সুনামগঞ্জ থেকে প্রতিনিধি:সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর শিক্ষকগণ সারা বছর ক্লাস না করেও শুধু মাত্র ছাত্র-ছাত্রীদের চলমান শিখনফল মূল্যায়ন( অ্যাসাইনমেন্টকে) ইস্যু করে এবং বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে টিউশন ফি বেতন দিতে বাধ্য করছে শিক্ষার্থীদের এমন অভিযোগ উঠেছে। মহামারি করোনার কারণে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মাধ্যমিক স্কুলগুলো সারা বছর বন্ধ থাকলেও বছর শেষে সরকারের নিদের্শনা অমান্য করে অ্যাসাইনমেন্টকে হাতিয়ার বানিয়ে উপজেলার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার ফি, বেতনসহ বিভিন্ন নামে চাপ প্রয়োগ করে ৬ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে ৯ম শ্রেণীর প্রতি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে ১১৩০ টাকা থেকে ১৭০০ এমনকি কোন কোন স্কুলে ১৪৫০ টাকা থেকে ২১০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। শুধু তাই নয়! অভিযোগ পাওয়া গেছে, কোন কোন শিক্ষা স্কুলে শিক্ষার্থীর টাকা না দিতে চাইলে শিক্ষার্থীদের এক ক্লাস থেকে অন্য  ক্লাসে উতীর্ণ হতে না দেয়া, সার্টিফিকেট না দেয়া ও অ্যাসাইনমেন্ট জমা না নেয়ার ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন শিক্ষকগন এমন অভিযোগ অনেক শিক্ষার্থী ও অবিভাবকের। এ নিয়ে উপজেলার সর্বস্তরের জনসাধারণসহ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ। বশ্বিক এই হামারিকালে কর্মহীন হয়ে পড়েছে সারাদেশের নিম্ন আয়ের অসংখ্য মানুষ। চাকরি হারিয়েছেন মধ্যবিত্তের অনেকে। গত ১৮ মার্চ থেকে সারাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এ সংকটকালে বেতন-ফি আদায়ে চাপ প্রয়োগ না করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকলেও তা মানছে না তাহিরপুর উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো। যারফলে টিউশন ফিসহ অন্যান্য ফি জমা দিতে প্রতিনিয়তই বাড়িতে গিয়ে অভিভাবকদের চাপ দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। হাওরাঞ্চল খ্যাত তাহিরপুর উপজেলার বেশিরভাগ মানুষেরই কৃষি নির্বর হওয়ায় একদিকে করোনাভাইরাসের কারণে আয়-উপার্জনহীন বন্ধ অপরদিকে দফায় দফায় বন্যায় হাওরাঞ্চলের মানুষ খেয়ে নাখেয়ে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন জীবিকা বাঁচাতে  হিমসিম খাচ্ছে। সেখানে তাদের সন্তানদের স্কুলের টাকা দেওয়াটা যেন এখন তাদের কাছে শুধুই স্বপ্ন। এ পরিস্থিতিতে স্কুলের টাকা দেওয়াটা তাদের মরার উপর খাড়ার ঘায় পরিনত হয়েছে। আবার কোন কোন অভিভাবক তাদের সন্তানদের কান্নাকাটি আর লেখাপড়া ছেড়ে দেয়ার কথা শুনে চড়া সুদে, কেউ কম দামে আমন ধানের উপর অগ্রীম টাকা নিয়ে, কেউ কেউ আবার মায়ের গহনা বা বাড়ির হাস-মোরগ আবার কেউ গরু-ছাগল বিক্রি করে স্কুলের টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।জানা গেছে, উপজেলায় মাধ্যমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও ২ টি স্কুল এন্ড কলেজ সহ মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট ২১ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৫ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। কোভিড-১৯ এর কারণে বছরের শুরুতে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো তাহিরপুরেও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বছর শেষে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেনীর শিক্ষার্থীদের শিখনফল মূল্যায়নের অ্যাসাইনমেন্ট নেয়ার জন্য ফি ছাড়াই শিক্ষার্থীদের অটোপাসের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু অভিযোগ ওঠেছে, এ ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন স্কুল অ্যাসাইনমেন্টকে পুঁজি করে প্রত্যেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে বেতনাদি ও বিভিন্ন বকেয়া পাওনার নামে আদায় করা হচ্ছে হাজার হাজার টাকা। এ নিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রতিনিয়ত চলছে বাগবিতন্ডা।  প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্কুলে এ রকম ঘটনা ঘটেই চলছে। এ নিয়ে যে কোনো সময় অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশংকা করছেন স্থানীয় বিজ্ঞজনেরা। গতকাল ১৫ নভেম্বর রবিবার সরেজমিনে উপজেলার বাগলী উচ্চ বিদ্যালয়, জনতা উচ্চ বিদ্যালয়, ট্যাকেরঘাট স্কুল এন্ড কলেজ, চাঁনপুর উচ্চ বিদ্যালয়,বাদাঘাট পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়, বাদাঘাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও লাউড়েরগড় উচ্চ বিদ্যালয়সহ অধিকাংশ স্কুলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাদাঘাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণীর পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,  মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রমের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট করানোর নির্দেশনা দেয়া হয়। কিন্তু বেতন ও টিউশন ফি বাধ্যতামূলক করা হয়নি। অথচ বছরের শুরুতে মাত্র ২ মাস ক্লাস নিয়ে পুরো বছরের বেতন ও অন্যান্য ফিসহ মোটা অংকের অর্থ আদায় এক ধরনের জুলুম। আমার মেয়ে স্কুলে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে গেলে টাকা ছাড়া অ্যাসাইনমেন্ট জমা নিচ্ছেনা শিক্ষকগণ। তিনি বলেন, উপজেলার অধিকাংশ লোক কৃষি নির্ভর। করোনাকালীন ও বন্যা পরিস্থিতির কারণে তাদের পরিবারগুলো এমনিতেই আর্থিক সংকটে। তার ওপর আবার বছর শেষে সন্তানদের বেতনের বোঝা । এ যেনো মরার ওপর খড়ার ঘাঁ। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা। বাদাঘাট পাবলিক  উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও তাহিরপুর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি সফিকুল ইসলাম( দানুর ) সাথে মোবাইল ফোনে এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে তিনি ২/৩ মাসের বেতন নেয়ার কথা শিকার করে  বলবেন বলেন, যারা স্বইচ্ছায় বেতন দিচ্ছে আমার সেইসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকেই নিচ্ছি। বেতনের জন্য কোন শিক্ষার্থীকে চাপ দিচ্ছে না। আমরা কোনো শিক্ষার্থীর ওপর চাপ সৃষ্টি না করে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী সমাঝোতার মাধ্যমে বেতন আদায় করছি।সুনামগঞ্জ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোদাছির আলম সবুল বলেন, আমি কোন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এখন পর্যন্ত বেতন বা অ্যাসাইনমেন্টের নামে কোন টাকা নেইনি। এরকম কোন শিক্ষার্থী টাকা নেওয়ার রিসিট ও দেখাতে পারবেনা। এ ব্যাপারে তাহিরপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গুলোতে শিক্ষামন্ত্রীর একটি নির্দেশনা আছে বেতন আদায়ের। তবে স্কুল পরিচালনা করার জন্য শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের কাছ থেকে কিছু টাকা নিতে পারে কিন্তু চাপ সৃষ্টি করে নয়। শিক্ষার্থীদের শিখন ফল মূল্যায়ন করতে যে অ্যাসাইনমেন্ট নেয়া হচ্ছে সে জন্য কোনো ফি নেয়া যাবে না। তবে উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে টাকা ছাড়া অ্যাসাইনমেন্ট জাম নিচ্ছেনা, র্সাটিফিকেট দেয়া হবেনা এবং শিক্ষার্থীদেরকে এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে উতীর্ণ হতে দেয়া হবে না এমন ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করছে শিক্ষকগণ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা সরকারি নিয়মিতর বাহিরে। এরকম ভয়ভীতি দেখিয়ে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে এমন অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।