তারিকুল আলম, সিরাজগঞ্জঃশীতকাল এলেই রঙ-বেরঙের বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে ভরে ওঠে গোটা চলনবিল। তবে একশ্রেণির অসাধু চক্র অর্থের লোভে নির্মমভাবে শিকার করছে এসব অতিথি পাখি। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই বলে প্রতিবছর এই মৌসুমে পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।চলনবিলের বিস্তীর্ণ মাঠ, নদী, পুকুর, খাল, ডোবা, নালায় উড়ে বেড়াচ্ছে অতিথি পাখির ঝাঁক। পাখির চঞ্চল উড়াউড়ি ও তাদের হাঁক-ডাকে মুখরিত বেশিরভাগ এলাকা। এসব পাখির মধ্যে রাত চরা, বালিহাঁস, শামুকখোল, নীলশির, লালশির, বড় সরালী, ছোট সরালী, সাদা বক, ধূসর বক, গো বক, ছোট পানকৌড়ি, বড় পানকৌড়ি, কাদা খোঁচা, মাছরাঙ্গা ও সারস উল্লেখযোগ্য।
চলনবিলের  বিভিন্ন এলাকায় নির্বিচারে পাখি নিধন করা হচ্ছে। শৌখিন ও পেশাদার পাখি শিকারিরা বন্দুক, বিষটোপ, জাল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে এসব পাখি শিকার করছে। এতে  করে একদিকে জীববৈচিত্র নষ্ট হচ্ছে, অপরদিকে ফসলি জমিতে ক্ষতিকর পোকার আক্রমণও বাড়ছে।

সূত্রমতে, রাজশাহী বিভাগের পাবনা,নাটোর ,সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার নয় টি উপজেলার সমন্বয়ে চলনবিল অঞ্চল বিস্তৃত। চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ১৪ টি নদী ও ২২ টি ছোট বড় বিল রয়েছে। নিচু জলাভূমিতে এ মৌসুমে পানি শুকিয়ে আসায় ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন প্রজাতির দেশী ও অতিথি পাখি এসে ভিড় জমায়।

তাড়াশের বারুহাস এলাকার দিদারুল ইসলাম জানান, অল্প পানিতে খাবার সংগ্রহের জন্য এ বছরও চলনবিলে দেশি ও অতিথি পাখি এসেছে। সেই সাথে প্রচুর মাছও দেখা যাচ্ছে।  ফলে ঝাঁকে ঝাঁকে চখাচখি, পানকৌড়ি ,বক, হরিয়াল, হারগিলা, রাতচোরা, বালিহাঁস, ইটালী, শর্লি, পিঁয়াজ খেকো, ত্রিশূল, বাটুইলা, নারুলিয়া, লালস্বর, কাঁদোখোচা, ফেফি, ডাহুক, গোয়াল,শামুখখোল, হটটিটি, ঘুঘু সহ বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি বসতে শুরু করেছে। আর এ সুযোগে এক শ্রেণির শৌখিন ও পেশাদার পাখি শিকারি বন্দুক, বিষটোপ, কারেন্ট জাল ও ফাঁদ পেতে প্রতিনিয়ত পাখি শিকার করছে। প্রকাশ্যে এসব পাখি বিক্রি হচ্ছে  বিভিন্ন এলাকায়।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে একজন পেশাদার পাখি শিকারি বলেন, বাজারে পাখির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই কোনো মতে ধরতে পারলেই বিক্রি করতে সমস্যা হয় না।  
প্রতি জোড়া পাখি প্রজাতি ভেদে একশ পঞ্চাশ টাকা থেকে পাঁচ শ টাকা পর্যন্ত  বিক্রি করা হয়। ফলে বেশি লাভের আসায় অনেকেই মাছ ধরা বাদ দিয়ে পাখি শিকার করছেন। 

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, গুরুদাসপুর, সিংড়া ও আত্রাই উপজেলা সদর থেকে দুরে প্রত্যন্ত এলাকায় সবচেয়ে বেশি পাখি কেনাবেচা হচ্ছে। ফলে এই এলাকাতে শিকারিদের আনাগোনাও বেশি। আর এসব দূর্গম এলাকাতে প্রশাসনের কোনো লোকজনও তেমন আসেন না।

এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আহম্মদ নিয়ামুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণের স্বার্থে চলনবিল এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অতিথি পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে তাড়াশ, উল্লাপাড়া, চাটমোহর, সিংড়া, গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে মাঝে-মধ্যেই ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে দি বার্ড সেপটি হাউসের চেয়ারম্যান ও পরিবেশপ্রেমী মামুন বিশ্বাস বলেন পাখি শিকার জীববৈচিত্র জন্য খুবই ক্ষতিকর এবং দন্ডনীয় অপরাধ। শুধু পাখি নয় বন্য প্রাণী রক্ষায় যে যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে । তা না হলে আগামী প্রজন্ম কাগজে কলমে বন্য প্রাণীর নাম জানতে হবে।