পানির স্্েরাতে সব কিছু হারিয়ে শুধু মাত্র এই টিনের ঘরটি রক্ষা করতে পারছি সব ভেসে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।তিন দিন ধরে পানি বন্দি গড্ডিমারী ইউনিয়নের তাসলিমা আক্তার জানান, শিশু সন্তান নিয়ে তিন দিন ধরে পানির জন্য ঘর থেকে বেড়া হতে পাচ্ছি না। অন্য বাড়ি একবার রান্না করছি এই খাওয়ায় আছি। অনেক কষ্টে দিন পার করছি।জানা গেছে, গত ৪৮ ঘণ্টার ভারি বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধি ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর আগে গত সপ্তাহে তিস্তার ও ধরলার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। যা ক্রমে কমে গিয়ে বন্যার উন্নতি ঘটে। কিন্তু এক সাপ্তাহে না যেতেই ফের উজানের ঢল ও ভারী বর্ষণের কারণে তিস্তার পানি বেড়ে বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার থেকে বর্তমানে ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে এবং ধরলা নদীর পানি বিপদসীমা ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।পাটিকাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সফিউল আলম রোকন জানান, গত তিন দিন থেকে তিস্তার পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে নদীর ভাঙনে ইউনিয়নের প্রায় তিনটি ওয়ার্ডের প্রায় দুই শত পরিবার ঘর হারিয়েছেন। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে দুই হাজার পরিবার।লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবু জাফর জানান, পানিবন্দি পরিবার গুলোর সব সময় খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। ত্রাণ পর্যাপ্ত থাকায় প্রতিদিনেই ত্রাণ দেয়া অব্যাহত আছে।