নিজস্ব প্রতিবেদক

বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে চিরদিন অমর হয়ে থাকবেন। এক কঠিন সংকটের সময় হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো তিনি এসেছিলেন। তার প্রস্থান হলো নীরবে, অগোচরে। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বারবার স্মরণ করতেই হবে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। সংবিধান লংঘন করে তিনি সামরিক শাসন জারি করেন। এই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ৭ দলীয় জোট।

১৯৮৬ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ১৫ দলের ভাঙন হয়। বাম রাজনৈতিক দলগুলো আলাদা অবস্থান নেয়। তারা করে ৫ দলীয় জোট। তিন জোট স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। দীর্ঘ ৯ বছরের আন্দোলনের পর শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ। আর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর তিনি বিরোধীদলের কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের নাম জানতে চান। সেই সময় এটি ছিল এরশাদের একটি চাল। এরশাদ মনে করেছিলেন যে বিরোধী দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হওয়ার ক্ষেত্রে একমত হতে পারবে না। এরশাদ ভোট ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছিলেন। তিনি নির্বাচনে মিডিয়া ক্যু এবং নানারকম কারচুপির এক মহাযজ্ঞ করে গণতন্ত্রকেই সংকটের মধ্যে ফেলেছিলেন। ৮৮ সালের নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম প্রহসনের নির্বাচনের একটি। এরকম পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উত্থাপন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, একটি দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচন হতে হবে। এ দাবিতে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলা হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান কে হবেন এই নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানারকম অনিশ্চিয়তা ছিল।

 

কিন্তু ৪ ডিসেম্বর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যখন পদত্যাগের ঘোষণা দেন তখন বিরোধী দলগুলো ধানমন্ডিতে প্রয়াত বাকশাল নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ এর বাসায় বৈঠকে বসে। এই সময় তৎকালীন প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ এর নাম প্রস্তাব করা হয়। এই প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। কিন্তু বাধ সাধেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ নিজেই। তিনি তখন প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে অস্বীকৃতি জানান। এই সময় অনিশ্চয়তার মেঘ গণতন্ত্রের আকাশকে কালো করে ফেলে। কিন্তু এই পরিস্থিতি উত্তরণে এগিয়ে আসেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদকে টেলিফোন করেন এবং তাকে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ শর্ত দেন যে তিনি দায়িত্ব নিতে রাজি আছেন, তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব পালন শেষে তিনি আবার প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যাবেন। বিরোধীদলগুলো সেই প্রস্তাবে রাজি হয়। এরপর সংবিধান সংশোধন করা হয় এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়। সেই সংকটে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার ক্ষেত্রে তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন এবং এ কারণেই গণতন্ত্রের ইতিহাসে তার নাম অমর হয়ে থাকবে।

বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদকে নিয়ে বিতর্কও কম ছিল না। তিনি শুধুমাত্র নিজের পদ রক্ষার জন্য সংবিধান সংশোধন করাতে পেরেছিলেন৷ রাষ্ট্রপতির পদে দায়িত্ব পালনের পর তিনি সংবিধান সংশোধন করে আবার প্রধান বিচারপতির পদে ফেরত গিয়েছিলেন।
জেনারেল জিয়াউর রহমান সাহাবুদ্দিন সাহেবের গুনমুগ্ধ হয়ে তাকে রেডক্রসের চেয়ারম্যান করেছিলেন৷ আর ৯০ এর আন্দোলনের রাজনীতিকরা তাকে করেছিলেন সরকার প্রধান৷
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সঙ্গে দেখা করেন এবং তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৬ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি বিভিন্ন বিষয়ে আওয়ামী লীগের তীব্র সমালোচনা করেন। রাষ্ট্রপতির কোন ক্ষমতা নাই কবর জিয়ারত ছাড়া -এই কথা বলে তিনি আলোচিত হন। এছাড়া বিভিন্ন আইনের ফাইল ফেরত দিয়ে তিনি একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। অনেকেই মনে করেন, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের ফল বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের ভূমিকা ছিলো। কারণ, তিনি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশন নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং যে কারণে এই দুজন ব্যক্তি নির্বাচনে চরম পক্ষপাতিত্ব করেছিলেন।