আব্দুর রহমান, স্টাফ রিপোর্টারঃ: চিরদিনের মতো বিদায় নিলেন নাট্যকার মান্নান হীরা। বৃহস্পতিবার (২৪ ডিসেম্বর) বিকালে জানাযা শেষে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার রহমতগঞ্জ গোরস্তানে তাকে চির দিনে মতো সমাহিত করা হয়। এর আগে গত বুধবার (২৩ ডিসেম্বর) তিনি ঢাকার বাসায় অসুস্থতা অনুভব করলে তাকে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই রাত ৮টার দিকে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। মান্নান হীরা হার্টের রোগে ভুগছিলেন। মৃত্যুর পর তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ বৃহস্পতিবার সকাল ১১ট থেকে ১২টা পর্যন্ত ঢাকার জাতীয় নাট্যশালা প্রাঙ্গনে রাখা হয়। পরে মরহুমের লাশ তার নিজ জেলা সিরাজগঞ্জ নিয়ে আসা হয়। সিরাজগঞ্জে শহরের কোর্ট চত্বরে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।প্রয়াত মান্নান হীরা’র প্রথম নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার সেগুন বাগিচা মসজিদে। পরে নিজ জেলা সিরাজগঞ্জ কোর্ট চত্বর প্রাঙ্গনে দ্বিতীয় জানাযা শেষে রহমতগঞ্জ গোরস্তানে সমাহিত করা হয়। মান্নান হীরা ১৯৫৬ সালে জন্ম নেন সিরাজগঞ্জে। মফস্বল শহর থেকে মাধ্যমিক, রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। নাট্য চর্চার শুরু থেকেই তিনি আরণ্যক নাট্য দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন এক সময় আরণ্যক নাট্যসংস্থার সাধারণ সম্পাদক।তিনি ছিলেন বাংলাদেশের পথ নাটকের পথিকৃৎ। ছিলেন মঞ্চ নাটক রচনায় তার সমসাময়িক সময়ের অপ্রতিপ্রন্দ্বী। ছিলেন নাট্যকার, নির্দেশক, নির্মাতা ও অভিনেতা। নিরন্ন মানুষ ও দরিদ্র মানুষই ছিলো তার নাটকের প্রধান উপাদান। তার পথ নাটকের বিষয় ছিলো প্রধানত কৃষিজীবি মানুষ, উৎপাদন এবং উপকরন। নাটকে তার সংলাপ ছিল তীক্ষ্ণ । সংলাপের ঘাত-প্রতিঘাতে মান্নান হীরার নাটক একদিকে যেমন হয়ে উঠতো অভিনয় উপযোগী, অন্যদিকে তা ছিলো তেমনি সুখপাঠ্য। তার নাটকে প্রচ্ছন্ন রাজনীতিকে কেন্দ্রে রেখে প্রেম ও অন্যান্য সামাজিক সম্পর্ক আবর্তিত হয়। তিনি ছিলেন নাটকে প্রথাগত ও রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে ফেলতে অনুপ্রেরনামূলক। নাটক এবং নাট্যসাহিত্যে তার অবদানে তিনি ২০০৬ সালে নাটক শ্রেনীতে বাংলা একাডিমী কর্তৃক সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। আমাদের দেশে যে কজন নাট্যকার পথনাটক কে সমৃদ্ধ করেছেন- মান্নান হীরা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। রাজনীতি-আশ্রয়ী তার পথ নাটক পাকিস্তান, ভারত, হংকং, নেপালসহ অনেক দেশেই প্রশংসিত হয়েছে। মান্নান হীরা রচিত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে আছে ক্ষুদিরামের দেশে, ঘুমের মানুষ, মৃগনাভী, জননী বীরাঙ্গনা, ফেরারী নিশান, আদাব, শেকল, জননী বীরাঙ্গনা, একাত্তরের রাজকন্যা, মেহেরজান, ফুটপাত, লাল জমিন,রেফারী, বাংলার বাদশা অন্যতম।
নাটকের গন্ডি পেরিয়ে এই অসাধারন প্রতিভা এক সময়ে জড়িয়ে পড়েন চলচ্চিত্র অংগনে। স্বল্পদৈঘ্য চলচ্চিত্রে তিনি নির্মাণ করেন ৭১ এর রঙপেন্সিল ও গরম ভাতের গল্প। বড় পর্দার জন্য তিনি নির্মান করেন একাত্তরের ক্ষুদিরাম এর মতো চলচ্চিত্র। অবশেষে এই অনন্য প্রতিভা ৬৫ বছর বয়সে তার জীবনের সমাপ্তি টানেন গত বুধবার রাতে। চির শায়িত হন নিজ জন্মভূমি সিরাজগঞ্জে।প্রয়াত মান্নান হীরার মৃত্যুর সংবাদে সিরাজগঞ্জের সাংস্কৃতিক অংগনে নেমে আসে শোকের ছায়া। তার মৃত্যুতে সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, মরহুমের আত্মীয় স্বজন, ঘনিষ্ট বাল্যবন্ধু, সহপাঠি এবং সব স্তরের ও পেশার মানুষেরা প্রয়াত মান্নান হীরা জানাজার অংশগ্রহণ করেন। তার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ, বাসদ, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সিরাজগঞ্জ প্রেস ক্লাব, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শোক প্রকাশ করেছেন।