নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে কুখ্যাত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত পরিকল্পিত গণহত্যার মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে বাঙালির জাতীয়তাবাদী, স্বাধিকার আন্দোলনকে সশস্ত্র হামলার দ্বারা দমন করতে চেয়েছিল নরপশুরা। এই গণহত্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের আদেশে পরিচালিত, যা ১৯৭০ এর নভেম্বরে সংঘটিত ‘অপারেশন ব্লিটজ’-এর পরবর্তী সামরিক আক্রমণ। ২৫শে মার্চের পাকিস্তানি সামরিক অপারেশনের আসল উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব বড় বড় শহর দখল করে নেয়া এবং রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধীদের এক মাসের ভেতর নিশ্চিহ্ন করে দেয়া।পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যে গণহত্যার সূচনা করেছিল, পরবর্তী নয় মাস ধরে তা অব্যাহত ছিল বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায়। মুক্তিযুদ্ধ আর ইতিহাসের গবেষক অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান ডয়চে ভেলেকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের ঐ নিধনযজ্ঞের পরিকল্পনা হয়েছিল একাত্তরের মার্চের শুরুতেই, জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাড়ি পাকিস্তানের লারকানায়৷ শিকারের নামে এই গণহত্যার ষড়যন্ত্রে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টো, জেনারেল ইয়াহিয়া এবং জেনারেল হামিদ অন্যতম৷ তাঁরা মনে করেছিলেন, ২০ হাজার মানুষ হত্যা করলেই ভয় পাবে বাঙালিরা, স্বাধীনতা এবং স্বাধিকারের কথা আর বলবে না৷’
২৫ শে মার্চ কালোরাত শুরু হওয়ার পরপরই বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। গ্রেফতার হওয়ার আগেই বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির বাসভবন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এদিন রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শুরু হওয়া গণহত্যা চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ধরে।

২৫শে মার্চের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিক পর্যায়গুলো। বছরের পর বছর তীব্র গণআন্দোলন শেষে  ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বাঙালিরা স্বাভাবিকভাবেই আশা করেছিল যে ক্ষমতার পালাবদল হবে এবং আওয়ামী লীগ ৬ দফা অনুসারে সরকার গঠন করবে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ এ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান পিপিপি’র জুলফিকার আলি ভুট্টোর প্ররোচনা ও চাপে জাতীয় সংসদের কার্যাবলী মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করে দেন। ২৫ মার্চ রাতের শেষ প্রহরে এবং অন্যান্য গ্যারিসনকে ফোন কলের মাধ্যমে তাদের জিরো আওয়ারে (অপারেশন শুরুর পূর্বনির্ধারিত সময়) তাদের কার্যক্রম শুরু করার জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়। ঢাকার সৈন্যদের কমান্ডে ছিলেন রাও ফরমান আলি এবং অন্যান্য সব স্থানের সৈন্যদের কমান্ডে ছিলেন জেনারেল খাদেম হোসেন রাজা। জেনারেল টিক্কা এবং তার কর্মকর্তারা ৩১তম কমান্ড সেন্টারের সব কিছু তদারকি করা এবং ১৪তম ডিভিশনের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে উপস্থিত ছিলেন।

২৫শে মার্চে গণহত্যা পৃথিবীর ইতিহাসে নিরস্ত্র মানুষের উপর সামরিক আক্রমণের জন্য কুখ্যাত এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার জ্বলন্ত সাক্ষী। ২৫শে মার্চের ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ডের মধ্যেও ফিনিক্স পাখির মতো বাঙালি জাতির উত্থান ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে হানাদারদের পরাজিত করে স্বাধীনতা অর্জনের ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ও ঐতিহাসিক গৌরবের। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যার পাশাপাশি বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের মুখপত্র সংবাদপত্র অফিসগুলোতেও হামলা চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এ পরিস্থিতিতে সক্রিয় সাংবাদিকদের বৃহত্তম অংশ আত্মগোপনে চলে যান বা ঢাকা ত্যাগ করেন। তাদের একটি অংশ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং অনেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কলম ধরেন। ঢাকায় থেকেও কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং বিশ্ববাসীকে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানাতে থাকেন। বড়ই বিভিষিকাময় একাত্তরের ২৫শে মার্চের ভয়াল কালো রাত। এ রাতে এদেশে বিশ্ব সভ্যতার অন্যতম কলংকজনক নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়, ২৫শে মার্চের কালো রাতে নিরস্ত্র বাঙালি নিধনে মত্ত হয়ে ওঠেছিলো পাকিস্তানি নিষ্ঠুরতম বর্বর সেনারা। সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও মুনতাসিম মামুন সম্পাদিত ‘বাংলাদেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন’ গ্রন্থে ১৯৭১ সালের মার্চের শেষ ৬দিনকে মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপূর্ব উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়- ২৫শে মার্চ রাত ১১ঘটিকায় ঢাকায় শুরু হয় গণহত্যা। এ রাতে হনাদার বাহিনীর আঘাতের পরপরই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে স্বতস্ফুর্ত সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিলো। সেদিন প্রথম বিদ্রোহের সূচনা হয় চট্টগ্রামে রাত সাড়ে৮টার দিকে। এ বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিলেন- ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস পুলিশ, আনসার ও যুব সম্প্রদায়। আমরা ইতিপূর্বে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের জাতিসংঘ স্বীকৃতি আদায় করেছি। কূটনৈতিক তৎপরতার ফলেই তা সম্ভব হয়েছে। গণহত্যা দিবসের ক্ষেত্রেও আমাদের চালাতে হবে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা।খোদ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে ২৫ মার্চের গণহত্যার বহু নথিপত্র ও প্রমাণ রয়েছে। সেই কালরাতের প্রত্যক্ষদর্শী অনেক বিদেশি সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এখনও জীবিত রয়েছেন। সত্যের পক্ষে তারা এগিয়ে আসবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সঠিক পথে কার্যকরভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারলে গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সহজেই আদায় করা সম্ভব বলে মনে করি।